ধোঁয়াশায় ঢেকেছে কলকাতা। ছবি: পিটিআই।
বছর শুরুর দিনেই ‘খুব খারাপ’ কলকাতার বাতাসের গুণমান! বর্ষবরণের রাতে দেদার আতশবাজি পোড়ানোর জেরে কলকাতা শহরের প্রায় সব প্রান্তেই দূষণ বেড়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, গত কয়েক দিনের ছুটির ফুরসতে শহরের রাস্তায় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গাড়ি চলাচল। ফলে সব মিলিয়ে নতুন বছরের প্রথম দিনে বিস্তর ‘বিষ’ ছড়িয়েছে শহরের বাতাসে।
পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (ডব্লিউবিপিসিবি)-এর তথ্য বলছে, বছরের প্রথম দিনে শহরের বেশির ভাগ জায়গায় বায়ুর গুণমান (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই) ৩০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। পিএম ২.৫-এর নিরিখে সর্বোচ্চ একিউআই রেকর্ড হয়েছে যাদবপুরে— ৩৮০। পিছিয়ে নেই বিধাননগর কিংবা বালিগঞ্জও। বিধাননগরে সর্বোচ্চ একিউআই রেকর্ড হয়েছে ৩৫৩, বালিগঞ্জে ৩৬১। এ ছাড়া, ফোর্ট উইলিয়ামে ৩২১, রবীন্দ্র ভারতীতে ৩৪৮, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ৩৪৩ এবং রবীন্দ্র সরোবরে ৩১০ সর্বোচ্চ একিউআই রেকর্ড হয়েছে। ডব্লিউবিপিসিবি-র তথ্য বলছে, বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টে নাগাদও শহরের বেশির ভাগ জায়গায় বায়ুর গুণমান রয়েছে ‘খারাপ’ পর্যায়েই। যাদবপুরে ৩১৭, ফোর্ট উইলিয়মে ২৩৫, ভিক্টোরিয়ায় ২৮৩, রবীন্দ্র ভারতীতে ২৩৪, রবীন্দ্র সরোবরে ২১৪, বালিগঞ্জে ২৩৫ এবং বিধাননগরে ৩০৬ একিউআই রেকর্ড হয়েছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের এক কর্তা জানিয়েছেন, বছরের প্রথম দিন কলকাতার বেশির ভাগ জায়গায় একিউআই ছিল ‘খারাপ’ থেকে ‘খুব খারাপ’-এর পর্যায়ে। একিউআই শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে হলে ‘ভাল’, ৫১ থেকে ১০০ হলে ‘সন্তোষজনক’, ১০১ থেকে ২০০ হলে ‘মাঝারি’, ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘খারাপ’, ৩০১ থেকে ৪০০ হলে ‘খুব খারাপ’, ৪০১ থেকে ৪৫০ ‘ভয়ানক’ এবং ৪৫০-এর বেশি হলে ‘অতি ভয়ানক’ ধরা হয়। সেই হিসাবে যাদবপুরে বাতাসের গুণমান রেকর্ড হয়েছে ৩৮০, যা ‘খুব খারাপ’ পর্যায়ে পড়ে। দীর্ঘ ক্ষণ এই দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুধু তা-ই নয়, অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন বয়স্ক ও শিশুরাও।
পরিবেশবিজ্ঞানী স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘শীতকালে এমনিতেই ‘এয়ার ইনভার্শন’-এর ফলে ঠান্ডা বাতাস উপরের স্তর থেকে নীচে নেমে আসে এবং নীচের উষ্ণ বায়ুর সঙ্গে মিশে যেতে না পারায় ধূলিকণাগুলি স্থির হয়ে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি এক জায়গায় আটকে থাকে। তাই ধোঁয়াশাও বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি, বাতাসের আর্দ্রতা কম থাকায় ধুলো ও দ্বিতীয় পর্যায়ের দূষণের উপাদান বাতাসে অনেক ক্ষণ ছড়িয়ে থাকে। তার উপরে যে হেতু কলকাতা ও সংলগ্ন শহরতলিগুলিতে দেদার বাজি ফাটানো হয়েছে, তাতে ‘পার্টিকুলেট ম্যাটার’ বা দূষণ সৃষ্টিকারী কণাগুলিও বাতাসে এসে মিশেছে। ফলে বেড়েছে পিএম ২.৫ বা পিএম ১০-এর ঘনত্ব।’’ স্বাতীর কথায়, এ সবের জেরে বয়স্ক ও শিশুরা, কিংবা যাদের শ্বাসকষ্টজনিত নানা সমস্যা আছে, তাঁরা আরও বিপদে পড়বেন। ফলে এ ধরনের সমস্যা থাকলে খোলা জায়গায় বেশিক্ষণ না থাকাই ভাল।
পরিবেশ পর্যবেক্ষক সংগঠন ‘সবুজ মঞ্চ’-এর অভিযোগ, বুধবার রাত ১১টা থেকে শুরু করে প্রায় রাত ২টো পর্যন্ত দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ, গড়িয়া, কসবা, যাদবপুর, বেহালা, উত্তর কলকাতার নারকেলডাঙা, বেলেঘাটা, সিঁথি, বাগবাজার, জোড়াসাঁকো, বৌবাজার-সহ বিভিন্ন এলাকায় দেদার আতশবাজি পোড়ানো হয়েছে। সবুজ মঞ্চের তরফে সোমেন্দ্রমোহন ঘোষ সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে বলেন, ‘‘আতশবাজি পোড়ানোর জন্য রাত ১১টা ৫৫ মিনিট থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত যে ৩৫ মিনিটের সময়সীমা বেধে দিয়েছিল আদালত, সেই নির্দেশ লঙ্ঘন করা হয়েছে। রাত সাড়ে ১২টা তো দূরের কথা, প্রায় রাত ২টো পর্যন্ত চলেছে আতশবাজি পোড়ানোর ধুম।’’ তবে রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের এক কর্তা জানিয়েছেন, এ বছর নববর্ষ উদযাপনে আতশবাজি পোড়ানোর ধুম গত বছরের তুলনায় কমেছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ কমেছে উদযাপনের ধুম।