রানী চন্দের প্রখর স্মৃতিশক্তির কারণে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘শ্রুতিধরী’। মানুষের মনের কথা, সময়ের স্পন্দন ও প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দ রানীর লেখায় ফুটে ওঠে, এক প্রতিভাবান শিল্পীর গভীর পর্যবেক্ষণের পরিচয় দেয়। তবে সাহিত্যচর্চার আড়ালে শিল্পী রানী চন্দের পরিচয় আজকের প্রজন্মের কাছে অনেকটাই বিস্মৃত। মূলত নন্দলাল বসুর দেখানো পথেই তাঁর শিল্পচর্চার অগ্রগতি। নিজেই লিখেছেন, “নন্দদার সঙ্গই ছিল শিক্ষা। চলতে চলতে কত শেখাতেন, কত দেখাতেন। কত রেখা, কত ছন্দ যেন নৃত্য করে বেড়াচ্ছে চতুর্দিকে।” সমসাময়িক বিবরণ অনুযায়ী, রানী স্কেচ ছাড়াও ফ্রেস্কো পেইন্টিং, আলপনার মতো মাধ্যমে দক্ষতার ছাপ রেখেছিলেন। আজ তাঁর অল্প কিছু শিল্পকর্মেরই হদিস পাওয়া যায়— যার বেশির ভাগই একটি পোর্টফোলিয়ো থেকে পাওয়া লিনোকাট। পোর্টফোলিয়োর ভূমিকায় ছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের দরাজ প্রশংসা, তার প্রকাশক ছিলেন শিল্পীর দাদা, এ দেশের ছাপাইছবি-শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ মুকুলচন্দ্র দে।
লিনোকাট হলো ছাপচিত্র তৈরির একটি বিশেষ পদ্ধতি, যেখানে কাঠের বদলে নরম ও মসৃণ লিনোলিয়ামের চাদর ব্যবহার করা হয়। এই ছাপচিত্রগুলি সাদা-কালোর বৈপরীত্যে গ্রামীণ বাংলার এক মায়াবী জগৎ তৈরি করে। রানীর লিনোকাটগুলোর মধ্যে এক ধরনের বলিষ্ঠতা ছিল, যার মাধ্যমে তিনি এক অদ্ভুত ছন্দ ও নকশা ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর কাজে সাঁওতাল নাচ, বাউল ও আটপৌরে গৃহস্থালির দৃশ্য প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক্স-প্রিন্টমেকিং বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা, তাঁদের শিক্ষক সুজয় মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়, রানী চন্দের শিল্পকর্মের একটি সমকালীন শৈল্পিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে এই বিভাগের আট জন শিক্ষকও শামিল এ কাজে। ললিতকলা আকাদেমির তৃতীয় ‘প্রিন্ট বিয়েনাল’-এর অংশ হিসেবে রানী চন্দের ২৫টি লিনোকাটের (উপরের ছবি) পাশাপাশি, শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের তৈরি আরও ৫০টি সাদা-কালো লিনোকাট (নীচে) মিলিয়ে প্রদর্শনী ‘অ্যাপেন্ডস: ওয়ার্কস ইন রেসপন্স টু রানী চন্দ’স লিনোকাটস’ চলছে শেক্সপিয়র সরণির ‘গ্যালারি ৮৮’-এ, ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে।
রানীর লিনোকাট ছাড়াও, রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে তাঁর কারাজীবনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক লেখা জেনানা ফাটক-ও প্রেরণা হয়েছে এই শিল্পীদের। প্রায় এক শতাব্দী আগের শিল্পকৃতির নিরিখে আজকের প্রতিক্রিয়া, এবং মূল বইটির পরিপূরক বা সহায়ক দৃশ্যকল্প তুলে ধরাই লক্ষ্য। এ প্রচেষ্টা কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এক উন্মুক্ত খসড়া, ভবিষ্যতের গবেষণা ও সৃষ্টির পথ উন্মোচনের। প্রদর্শনী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, সোমবার দুপুর ২টো থেকে, মঙ্গল থেকে শনিবার সকাল ১১টা-সন্ধ্যা ৭টা; রবিবার ছুটি।
১২৫ বছরে
“দরিদ্রজীবনের যথার্থ অভিজ্ঞতা এবং সেই সঙ্গে লেখবার শক্তি তাঁর আছে বলেই তাঁর রচনায় দারিদ্র্য-ঘোষণার কৃত্রিমতা নেই,” ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকায় লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে। কয়লাকুঠির শ্রমজীবী নরনারীর জীবনসংগ্রামের চুম্বকে এক বৃহত্তর, মানবিক জীবনসত্য তুলে ধরেছিলেন শৈলজানন্দ, আজও যার প্রাসঙ্গিকতা ফুরোয়নি। তাঁর জন্মের ১২৫ বছরে শৈলজানন্দের সাহিত্যকৃতিকে এই প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ব্রতী হয়েছেন ওঁর দৌহিত্র মিলন মুখোপাধ্যায়, নানা কর্মকাণ্ডের একটি— শৈলজা পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা ‘শৈলজানন্দ ১২৫: গল্প পঞ্চবিংশতি’ (ছবি, প্রচ্ছদ থেকে)। অতিথি-সম্পাদক শুভেন্দু দাশমুন্সীর চয়নে শৈলজানন্দের ২৫টি গল্প: কয়লাকুঠি, জীবনবোধ, মানবিক সম্পর্ক, নারীচেতনা সেখানে গ্রন্থনসূত্র। ‘ইগারো ও নীল’ গল্পের গ্রাফিক নভেল-রূপ, টালা পার্কে কালীপুজো সমিতির স্মারক পত্রিকায় প্রকাশিত শৈলজানন্দের একটি লেখাও মুদ্রিত।
ভ্রমণ-ছবি
শুধু ভ্রমণেই নয়, ভ্রমণ নিয়ে লেখালিখি ও ছবি তোলাতেও বাঙালির দক্ষতা প্রশ্নাতীত। এই কাজগুলি প্রচারের আলোয় নিয়ে আসতে কলকাতা তথা বাংলার ভ্রমণ-লেখকেরা গড়েছেন ‘ট্রাভেল রাইটারস’ ফোরাম’, প্রতি বছর প্রদর্শনী, আলোচনা-সহ নানা কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ করেন তার সদস্যেরা। কাছে-দূরে, দেশ-বিদেশে ঘুরে ক্যামেরাবন্দি করা ওঁদের আলোকচিত্রের সম্ভার থেকে তিন জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিচারকের বাছাই করা সেরা ১০০টি ছবির প্রদর্শনী হবে গ্যালারি গোল্ড-এ, এ বছর বিংশতিতম আয়োজন। আগামী ২০-২২ ফেব্রুয়ারি, রোজ দুপুর ৩টে থেকে রাত ৮টা। আলোকচিত্রে উদ্ভাসিত হবে দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার— প্রকৃতি, মানুষও।
জরুরি কাজ
দেশের গ্রন্থাগারগুলির নির্ভরযোগ্য তথ্যপঞ্জি গড়তে ‘লাইব্রেরি ডিরেক্টরি’ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। ভারতের সব গ্রন্থাগারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি ও প্রকাশের দায়িত্ব পেয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীন সেন্ট্রাল রেফারেন্স লাইব্রেরি (সিআরএল)। এরই অঙ্গ হিসেবে সম্প্রতি বেরোল ডিরেক্টরি অব লাইব্রেরিজ়: ওয়েস্ট বেঙ্গল বইটি। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলার সরকারি, শিক্ষামূলক ও বিশেষ ধরনের— সব গ্রন্থাগারের তালিকা; প্রতিটির ঠিকানা ইমেল ফোন নম্বর, বই ও পাণ্ডুলিপির সংখ্যা-সহ নানা জরুরি তথ্য সেখানে। জেলা অনুযায়ী সাজানো, রাজ্যের যে কোনও প্রান্তের গ্রন্থাগারের তথ্য পাওয়া যাবে সহজে। জরুরি কাজটি সম্পন্ন হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনশিক্ষা প্রসার ও গ্রন্থাগার পরিষেবা বিভাগ, ন্যাশনাল লাইব্রেরি-সহ বহু গ্রন্থাগার, গ্রন্থাগারিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্যে।
সঙ্গীতার্ঘ্য
বিদুষী শোভা গুর্তুকে শতবর্ষে স্মরণ করছে সঙ্গীত রিসার্চ অ্যাকাডেমি, দু’দিন ব্যাপী ঠুংরি উৎসবে। ঠুংরি দাদরা কাজরি ঝুলার এই অবিস্মরণীয় শিল্পীর গায়কি আজও আলোচনার আকর। পাকিজ়া, ম্যায় তুলসী তেরি অঙ্গন মে ছবিতে গান গেয়েছেন, সম্মানিত পদ্মভূষণেও। ২০০৪-এ প্রয়াত শিল্পীর সম্মানে নিবেদিত ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে অ্যাকাডেমির লন-এ শাস্ত্রীয় ও উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সমারোহ। গুণী প্রবীণ শিল্পীদের পাশাপাশি রাজশ্রী পাঠক কল্যাণ মজুমদার সুচেতা গঙ্গোপাধ্যায় অপরাজিতা লাহিড়ি আলি ও গনি মহম্মদ শ্রেয়া চট্টোপাধ্যায় রাজেন্দ্র প্রসন্ন প্রমুখের গীত ও বাদনে সঙ্গীতার্ঘ্য।
মঞ্চে আবার
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাজাহান নাটকের অভিনয় দেখে বঙ্গবাণী-সম্পাদক, কবি বিজয়চন্দ্র মজুমদারের মন্তব্য, জাতীয় গানের সময়ে মহামায়ার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে তাঁকে মোটেই বীরনারী মনে হয় না। সহমত দ্বিজেন্দ্রলাল বললেন, “তা তো হয়ই না। মহামায়ার ভাব তখন এমনি-ধারাই হওয়া উচিত,” বলে চেয়ারের উপরে সিধে হয়ে বসে, দু’বাহু পরস্পর বদ্ধ করে দৃপ্ত ভাব ধারণ করলেন, চোখে ঠিকরে পড়তে লাগল দীপ্তিমান শক্তি: স্মৃতিকথায় লিখেছেন হেমেন্দ্রকুমার রায়। পরাধীন দেশবাসীর মনে দেশপ্রেম জাগানো বিখ্যাত এই নাটকে অভিনয় করেছেন অমরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে তারাসুন্দরী, সেকালের তাবড় শিল্পীরা। এই সময়েও এ নাটকের প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মধুসূদন মঞ্চে ফিরছে সাজাহান, ‘থেসপিয়ানস’-এর প্রযোজনায়, পার্থ মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়।
মৃণাল-মঞ্জুষা
মৃণাল ও গীতা সেনের জীবন ছুঁয়ে ছিল, এমন অনেক কিছু সম্প্রতি জীবনস্মৃতি আর্কাইভ-কে দিয়েছেন ওঁদের পুত্র কুণাল সেন ও পুত্রবধূ নিশা রূপারেল সেন। সেখানে যেমন রয়েছে গীতা সেনের শাল গয়না জাঁতি সিঁদুরকৌটো পাউডার-কেস, তেমনই দিনলিপি লেখার খাতা ও ডায়েরি (ছবি), খণ্ডহর ছবির জন্য পাওয়া সেরা সহ-অভিনেত্রীর পুরস্কার। মৃণাল সেনের দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের সম্মাননাপত্র, তৃতীয় ভুবন বইয়ের প্রুফ, না-হওয়া ছবি ভুবনেশ্বরী-র চিত্রনাট্য, কলকাতা ৭১ প্রসঙ্গে বিদেশি সমালোচকদের মতামত জানিয়ে গীতা সেনকে লেখা চিঠি, মৃণাল সেনের জন্মদিনে গীতা সেনকে লেখা সুরমা ঘটকের চিঠি; টুকরো কাগজে নানা সময়ের ছোট ছোট লেখা, চিন সফরে মৃণাল সেনের তোলা আলোকচিত্র, সেও দেখার। এই সবই সংরক্ষিত থাকবে সল্টলেকে ‘অন্য থিয়েটার’ ভবনে স্থায়ী প্রদর্শকক্ষ ‘মৃণাল-মঞ্জুষা’য়, আজ বিকেল ৫টায় গুণিজন-উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান সেখানে।
সুন্দরীরা
গোলাপের সৌন্দর্য তার রঙে, না আকারে? যদিও ব্যাখ্যা করে তার রং, পাপড়ি, গড়নের কাছে পৌঁছতে পারলাম, তবু নির্দিষ্ট ভাবে বলতে পারলাম কি, সৌন্দর্য ঠিক কোনখানে? এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যোগেন চৌধুরী। সৌন্দর্যচেতনা নিয়ে শিল্পীর এই অনুভব ফিরে এল, অষ্টাশিতে পৌঁছনোর পূর্বমুহূর্তে তাঁর নতুন কাজের প্রদর্শনীর শিরোনামে— ‘সুন্দরী’। প্রসিদ্ধ এক চিত্রপটের একদা এমনই নাম দিয়েছিলেন তিনি, বাংলা পটচিত্রের সুডৌল গড়নকে নিজস্ব চিত্রভাষা-সংযোগে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। এ বার তা ফিরে এল বিকেলবেলার রঙে, শিরোনামে রবীন্দ্রনাথ ছুঁয়ে: ‘মধুর, তোমার শেষ যে না পাই’। ক্রেয়নে, সম্প্রতি আঁকা কুড়িটি ছবির প্রদর্শনী চলছে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে, দেবভাষা বই ও শিল্পের আবাসে। ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, ছুটির দিন বাদে রোজ ২টো-৮টা।
বাঙালির মন
ক্যান্সার-জয়ীরা বলছেন যুদ্ধজয়ের কথা। ছাত্রেরা মন দিয়ে শুনছেন, চাকরির বাজারে কী ছাপ ফেলছে এআই। ভরা প্রেক্ষাগৃহে আলোচনা ‘বাংলা কে পড়ে, কে লেখে’ বা ‘বাঙালি কি ভদ্রলোক’ নিয়ে। সাংবাদিকতার পড়ুয়ারা জেনে নিচ্ছেন এ পেশার ভবিষ্যৎ, বিশেষজ্ঞের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাঠ নিচ্ছেন ভবিষ্যতের নাগরিক। ‘বয়স্কদের টিকা’, ‘চোখের যত্ন নিন’, ‘ইউরোলজির চিকিৎসা’ নিয়ে কথায় প্রবীণদের, আবার ‘স্থূলতা কমান’ ও সাইবার-অপরাধের আলোচনায় অল্পবয়সিদের ভিড়। সমাজের নানা স্তরের মেয়েদের কতটা উন্নতি ঘটানো গেছে তার হদিস, রবীন্দ্রসঙ্গীতের কর্মশালা— এই সব নিয়ে হয়ে গেল ‘বাংলা ওয়ার্ল্ডওয়াইড’ আয়োজিত বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন, গত ৬-৮ ফেব্রুয়ারি সল্টলেকে। কলকাতা, ভারত ও প্রবাসের বাঙালিরা তো ছিলেনই, ছিলেন বাংলা মাতৃভাষা না হলেও মনেপ্রাণে বাঙালি— এমন কলকাতাবাসীরাও।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে