West Bengal Government

গাড়ি-প্রহরীতে তৈরি মন্ত্রীরা, নেই শুধু দফতর

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে গত ১ জুন সম্প্রসারিত হয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা। মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর সঙ্গে ব্রিগেডের ময়দানে শপথ নেওয়া আরও পাঁচ জনের পরে লোকভবনে শপথবাক্য পাঠ করেছেন ৩৫ জন। কিন্তু মন্ত্রিসভার সেই প্রথম পাঁচ জন অফিস যান।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ ০৮:৩৮
Share:

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। —ফাইল চিত্র।

নীল বাতি লাগানো গাড়ি দুয়ারে প্রস্তত। পুলিশ-প্রহরী মজুত। মন্ত্রী মশাই বেরোনোর সময়ে সাজ সাজ রব আছে চেনা চেহারায়। কিন্তু গন্তব্য কই!

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে গত ১ জুন সম্প্রসারিত হয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা। মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর সঙ্গে ব্রিগেডের ময়দানে শপথ নেওয়া আরও পাঁচ জনের পরে লোকভবনে শপথবাক্য পাঠ করেছেন ৩৫ জন। কিন্তু মন্ত্রিসভার সেই প্রথম পাঁচ জন অফিস যান। কাজ করেন। বাকি ৩৫ জন যেতে পারছেন না এখনও! কারণ, তাঁদের কারও হাতে এখনও দফতর নেই। প্রায় প্রতি দিন গুঞ্জন ওঠে, দফতর বণ্টন হবে। কিন্তু হয় না! দফতরহীন মন্ত্রীরা নানা জনের কাছে খোঁজ নেন, কিছু খবর আছে? কেউ কিছু বলতে পারেন না। শর্বরীর প্রতীক্ষা যেন বেড়েই চলে!

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাতে রয়েছে এখনও ৪৩টি দফতর। পূর্ণমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের হাতে তিনটি, অগ্নিমিত্রা পালের কাছে দু’টি। ক্ষুদিরাম টুডু তিনটি, অশোক কীর্তনিয়া ও নিশীথ প্রামাণিক দু’টি করে দফতরের পূর্ণমন্ত্রী। বাকি ৩৫ জনের মধ্যে ১৩ জন পূর্ণমন্ত্রী, তিন জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী। যত ক্ষণ না সরকারি ভাবে বাকি দফতর ভাগ হচ্ছে, এই ৩৫ জনেরই বসার কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ফাইল সই করা তো পরের কথা!

স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী প্রবল ব্যস্ত। সকালে নলবনে সরকারি কর্মসূচি সারছেন, তো বিকেলে দিল্লি। নবান্ন তো বটেই, মাঝে বিমানবন্দরেও শিল্প সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরে নিচ্ছেন। সন্ধ্যায় শহরে অনুষ্ঠান, আবার রাতে কাঁথির বাড়ির পথে। এই ব্যস্ততার উল্টোদিকে কী করছেন অন্য মন্ত্রীরা? কেউ কেউ মাঝেমধ্যে চলে আসছেন বিধানসভায়। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন ও বিদ্রোহের উপরে টিপ্পনী কাটছেন। কেউ উদাসী ভঙ্গিতে বলছেন, ‘‘বুঝতে পারছি না কিছুই। মন্ত্রী যখন হয়েছি্, দফতর তো কিছু একটা হবেই!’’ এক মন্ত্রী আবার সংবাদমাধ্যমের সামনে আসার সময়ে গলায় স্টেথোস্কোপটা ঝুলিয়ে নিচ্ছেন। যাতে তাঁর পছন্দের দফতরের বার্তা ফুটে ওঠে প্রতীকেই! কোনও মন্ত্রী আবার সমাজমাধ্যমকে হাতিয়ার করে মুখ্যমন্ত্রী তথা দলীয় নেতৃত্বকে পরিস্থিতি সংক্রান্ত বার্তা দিচ্ছেন।

রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভা একেবারেই কলকাতা-কেন্দ্রিক নয়। জেলার গুরুত্ব সেখানে দৃশ্যমান। দফতরহীন অনেক মন্ত্রীই জেলায় জেলায় নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে মনোনিবেশ করতে চাইছেন। কিন্তু সেখানেও অস্বস্তি আছে। বিধানসভা ভোটে বিপর্যয়ের পরে বহু পুরসভা ও পঞ্চায়েতে তৃণমূলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা গা-ঢাকা দিয়েছেন। অনেকে গ্রেফতার হচ্ছেন। এমতাবস্থায় পরিষেবার কাজের জন্য স্থানীয় মানুষ মন্ত্রী বা বিধায়ককে পেলে আবেদন জানাচ্ছেন। আবার কারও গ্রেফতারি এড়ানোর জন্য কোনও কোনও ক্ষেত্রে আর্জি আসছে। মন্ত্রীরা বিলক্ষণ জানেন, এ সব ক্ষেত্রে তাঁদের সাধ্য সীমিত। কিন্তু দফতরভিত্তিক সরকারি দায়িত্ব না-আসা পর্যন্ত উটকো আবদার শুনে যেতে হচ্ছে!

মন্ত্রিসভা তৈরি হয়ে যাওয়ার পরে দফতর বণ্টনে গেরোটা ঠিক কোথায়, কোনও মহলেই স্পষ্ট ধারণা নেই। বিজেপির একটি সূত্রের খবর, দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সবুজ সঙ্কেত নিয়ে সম্প্রসারণের দু’দিনের মধ্যেই বাকিটা ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তার পরেও ঘোষণার ক্ষেত্রে কোথায় জটিলতা তৈরি হল, সেই প্রশ্নে নানা জল্পনা চলছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলে দিয়েছেন, সরকারের কাজে দল হস্তক্ষেপ করবে না— এটাই তাঁদের নীতি। তাই এই নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। একই সঙ্গে জিতে আসা বিধায়কদের মধ্যে পাঁচ জন শপথের পরেই দফতর হাতে পেয়ে কাজ শুরু করে দিলেন আর বাকিদের জন্য পৃথক ফল হল, এই নিয়ে বিজেপি নেতাদেরও দলের অন্দরে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। একটি সূত্রের ইঙ্গিত, এরই মধ্যে কয়েক জন পছন্দের দফতরের কথা বলতে গিয়েছিলেন। প্রত্যাশিত ভাবেই তাতে ফল মেলেনি। বিজেপির এক বিধায়কের কথায়, ‘‘কোনও ব্যক্তিকে নিয়ে টানাপড়েন থাকলে সেটা মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের আগেই মিটে গিয়েছে। এখন নিশ্চয়ই কিছু পদ্ধতিগত সমস্যা হয়ে থাকবে।’’

বিলম্ব দেখে কেউ কেউ মনে করাচ্ছেন, কর্নাটকের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আর গুন্ডু রাওয়ের কথা। যিনি মাত্র দু’জন মন্ত্রী নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরাও ছিলেন কেবলই দফতরহীন মন্ত্রী! পরে দলের তরফে বার্তা পেয়ে তাঁদের কিছু কাজ দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পরে বাংলা এখন নানা মডেল ভাঙছে, আবার নতুন নতুন মডেল গড়ছে!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন