ছবি: শুভাশিস ভট্টাচার্য।
একটা বর্ণময় চরিত্র। ভালয়-মন্দয়, দোষে-গুণে হৃদয় ধমনী নিয়ে ঠিক একটা মানুষের মতো পাড়াটাও। শুধু একটা থাকার জায়গা তো নয়— চেতনার রঙে কখনও সে রঙিন, কখনও বা উপলব্ধির ছোঁয়ায় জীবনের নীরব সাক্ষী।
অতীতে ভবানীপুরের চাউলপট্টি রোড, পরে নাম বদলে সাউথ সুবার্বন স্কুল রোড, আজকের সুহাসিনী গাঙ্গুলি সরণি— আমারই পাড়া। আশুতোষ মুখার্জি রোড থেকে শুরু করে সুহাসিনী গাঙ্গুলি সরণি, হরিশ মুখার্জি রোড পেরিয়ে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট ও মদন পাল লেনের সংযোগস্থলে মিশেছে। পাড়ার চৌহদ্দির মধ্যে পড়ে স্কুল রো, গোবিন্দ বোস লেন।
সেই পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিক থেকে এ পাড়ায় বসবাস শুরু। শুরুটা যদিও খুব একটা সুখের ছিল না। ছোটবেলায় ছুটি কাটাতে কলকাতায় এলেও দেশভাগের পরে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নতুন বাস্তু, নতুন শিকড়ের সন্ধান। এক দিকে দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতা, অন্য দিকে অতিবাম রাজনীতির ঝড়। সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় ছিল সেটা।
এখানে বসত বাড়ি তৈরির সময়ে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। পূর্বপুরুষদের কেনা জমিটি দখল করেছিল একটি ক্লাব। পরে জায়গাটির দখল নিতে গেলে ক্লাবের সদস্যরা প্রায় আমাদের ঠেলে ধাক্কা দিয়ে জমি থেকে বার করে দিয়েছিল। পরে এক বন্ধুর দাদার সাহায্যে এবং ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে চড়া দামে ইট-বালির ফরমায়েশ দিয়ে শুরু হয় বাড়ি তৈরির কাজ।
এ পাড়ায় এখনও গথিক থামের গায়ে কাঠের খিলানযুক্ত বারান্দাওয়ালা বাড়িগুলি যেমন অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে তেমনই নবনির্মিত বহুতল যেন আধুনিকতার জয়যাত্রা ঘোষণায় রত। অতীতের পাড়া আর আজকের পাড়াটা যেন দুই জগৎ। সময়ের সঙ্গে এসেছে পরিবর্তন তবু পাড়াটা শান্তিপূর্ণ, নির্ঝঞ্ঝাট। একে একে বাড়িগুলি ভেঙে তৈরি হচ্ছে বহুতল। বহুদিনের পরিচিত বাড়ির মালিকও যেন জনসমুদ্রে হারিয়ে যাচ্ছেন। পরিবর্তে যাঁরা আসছেন পাড়ার পুরনো বাসিন্দাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময় বা সুযোগ তাঁদের নেই। আগে পাড়ায় কী হচ্ছে, না হচ্ছে এ নিয়ে পাড়া-পড়শি চিন্তাভাবনা করতেন, সুখ-দুঃখের খবর নিতেন। সময়ের সঙ্গে এ পাড়ায় গুজরাতি ও পঞ্জাবি সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। মিশ্র সংস্কৃতি সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় আছে। দেখে ভাল লাগে কোনও সমস্যায় বাঙালিদের পাশাপাশি অবাঙালিরাও পাশে এসে দাঁড়ান।
আগে পাখির ডাকে ভোর হলেও এখন সকালটা শুরু হয় যানবাহনের শব্দে। ঘরের জানলাটা খুললে চোখের সামনে মাকড়সার জালের মতো কেবলের তারের জট।
অন্য পাড়ার মতোই উন্নত হয়েছে নাগরিক পরিষেবা। নিয়ম করে জঞ্জাল সাফাই, রাস্তা পরিষ্কার, আলোক স্তম্ভে জোরালো আলো বসেছে ঠিকই তবে পাড়ার পার্কিং সমস্যা এক এক সময় বিব্রত করে তোলে। আশুতোষ মুখার্জি রোড এবং হরিশ মুখার্জি রোডে নো-পার্কিং থাকায় আমাদের পাড়াটাকে অনেকেই পার্কিং-এর জন্য ব্যবহার করেন। এক এক সময় তো গাড়ি নিয়ে ঢুকতে বেরোতেও সমস্যা হয়। তবে পাড়ার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা সব দিক থেকেই ভাল। কাছেই মেট্রো স্টেশন। পাড়ার কাছেই হরিশ মুখার্জি পার্কে এলাকার মানুষ সকালে-সন্ধ্যায় বেড়াতে যান। পাড়ার ফুটপাথগুলি দখলমুক্ত তাই সহজে হাঁটা যায়।
পাড়াতেই রয়েছে দু’টি স্কুল। ভবানীপুর গার্লস স্কুল আর সাউথ সুবার্বন স্কুল। কাছেই মিত্র ইনস্টিটিউশন। ছেলে-মেয়েদের যাতায়াত আর স্কুল চলাকালীন সেই পরিচিত শব্দটাও যেন জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি ২৩ ও ২৬-এ জানুয়ারির প্রভাতফেরিও এ পাড়ার এক ঐতিহ্য।
পাড়ার খেলাধুলোর পরিবেশটা আজও টিকে আছে। সামনের গলিতেই ছোটরা ক্রিকেট, ফুটবল খেলে। আর হরিশ পার্কে মাঝে মধ্যেই হয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, টুর্নামেন্ট, মেলা ইত্যাদি। কাছাকাছির মধ্যে রয়েছে পূর্ণ, বিজলি, ইন্দিরা, উজ্জ্বলা-র মতো বেশ কয়েকটি সিনেমা হল। এক সময়ে সেখানে সিনেমা দেখতে যাওয়ার আকর্ষণটা কিছু কম ছিল না। এখন সিনেমা দেখতে যাওয়া মানেই কোনও অভিজাত মলের মাল্টিপ্লেক্সে।
পাড়ার কথা লিখতে বসে মনে পড়ছে সেকালের কথা। পূর্ববাংলার কালীপুর থেকে কলকাতায় এসে প্রথমে থাকতাম শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিটে মামার ভাড়া করা বাড়িতে, তার পরে গড়িয়াহাটের ভাড়া বাড়িতে। তার পরে এ পাড়ায়। তখন সকাল থেকে শোনা যেত নানা ফেরিওয়ালার ডাক। আজ শুধু শোনা যায় কাগজওয়ালার ডাক। বাকি ফেরিওয়ালারা কি হারিয়ে গেল?
গড়িয়াহাটে থাকাকালীনই আমার রাজনীতিতে প্রবেশ। যদিও এ পাড়ায় বসবাসের সময় থেকেই আমার সঙ্গে সক্রিয় রাজনীতির যোগাযোগ বাড়ে। সেই কারণেই পাড়ার শেষে আদিগঙ্গার ঘাটের উপর হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট ও স্কুল রোডের কোনায় মণিকুন্তলা সেনের নির্বাচন উপলক্ষে যাতায়াত ছিলই। সেই সময়ে পাড়ার মানুষ এবং এলাকার অলিগলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেলাম।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে এক বার কাঁসারিপাড়ায় জানলার ধারে বসে এক জন আপন মনে কাজ করে চলেছেন। সামনে গিয়ে বললাম, ‘আমাদের প্রার্থীকে নিয়ে এসেছি।’ কাজে মগ্ন মানুষটি মাথা না তুলেই বললেন, ‘রেখে যান।’ তখনই খেয়াল করেছি এ অঞ্চলের মানুষ কিছুটা রক্ষণশীল। কেউ কেউ পূর্বপুরুষের পেশাটাকে ধরেই বেঁচে আছেন। এম এ পাশ করে আমহার্স্ট স্ট্রিট সিটি কলেজে পড়ানো শুরু করি, তার কয়েক মাস পরেই আশুতোষ কলেজে। সে সময় বাড়ি থেকে হেঁটেই কলেজে যেতাম।
এক সময় আমাদের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন পরিচালক নির্মল দে। সেই সূত্রে তাঁর কাছে বহু বার এসেছেন উত্তমকুমার। বেশ কয়েক বার তাঁকে দেখেছি নীচের উঠোনে দাঁড়িয়ে সিগারেটের সুখটানে মগ্ন। কাছেই ‘ইমেজ’ নামক জ্যোতিষবাবুর একটি ছবির স্টুডিও ছিল। সেখানে মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে যেতাম। আসতেন অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীও। ছবি তোলার বিষয়ে কথাবার্তা হত। মনে পড়ে পাড়ার ‘নীলকুঠির’ ধীরেন দে, বারীন চট্টোপাধ্যায়ের কথা।
এখন বেশ কিছু পুরনো বাড়ির রকে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট দোকান। পাড়াটার শেষ প্রান্তে দু’একটি রক থাকলেও আড্ডাটা কিন্তু চোখে পড়ে না। পাড়ার এই আড্ডাটাই ছিল মিলমিশ, যোগাযোগের ঠিকানা। আজ হাজারো বিনোদনের হাতছানি আর টেলিভিশনের রিয়ালিটি শো, সিরিয়ালের মাদকতায় ছেলেবুড়ো এতটাই আচ্ছন্ন যে তাঁরা আড্ডা দিতে বাড়ির বাইরে বেরোতেই চান না। তাই সন্ধ্যা গড়িয়ে একটু রাত হতে না হতেই রাস্তায় লোকজনের সংখ্যাটা বেশ কমে যায়।
যুগের হাওয়ায় পাড়া-প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়ার অভ্যাসটা যেমন হারালো তেমনই আন্তরিকতা, আত্মিকতার নটে গাছটিও মুড়োলো!
লেখক প্রাক্তন অধ্যাপক ও হস্তী বিশারদ