কালির দেখা নেই অর্ধেক কলকাতাতেই

এটিএম এখনও তথৈবচ। লাইন ছোট হওয়ার লক্ষণ নেই ব্যাঙ্কে। রোজকার নিত্যনতুন সরকারি ঘোষণায় হয়রানি কমা দূর অস্ত্‌, বরং বাড়ছে বিভ্রান্তি। আর এই সব কিছুর মধ্যে এ বার মুখ ডোবাল ভোটের কালিও।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৬ ০৩:৩২
Share:

নোট বদলের কালি। বুধবার কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডের কাছে একটি ব্যাঙ্কে। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।

এটিএম এখনও তথৈবচ। লাইন ছোট হওয়ার লক্ষণ নেই ব্যাঙ্কে। রোজকার নিত্যনতুন সরকারি ঘোষণায় হয়রানি কমা দূর অস্ত্‌, বরং বাড়ছে বিভ্রান্তি। আর এই সব কিছুর মধ্যে এ বার মুখ ডোবাল ভোটের কালিও।

Advertisement

যে কালি আঙুলে লাগিয়ে গতকাল সরকার একই লোকের একাধিক বার নোট বদল আটকানোর কথা বলেছিল, এ দিন খাস কলকাতাতেই তার দেখা মিলল না অন্তত অর্ধেক জায়গায়। মফসস্‌ল বা গ্রাম-গঞ্জ তো দূর অস্ত্‌। বাকি দেশের চিত্রও মোটামুটি এক।

কেন্দ্র জানিয়েছে, এ দিন আঙুলে কালি লাগানো শুরু হয়েছে মেট্রো শহর থেকেই। কলকাতায় সাংবাদিক সম্মেলনে স্টেট ব্যাঙ্কের চিফ জেনারেল ম্যানেজার (ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেল) পার্থপ্রতিম সেনগুপ্ত জানান, রাজ্যে তাঁদের মোট শাখা ১,২০০টি। তার মধ্যে কলকাতায় ১৯০টি। এ দিন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ১০০টি শাখায় ওই কালি পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার থেকে পৌঁছনোর চেষ্টা হচ্ছে মালদহ, মুর্শিদাবাদের মতো কিছু জেলায়। দিল্লি সমেত বাকি দেশেও প্রায় সমস্ত ব্যাঙ্কে কালি পৌঁছনোর হাল প্রায় এ রকমই। এমনকী দেখা গিয়েছে, কালি নেই বিভিন্ন ব্যাঙ্কের মেট্রো শহরের বহু শাখাতেও।

Advertisement

৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সময় কেন্দ্র মনে করেছিল কিছু দিন অন্তত উতরে দেবে ১০০ টাকার নোট। কিন্তু গত কয়েক দিনে স্পষ্ট যে, চাহিদার তুলনায় তার জোগান নস্যি। শুরুতে মনে হয়েছিল, খুব তাড়াতাড়ি নতুন নোটের উপযুক্ত হয়ে উঠবে এটিএম। কিন্তু সে আশাও মেটেনি। বরং যত দিন যাচ্ছে, সব ক্ষেত্রেই আগাম পরিকল্পনার অভাব ফুটে উঠছে তত বেশি করে। মনে হচ্ছে যেন রোজ নতুন কোথাও ফাঁক দেখে তা তড়িঘড়ি ভরাট করতে দৌড়চ্ছে কেন্দ্র। অনেকেরই মনে উঁকি দিচ্ছে সংশয়। তাঁদের আশঙ্কা, যেখানে পরিকল্পনায় এত গলদ, সেখানে সমস্ত কষ্ট আর ভোগান্তি সওয়ার পরেও কালো টাকা গলে যাবে না তো?

মোট ৪,৫০০ টাকার পুরনো নোট সরাসরি নতুন নোটে বদলে দেওয়ার কথা বলেছে কেন্দ্র। মঙ্গলবার অর্থ বিষয়ক সচিব শক্তিকান্ত দাস জানিয়েছিলেন, এক জন যাতে একাধিক বার নোট বদলাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই আঙুলে কালির দাগ দেওয়া হবে। তাঁর দাবি ছিল, এতে নোট পাল্টাতে একই জনের একাধিক বার লাইনে দাঁড়ানো বন্ধ হবে। কমবে হয়রানি। তা ছাড়া অভিযোগ উঠেছে যে, নোট বদলে নিয়ে আসতে টাকার বিনিময়ে কিছু জনকে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড় করাচ্ছেন কালো টাকার মালিকরা। সেই ব্যাপারটিও এতে বন্ধ হবে।

Advertisement

কিন্তু এ দিন কালি লাগানোর বহর দেখে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে এই বিষয়টি নিয়ে। অনেকে বলছেন, কালো টাকা নির্মূল হবে, এই আশাতেই এত ভোগান্তি সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত ধৈর্য ধরে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই যে মেট্রো শহরের কিছু শাখা ছাড়া এ দিন আর কোথাও কালির দেখা মিলল না, তাতে সেই উদ্দেশ্য পূরণ হল কি?

ব্যাঙ্কের জটলায় দাঁড়ানো কারও কারও প্রশ্ন, ‘‘সরকার কি তবে ভাবল এমন অনৈতিক কাজ শুধু মেট্রো শহরে ঘটছে? এমনকী খাস কলকাতাতেও তো সর্বত্র কালির দেখা মিলল না।’’ কেউ বলছেন, ‘‘যাঁরা বাঁকা পথে কালো টাকা বদলাবেন, কালি কোথায় নেই সেই খোঁজ করতে তাঁদের কতক্ষণ?’’

স্টেট ব্যাঙ্ক সমেত কয়েকটি ব্যাঙ্ক এ দিন জানিয়েছে, কালির অপেক্ষায় বসে না থেকে তা ছাড়াই আপাতত নোট পাল্টানোর কাজ জারি রাখবে তারা। কলকাতায় কোনও কোনও ব্যাঙ্ক আবার এ দিন তা বন্ধ রেখেছে। শাঁখের করাত সেখানেও। কালি আসেনি বলে নোট বদল বন্ধ রাখলে গ্রাহকদের হয়রানি। আবার প্রক্রিয়া জারি রাখলে, কালি আসতে-আসতেই কালো টাকার কারবারিদের ‘কাজ সেরে ফেলা’র আশঙ্কা।

টাকা মিলবে কি? বুধবার হাওড়ার সালকিয়ায় এক ব্যাঙ্কের সামনে দীপঙ্কর মজুমদারের তোলা ছবি।

গতকাল কেন্দ্র বলেছিল, ব্যাঙ্কের সামনে দীর্ঘ লাইনের অন্যতম কারণ একই লোকের বারবার দাঁড়ানো।অনেক ক্ষেত্রে কালো টাকার মালিকরাই তাঁদের পাঠাচ্ছেন বলে সন্দেহ। আঙুলে কালি লাগালে এই সিন্ডিকেটকে আটকানো যাবে। লাইন ছোট হলে স্বস্তি পাবেন মানুষ।

এ দিন স্টেট ব্যাঙ্কের সদর দফতরে নোট বদলাতে আসা মেটিয়াবুরুজের ইসলামউদ্দিন গাজি, মানিকতলার দীপক সরকাররা বলছিলেন, ‘‘এর আগে কয়েক বার নোট বদলাতে লাইনে দাঁড়িয়েছি। লাভ হয়নি। ফিরে গিয়েছি ঘণ্টার পর
ঘণ্টা অপেক্ষা করে। কালি লাগানোর ব্যবস্থা কি আগে করা যেত না?’’ অনেকের আবার প্রশ্ন, কালি লাগিয়েও সমস্যার সুরাহা হবে কি? চাইলে তো একই পরিবারের একাধিক সদস্য কালি লাগিয়েও অন্যের হয়ে টাকা তুলে নিতে পারেন। তার বেলা?

নোটের নির্দেশ

• কালি লাগানো হবে ডান হাতের তর্জনীতে

• টাকা বদলের আগেই আঙুলে কালি

• প্রথমে মেট্রো শহর, পরে অন্যত্র চালু হবে

• একবারই বদলানো যাবে পুরনো নোট, বাকি টাকা অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে

• নিজের অ্যাকাউন্ট না থাকলে অন্যের অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে পরে তোলা যাবে

• তার জন্য জমা দিতে হবে যার অ্যাকাউন্ট তাঁর অনুমতিপত্র, নিজের পরিচয়পত্র

• ব্যাঙ্কে যেতে না পারলে অন্য কাউকে অথরাইজেশন লেটার দিয়ে পাঠানো যাবে

বাজার থেকে নোট শুষে নিয়ে কালো টাকা কতটা নির্মূল করা যাবে, তার উত্তর দেবে সময়। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, এত বড় কর্মযজ্ঞে নামার আগে যে নিখুঁত পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল, তার খামতি চোখে পড়ছে প্রতি পায়ে।

যেমন, প্রথমে মনে হয়েছিল, এটিএম থেকে আগের মতো নোট বেরোনো স্রেফ দিন কয়েকের অপেক্ষা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে নতুন নোটের জন্য সমস্ত এটিএমকে তৈরি করতে এখনও বেশ কিছুটা সময় লাগবে। গোড়া থেকেই সরকারের বক্তব্য, নোটের জোগানে কোনও খামতি নেই। কিন্তু শূন্য এটিএম আর ব্যাঙ্কে দীর্ঘ লাইনের সঙ্গে সেই দাবি মেলেনি। এ দিন পার্থপ্রতিমবাবুও বলেছেন, কিছু এটিএমকে নতুন ৫০০ টাকার উপযুক্ত করে তোলার কাজ শুরু করেছেন তাঁরা। কিন্তু এখনও সেই নোট শাখায় আসেনি। কবে আসবে, তা-ও জানা নেই। তাঁর দাবি, রাজ্যে স্টেট ব্যাঙ্কের প্রায় সাড়ে তিন হাজার এটিএমের মধ্যে ২,০০০টি চলছে। তার মধ্যে আবার ২০০০ টাকার নোটের উপযুক্ত হয়েছে ১২০টি। অর্থাৎ, দিল্লি এখনও দূরই। অনেকের মতে, এই তালিকায় এ বার যুক্ত হল ভোটের কালিও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে খবর, এ দিন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ৩০ হাজার বোতল কালি তুলেছে। ব্যাঙ্কগুলি বরাত দিয়েছে প্রায় তিন লক্ষ বোতলের। নোটের খোঁজে হয়রান অনেকের প্রশ্ন, এই কালির বোধোদয়ও শুরুতে হলে সুবিধা হত না কি?

লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে এক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বলছিলেন, ‘‘ছোটদের স্কুলেও আগে থেকে পড়া করে না গেলে কড়া কথা শুনতে হয়। নোট তুলে নিয়ে তারপর নতুন নোট ছাপানো কিংবা আঙুলে কালি লাগাব বলে তারপর সে জন্য দৌড়াদৌড়ি এত বড় কাজে চলবে কেন?’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement