Taratala Godown Roof Collapse

‘আর আসব না, আমার আনা দু’জন শ্রমিকের প্রাণ গেল’! হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বললেন তারাতলার ঢালাইয়ের ঠিকাদার

দেবাশিস জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তারাতলার গুদামে পৌঁছোন তাঁরা। বুধবার কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। রক্ষী তাঁদের দেখে প্রবেশ করতে দেন। কোনও রেজিস্টারে সই করেননি তাঁরা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ১৮:৫৭
Share:

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরছেন দেবাশিস দাস। — নিজস্ব চিত্র।

নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে তিন-চার ঘণ্টা আটকে ছিলেন। তার পরে চাঙড় সরিয়ে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। তিনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। তবে এখনও সেই আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদামের ঢালাইয়ের ঠিকাদার দেবাশিস দাস। মনে চেপে বসেছে আরও একটা গ্লানিবোধ— তিনি যাঁদের কাজে নিয়োগ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে দু’জন প্রাণ হারিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দেবাশিস স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এই কাজে আর আসবেন না। তাঁর স্ত্রী-ও জানালেন, স্বামীকে আর এই ঢালাইয়ের ঠিকাদারির কাজ করতে দেবেন না।

Advertisement

শনিবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন দেবাশিস। স্ত্রী অন্নপূর্ণার হাত ধরে হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই বললেন, ‘‘এই কাজে আর আসব না।’’ যত না নিজের জন্য আতঙ্কিত হয়েছেন, তার চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছে, তাঁর নিয়োগ করা শ্রমিকদের মৃত্যু। তাঁর কথায়, ‘‘দুটো ছেলের প্রাণ গেল, তাঁদের তো প্রাণ ফেরাতে পারব না। আমি এনেছিলাম ওঁদের।’’ এখন তাঁর দাবি একটাই, যাঁদের প্রাণ গিয়েছে, তাঁদের পরিবারকে অর্থসাহায্য করা হোক। দেবাশিস বলেন, ‘‘আমরা জীবন ফিরে পেয়েছি। কিন্তু যাঁরা ফিরলেন না! যাঁরা মারা গেলেন, তাঁদের আর্থিক সাহায্য, এটাই চাই।’’ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দেবাশিস এ-ও জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার তাঁদের অনেক সাহায্য করেছে। দোষীদের শাস্তি দেবে আইন। সে সব নিয়ে তিনি ভাবছেন না। তিনি শুধু চান, নিহতদের পরিবারকে অর্থসাহায্য দেওয়া হোক।

দেবাশিস জানান, এমনিতে দিনে এই ঢালাইয়ের কাজের জন্য ৬০০-৬৫০ টাকা পান। কিন্তু তারাতলের ওই গুদামে ১০০০ টাকা দৈনিক মজুরিতে চুক্তি হয়েছিল। চার দিনের কাজ ছিল। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের এনেছিলেন ধর্মেন্দ্র সহানি। তিনি লেবার কন্ট্রাক্টর। ঘটনার পরে যোগাযোগই করেননি।’’

Advertisement

ঠিক কী ঘটেছিল?

দেবাশিস জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তারাতলার গুদামে পৌঁছোন তাঁরা। বুধবার কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। রক্ষী তাঁদের দেখে প্রবেশ করতে দেন। কোনও রেজিস্টারে সই করেননি তাঁরা। কোথাও নাম লেখেননি। সেই নিয়ে সন্দেহ হয়েছিল কি? সেখানে গিয়ে কি মনে হয়েছিল যে, নির্মাণ পদ্ধতিতে কোনও ভুল রয়েছে? দেবাশিসের সাফ জবাব, ‘‘এত বড় শহরে এত বড় নির্মাণ হচ্ছে। হঠাৎ হয়নি। বড় ইঞ্জিনিয়ার করছে। ভুলভাল তো করেনি। আর এ রকম হবে জানলে কি আসতাম?’’

বুধবার সকাল ১০টা নাগাদ কাজ শুরু হয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘‘কংক্রিটের কাজ চলছিল। লেভেল করে পাটা দিচ্ছিলাম। যন্ত্র চলায় ভাইব্রেশন হচ্ছিল। আচমকাই উপর থেকে ভেঙে পড়ল নির্মাণের অংশ। প্রথমে মাথা ঘুরে গেল। তার পর দেখলাম আমরা ভগ্নস্তূপে বন্দি।’’ দেবাশিস জানান, তাঁর আশপাশে ছিলেন চার জন কর্মী। সকলেই আটকে পড়ে চিৎকার করতে থাকেন। দেবাশিসের পকেটে তখন মোবাইল ফোন ছিল। কিন্তু তাতে নেটওয়ার্ক ছিল না। অনেক চেষ্টা করেও স্ত্রীকে ফোন করতে পারেননি। প্রায় তিন-চার ঘণ্টা পরে কমলা পোশাকের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা এসে উদ্ধার করেন। তাঁদের নিয়ে যান হাসপাতালে। মাথায়, চোখে চোট পেয়েছেন দেবাশিস।

হাসপাতালে পৌঁছেই স্ত্রী অন্নপূর্ণাকে প্রথম ফোন করেন দেবাশিস। তার আগে তারাতলার দুর্ঘটনার কথা কিছুই জানতেন না তিনি। অন্নপূর্ণা বলেন, ‘‘তার আগে টিভিতে কিছুই দেখিনি। কারও থেকে শুনিনি কিছু। ফোন পেয়ে চমকে যাই।’’ তার পরে টিভি চালিয়ে গোটা ঘটনার কথা জানতে পারেন অন্নপূর্ণা। চমকে ওঠেন। তার পরেই ছোটেন হাসপাতালে। স্বামীকে শনিবার হাত ধরে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, ‘‘আর এই কাজ করতে দেব না।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement