কালীঘাট-কাণ্ড

হাওড়ার হোটেলে মৃতের সঙ্গী ধৃত দিল্লিতে

কালীঘাটে দম্পতিকে কোপানো হয়েছিল শনিবার রাতে। ১২ ঘণ্টা পরে রবিবার সকালে মূল অভিযুক্তের মৃতদেহ মিলেছিল হাওড়ার একটি অতিথিশালায়। সেই ঘটনার পরে রহস্যজনক ভাবে পলাতক মূল অভিযুক্তের সঙ্গীকে দিল্লি থেকে সোমবার সকালে পাকড়াও করল পুলিশ।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০০:৫২
Share:

কালীঘাটে দম্পতিকে কোপানো হয়েছিল শনিবার রাতে। ১২ ঘণ্টা পরে রবিবার সকালে মূল অভিযুক্তের মৃতদেহ মিলেছিল হাওড়ার একটি অতিথিশালায়। সেই ঘটনার পরে রহস্যজনক ভাবে পলাতক মূল অভিযুক্তের সঙ্গীকে দিল্লি থেকে সোমবার সকালে পাকড়াও করল পুলিশ। ধৃতের নাম দীপক সিংহ। বাড়ি বালির দুর্গাপুর মাকালতলায়। পুলিশের ধারণা, ধৃত ওই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করেই খুনের কিনারা করা সম্ভব হবে।
শনিবার সকালে লাল স্ট্রাইপ দেওয়া নীল টি-শার্ট পরে পিঠে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল দীপক। রাস্তায় প্রতিবেশী কিছু যুবকের সঙ্গে দেখা হতেই জানতে চেয়েছিল, ‘গেঞ্জিটা কেমন বল তো?’ এর পরেই তাড়া আছে বলে হনহন করে এগিয়ে গিয়েছিল বালি স্টেশনের দিকে। যদিও সেই দিনের পরে আর ‘বাবলুদা’কে (দীপকের পাড়ার নাম) পাড়ায় দেখেননি কেউ। সোমবার সেই বাবলুদাকে সুপারি কিলার বলে প্রথমে মানতে চাইছিলেন না কেউই। যেমন দীপকের পরিচিত এক যুবক শাজিদ সরকার বলেন, ‘‘খুব ঠান্ডা মাথার ছেলে। আড্ডা দিতে এসে সকলকে হাসায়। রাস্তায় কোনও গণ্ডগোল দেখলে উঠে যায়। সে-ই কি না এই কাজ করেছে?’’
রবিবার হাওড়ার ওই অতিথিশালায় রোশনলাল বরদিয়া নামে যে ব্যক্তির দেহ মেলে পুলিশ তাকে চিহ্নিত করে কালীঘাটের দম্পতিকে কোপানোয় মূল অভিযুক্ত বলে। এর পরেই রোশনলালের পলাতক সঙ্গীর খোঁজে নামে কলকাতা ও হাওড়া সিটি পুলিশ। রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তদন্ত শুরু হয়। পুলিশ জানায়, ওই যুবক খুব ভোরে গোলাবাড়ি থানার রোজমেরি লেন থেকে বেরিয়ে জিটি রোড ধরে সোজা হাঁটা দেয়। ফের তাকে দেখা যায় হাওড়া ব্রিজ থেকে জি আর রোড ধরে হাওড়া স্টেশনের দিকে যেতে। পরে স্টেশন চত্বরের ক্যামেরা পরীক্ষা করে দেখা যায়, ওই যুবক ৭ নম্বর গেট দিয়ে স্টেশনে ঢুকছে।
দীপকের স্ত্রী পুলিশকে জানান, ওই দিন ভোরে বাড়িতে এসেই প্রচণ্ড তাড়াহুড়ো করে জামাপ্যান্ট গুছিয়ে নেয় সে। অফিসের কাজে গুয়াহাটি যেতে হচ্ছে বলে মিনিট কুড়ি বাড়িতে থেকেই বেরিয়ে পড়ে। পুলিশের অনুমান, এর পরেই বালি স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেনে সে হাওড়া যায়। রেল পুলিশের সাহায্যে তদন্তকারীরা জানতে পারে, ৮টা ১৫ মিনিটের পুর্বা এক্সপ্রেসে ওঠে দীপক।
পুলিশ আরপিএফের সাহায্যে রবিবার রাতেই সব স্টেশনে দীপকের ছবি পাঠায়। তল্লাশি চালিয়ে ওই যুবককে পূর্বা এক্সপ্রেসের প্যান্ট্রি কার থেকে আটক করে তুলে দেওয়া হয় দিল্লির রেলপুলিশের হাতে। এই খবর পাওয়ার পরে সোমবার দুপুরে কলকাতা পুলিশের একটি দল দীপককে আনতে দিল্লি যায়।
পুলিশের অনুমান, নিজের আত্মীয়ের উপরে বদলা নিতেই দীপককে নিয়ে কালী টেম্পল রোডের ওই দম্পতির বাড়িতে যায় রোশনলাল। ঘটনার পরে দু’জনেই এসে হাওড়ার ওই অতিথিশালায় ওঠে। পুলিশের দাবি, দীপক এক জন ভাড়াটে খুনি। রোশনলাল তাকে ভাড়া করে ওই দম্পতিকে আক্রমণ করে। অস্ত্রশস্ত্র এনেছিল দীপকই। কিন্তু শেষমেশ নরেন্দ্র ও সরলার মেয়ে রোশনলালকে চিনে ফেলায় পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
এ দিন দীপকের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, লোহার গ্রিলের দরজার ভিতর থেকে তালা বন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পরে ছাদ থেকে এক মহিলা উঁকি দিয়ে জানালেন, বাড়িতে কেউ নেই। স্থানীয়েরা জানান, দীপকের বাবা রামানুজ সিংহ আরপিএফের কনস্টবেল ছিলেন। দীপকেরা চার ভাই। সকলেই এক বাড়িতে থাকেন। একটি পরিবহণ সংস্থায় কাজের সুবাদে হাওড়া স্টেশনের পার্সেল বিভাগে কুলির কাজ করত ওই যুবক।
পুলিশ জানায়, শনিবার রাত থেকেই বালিতে দীপকের খোঁজ শুরু করে পুলিশ। কিন্তু বাড়ি খুঁজে পাওয়া যায়নি। রবিবার ভোরে বাড়ি আসে দীপক। পরে ওই দিন বিকেলে বাড়ি খুঁজে পেয়ে পরিবারের লোকেদের জেরা শুরু করে পুলিশ। রাতে রোশনলালের স্ত্রী ও ধৃত দীপকের ভাই গৌতম সিংহকে কালীঘাট থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। রোশনলালের স্ত্রী জানান, দিন সাতেক ধরে দীপকের সঙ্গে তাঁর স্বামীর মেলামেশা চলছিল। কেন, জানেন না।
পুলিশ জানায়, সাত বছর আগে রেসকোর্সে নরেন্দ্র জৈনের বুকির ব্যবসার অংশীদার ছিল রোশনলাল। তবে প্রায় এক বছর ওই ব্যবসা চললেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে নরেন্দ্র জৈনের লেক মলে মুদির দোকান রয়েছে। কিন্তু রোশনলালের কোনও ব্যবসা ছিল না। তার অনেক ধার ছিল বলেও অভিযোগ। পুলিশ জানায়, হতাশায় ভুগে রোশনলাল দিন কয়েক আগে ফিনাইল খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু সাত বছর আগের ব্যবসার সমস্যা নিয়ে কেন নরেন্দ্রবাবুর উপরে হামলা করতে যাবে রোশনলাল, প্রশ্ন উঠছে তা নিয়ে। কেনই বা ওই দম্পতিকে খুনের চেষ্টার পরে দীপককে সঙ্গে নিয়ে হাওড়ার অতিথিশালায় গিয়ে উঠল রোশনলাল? কেন সাতসকালে অতিথিশালা থেকে পালিয়ে গেল দীপক? পুলিশ জানায়, ধৃতকে জেরা করে উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement