রেড রোড-কাণ্ডে ধরা দিলেন সাম্বিয়ার বন্ধু জনি

যাবতীয় লটবহর রাঁচিতে ফেলে এসে কলকাতায় পুলিশের কাছে ধরা দিলেন তৌসিফ সোহরাব ওরফে সাম্বিয়ার বন্ধু জনি। মঙ্গলবার সকালে একবালপুর থানায় গিয়ে নিজেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন জনি।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০১৬ ২১:০১
Share:

সাম্বিয়া সোহরাবের বন্ধু জনি

যাবতীয় লটবহর রাঁচিতে ফেলে এসে কলকাতায় পুলিশের কাছে ধরা দিলেন তৌসিফ সোহরাব ওরফে সাম্বিয়ার বন্ধু জনি। মঙ্গলবার সকালে একবালপুর থানায় গিয়ে নিজেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন জনি। পরে অবশ্য পুলিশ রেড রোড কাণ্ডে তাঁকে গ্রেফতার করে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে পেশ করে। এর আগে পুলিশ জনির দুই বন্ধু সাম্বিয়া এবং শানুকে গ্রেফতার করেছিল। সাম্বিয়া বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। শানুকে রবিবার রাতে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

Advertisement

পুলিশ সূত্রের খবর, সোমবার বিকেলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, জনি রয়েছে রাঁচিতে। সেইমতো জনির এক দাদাকে সঙ্গে নিয়ে গুন্ডাদমন শাখার একটি দল রাঁচিতে যায়। কিন্তু সেখানে জনির ডেরায় পৌঁছনোর আগেই জনি সেখান থেকে পালায়। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, রাঁচির লোয়ার বাজারে এক বন্ধুর বাড়িতে ছিল জনি। আর আগে পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ মামলায় তার নাম জড়ানোর পর কলকাতা থেকে পালিয়ে এসে এখানে লুকিয়ে ছিল জনি। কী করে পুলিশ নিশ্চিত হল যে ওই বাড়িতে জনি ছিল? গোয়েন্দারা জানান, ওই বাড়ি থেকে জনিকে না পাওয়া গেলেও তার ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, রাঁচিতে পুলিশ যাচ্ছে এটা জানতে পেরে জনি সোমবার বিকেলেই রাঁচি থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মঙ্গলবার সকালে একবালপুরের এক বন্ধুকে যোগাযোগ করেছিলেন জনি। পরে ওই বন্ধুকে নিয়ে একবালপুর থানায় যান জনি। সেখানে গিয়ে রেড রোড কাণ্ডে পুলিশ তাঁকে খুঁজছে বলে দাবি করেন। পরে লালবাজার থেকে গোয়েন্দারা থানায় পৌঁছে জনিকে নিজেদের হেফাজতে নেন। যদিও পুলিশের অন্য একটি অংশের দাবি, সোমবার রাঁচিতে জনির একাধিক ডেরায় তল্লাশি চললেও তাকে ধরা যায়নি। এর পরই জনির আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে, আত্মসমর্পণ করতে কলকাতায় আসছেন জনি। মঙ্গলবার সকালে পুলিশের এক জন সোর্স খিদিরপুর ফ্যান্সি মার্কেটের সামনে তাঁকে ঘোরাফেরা করতে দেখে। খবর যায় পুলিশকর্তাদের কাছে। এর পর পুলিশের ওই সোর্সই জনিকে একবালপুর থানায় নিয়ে যায়।

Advertisement

যদিও এ দিন আদালতের বাইরে জনির পরিবার জানিয়েছে, তিনি নিজেই পুলিশের কাছে ধরা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে একটি ভিডিও সংবাদমাধ্যমকে দিয়েছে জনির পরিবার। তাতে দেখা যাচ্ছে, জনি একবালপুর থানায় ঢুকছেন।

সোহরাব ও তাঁর বড় ছেলে আম্বিয়া কোথায়?

Advertisement

পুলিশের একাংশের ব্যাখ্যা, এই মামলায় প্রথমে তিন জনের নাম উঠেছিল। তাই এঁদের আগে পাকড়াও করা হয়েছে। কিন্তু সোহরাব বা তাঁর বড় ছেলে এই ঘটনায় সরাসরি যুক্ত নন। ফলে প্রথমেই তাঁদের গ্রেফতারের কথা ভাবা হয়নি। কিন্তু অভিযুক্তকে আড়াল করা ও তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ সোহরাব ও আম্বিয়ার বিরুদ্ধে উঠতেই পারে। এখনও তাঁদের ক্লিনচিট দেওয়া হয়নি। ‘‘কিন্তু সেই অভিযোগ নথিভুক্ত করা হবে কি না, সেটা উপরওয়ালাদের মর্জি। তাই সোহরাব বা আম্বিয়াকে গ্রেফতার করাটাও উপরওয়ালাদের নির্দেশের উপরে নির্ভর করছে,’’ বলছেন ওই গোয়েন্দা অফিসার।

এ দিন বেলা পৌনে দু’টো নাগাদ শানু এবং জনিকে ব্যাঙ্কশাল আদালতে নিয়ে আসে পুলিশ। নিরাপত্তার কড়াকড়ি করা হয়েছিল। বেলা দু’টোর পরে দু’জনকেই মুখ্য মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জয়রঞ্জন পালের এজলাসে তোলা হয়। জনির আইনজীবী রাজদীপ মজুমদার বলেন, তাঁর মক্কেল অডি গাড়িতে ছিলেন না। তিনি যে ওই গাড়িতে ছিলেন এমন কোনও প্রমাণও পুলিশের হাতে নেই। ঘটনার পরে জনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে তাঁর মা কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধানকে চিঠি লিখে তদন্তে সাহায্যের কথা জানিয়েছিলেন। জনি তদন্তে সাহায্য করতে প্রস্তুত, এ কথা জানিয়ে তাঁর আইনজীবী জামিনের আর্জিও জানান। শানুর আইনজীবী ফজলে আহমেদ খান বলেন, সাম্বিয়ার গাড়িতে ছিলেন শুধু এই সন্দেহে তাঁর মক্কেলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ষড়যন্ত্রের যে তত্ত্ব পুলিশ খাড়া করছে, তা-ও জোরালো হচ্ছে না। তাঁর দাবি, শানুও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। সরকারি কৌঁসুলি অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় আদালতে জানান, এই দু’জনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। আরও তদন্তের জন্য দু’জনকেই পুলিশি হেফাজতে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। শানু ও জনিকে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

প্রশ্ন উঠেছে, শানু ও জনি দোষ না করলে পালালেন কেন? ফজলের জবাব, ওই দু’জন পালাননি। তাঁরা আগাম জামিনের পথে যাওয়ার জন্য ভাবনাচিন্তা করছিলেন। এই আইনি অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে। এ দিন আদালত থেকে পুলিশের গাড়িতে ওঠার জন্য জনিও বলেন, ‘‘আমরা নির্দোষ।’’

পুলিশ সূত্রের খবর, ঘটনার পর সাম্বিয়া একা এবং জনি ও শানু এক সঙ্গে পালিয়েছিলেন। এ দিন শানু ও জনিকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার পর সন্ধ্যা থেকে লালবাজারে জেরা শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। পুলিশের একাংশ জানাচ্ছেন, শানুকে কাল রাত থেকে কয়েক দফা জেরা করেছেন গোয়েন্দা অফিসারেরা। তাতে তিনি বেশ কিছু তথ্য পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। এবং বার বার দাবি করেছেন, তিনি এবং জনি সাম্বিয়ার গাড়িতে ছিলেন না।

এক গোয়েন্দা অফিসার বলেন, ‘‘শানুর কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে না যে ও মিথ্যা কথা বলছে।’’ পুলিশের ব্যাখ্যা, এখন তিন জনই হেফাজতে রয়েছেন। প্রত্যেকের বয়ান নথিভুক্ত করার পরে তিন জনকে একসঙ্গে বসিয়ে জেরা করা হতে পারে। তাতেই সত্যটা বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করছেন গোয়েন্দারা।

তদন্তকারী সংস্থা সূত্রের খবর, এ দিন বিকেলেও পরিষ্কার হয়নি রেড রোডের ঘটনার দিন ঘাতক গাড়িতে সাম্বিয়া ছাড়া কারা কারা ছিল। লালবাজারে নিয়ে আসার পর শানুর পরে জনিও দাবি করেছেন তাঁরা ওই দিন ঘাতক গাড়িতে ছিলেন না। পরে অবশ্য তিন জন এক সঙ্গে কোলাঘাট হয়ে রাঁচিতে যান, শনিবার পর্যন্ত তিন জন একসঙ্গেই সেখানে ছিলেন। এর পরেই পুলিশি চাপে সাম্বিয়া কলকাতায় ফেরেন, শানু দিল্লি চলে যান। কিন্তু জনি সেখানেই থেকে যান। অন্য দিকে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ওই তিন জন ঘটনার পরে কলকাতা ছেড়েছিলেন স্কোডা গাড়িতে। এর আগে খিদিরপুর রোডে সাম্বিয়ার অডি গাড়িটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হেস্টিংস মোড় থেকে ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন সাম্বিয়া।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement