তারাতলায় গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ার পর চলছে উদ্ধারকাজ। —নিজস্ব চিত্র।
তারাতলার নির্মাণস্থলে কাজে ঢোকার আগে ভিডিয়ো কলে স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘‘পরে ফোন করব।’’ সেই ফোন আর পাননি উত্তর ২৪ পরগনার শ্যামনগরের বাসিন্দা শিখা কর্মকার। বিপদের পরে খোঁজও পাননি তিনি। শেষমেশ শুক্রবার স্বামী সুমন কর্মকারকে এসএসকেএম হাসপাতালের মর্গে পেলেন শিখা। ভিডিয়ো কলে দেখা সুমনের গেঞ্জি এবং বাঁ হাতের কাটা বুড়ো আঙুল দেখেই স্বামীকে শনাক্ত করেছেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতেই শিখা জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তারাতলায় কাজে এসেছিলেন সুমন। বুধবার সকালে ভিডিয়ো কল করেছিলেন তিনি। শিখা বলেন, ‘‘কিছু ক্ষণ কথা বলার পরে বলল, ‘এ বার কাজে ঢুকব। পরে আবার ফোন করব’। আর ফোন করল না।’’ এ দিনই শ্যামনগরের আর এক বাসিন্দা স্বপন মণ্ডলের দেহও শনাক্ত করেছেন পরিজনেরা।
বৃহস্পতিবার রাতে তারাতলার দুর্ঘটনাস্থল থেকে তিনটি দেহ উদ্ধার করে এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। তার মধ্যে স্বপন এবং সুমনের দেহ পরিজনেরাশণাক্ত করলেও আর একজনের পরিচয় রাত পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে চিকিৎসাধীন বিহারের মুঙ্গেরের বাসিন্দা মন্নু কুমার ও বাসন্তীর বাসিন্দা খালেক সর্দার এ দিন মারা গিয়েছেন। সব মিলিয়ে তারাতলার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১৬। এখনও ক্রিটিকাল কেয়ারে রয়েছেন রাজেশ রুইদাস ও বদন মুন্ডা। বিশ্ব প্রকাশের শারীরিক অবস্থা উন্নতি হওয়ায় তাঁকে এইচডিইউতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বাকি ১৪ জনের মধ্যে এ দিন ছুটি পেয়েছেন জৌর আলি গায়েন এবং মুস্তাকিন গায়েন নামে দু’জন।
বুধবার তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়েছিল। তার কিছু ক্ষণের মধ্যেই উদ্ধারকাজে নামে সেনা, এনডিআরএফ, পুলিশ, দমকল। বৃহস্পতিবার রাতে রেলের একটি দলও যোগ দেয়। এ দিনও দিনভর উদ্ধারকাজ চলেছে। দুপুরে পরিদর্শনে যান দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী। বিকেলে পরিদর্শনে যান কলকাতার নগরপাল অজয়কুমার নন্দ। সঙ্গে ছিলেন অন্য পুলিশকর্তারা। ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেন ফরেন্সিক দলও। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, আবহাওয়া ঠিক থাকলে শুক্রবার রাতের মধ্যেই উদ্ধারকাজ শেষ হয়ে যেতে পারে।
রেলের অক্সিকাটার, প্লাজ়মাকাটার যন্ত্র এ দিন উদ্ধারকাজে লাগানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পূর্ব রেলের সিনিয়র সেকশন ইঞ্জিনিয়ার অরুণকুমার মণ্ডল বলেন, ‘‘এনডিআরএফ আমাদের সাহায্য চেয়েছিল। তাই যন্ত্রপাতি নিয়ে আমরা এসেছি। লোহার বিম কাটতে অক্সিকাটার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।’’ উদ্ধারের এই দফায় ছোট-ছোট এলাকা নিখুঁত ভাবে স্ক্যান করা হচ্ছে। গোটা এলাকাকে ছ’টি সেক্টরে ভাগও করা হয়েছে। এনডিআরএফ-এর কমান্ডান্ট মণীশ রঞ্জন বলেন, ‘‘লাইফ ডিটেক্টর, সেন্সরের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করে জীবন বাঁচানোয় আমাদের অগ্রাধিকার।’’ এ দিন উদ্ধারকাজ দেখতে স্থানীয় কিছু লোকও হাজির হয়েছিলেন। তাঁদেরই এক জন সরস্বতী সিংহ জানান, তাঁর ছেলে বাবলু মাস দুয়েক এখানে কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি বেঙ্গালুরুতে কর্মরত। সরস্বতী বলেন, “ছেলেটা এখানে কাজ করলে কী হত, তা ভেবে শিউরে উঠছি।”
এ দিন বিকেলে এসএসকেএম-এ আসেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “১০ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাঁরা মোবাইল খুঁজছেন পরিজনকে ফোন করবেন বলে। ওঁদের ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” এর পরেই দু’জন ছুটি পান। তবে ট্রমা কেয়ারে এখনও চিকিৎসাধীন শ্যামনগরের বাসিন্দা, পেশায় ঢালাই মিস্ত্রি দেবাশিস দাস। স্থানীয় আরও ১৫ জন মিস্ত্রি, জোগাড়েকে নিয়ে মঙ্গলবার রাতে তারাতলায় এসেছিলেন তিনি। এ দিন ট্রমা কেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে দেবাশিসের স্ত্রী অন্নপূর্ণা বলেন, “প্রাণে বেঁচে গেলেও আর কাজ করতে পারবে কি না, জানি না। সংসার চলবে কী ভাবে?”
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নৈহাটি-বজবজ লোকাল ধরে দেবাশিস, সুমনদের সঙ্গে কাজে আসার কথা ছিল ধর্মেন্দ্র চৌধুরীর। এ দিন ট্রমা কেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, তারাতলায় সাত দিনের কাজ ছিল। দৈনিক মজুরি ছিল এক হাজার টাকা। তবে শেষমেশ আসা হয়নি তাঁর। কেন?
“পাঁচ বছরের মেয়েটা জড়িয়ে ধরে বলল, বাবা আজ বেরিয়ো না। ভাগ্যিস, ওর কথা শুনে আর বেরোইনি!”, বলছেন ধর্মেন্দ্র।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে