শম্ভুনাথ পণ্ডিত

স্মৃতিহারাকে ঘরে ফেরাল হাসপাতাল

পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, সম্ভ্রান্ত চেহারার বৃদ্ধ রাতের পর রাত বসে কাঁদতেন। কোনও কথাই মনে পড়ছে না তাঁর। বাড়ির ঠিকানা, আত্মীয়দের নাম ভুলে যাওয়া বৃদ্ধের কান্না থামানোকে শেষ পর্যন্ত চ্যলেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলেন হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও কর্মীরা।

Advertisement

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:১৩
Share:

রামখিলাওন তিওয়ারি

পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, সম্ভ্রান্ত চেহারার বৃদ্ধ রাতের পর রাত বসে কাঁদতেন। কোনও কথাই মনে পড়ছে না তাঁর। বাড়ির ঠিকানা, আত্মীয়দের নাম ভুলে যাওয়া বৃদ্ধের কান্না থামানোকে শেষ পর্যন্ত চ্যলেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলেন হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও কর্মীরা। সবাই মিলে একটা চেষ্টা করেছিলেন ‘ডিমেনশিয়া’ বা স্মৃতিহারানো রোগে ভোগা ওই বৃদ্ধকে বাড়ি ফেরানোর। শেষ

Advertisement

পর্যন্ত তাঁদের উদ্যোগেই উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ে নিজের পরিবারে
ফিরে গিয়েছেন ৭২ বছরের রামখিলাওন তিওয়ারি।

গত ৩ জানুয়ারি রাতে দক্ষিণ বন্দর থানার পুলিশ ওই বৃদ্ধকে গঙ্গার ধার থেকে তুলে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করে। পুলিশ জানিয়েছিল, গঙ্গাসাগর মেলায় যেতে উত্তরপ্রদেশ থেকে পুণ্যার্থীদের একটি দল কলকাতায় এসেছিল। সেই দলেই ছিলেন রামখিলাওন। কিন্তু দলের সঙ্গে সাগরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কোনও ভাবে মাথায় চোট পেয়ে গঙ্গার ধারেই পড়েছিলেন।

Advertisement

শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে চিকিৎসার পরেও নিজের নাম-ধাম, আত্মীয়দের পরিচয় কিছুই মনে করতে পারছিলেন না বৃদ্ধ। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন, স্মৃতি নষ্ট হতে বসেছে তাঁর। হাসপাতালের সুপার সৌমাভ দত্ত বলেন, ‘‘কিছুতেই খাওয়ানো যাচ্ছিল না বৃদ্ধকে। মাছ-মাংস মোটেই ছুঁতেন না। বুড়ো মানুষটা সারা রাত বিছানায় বসে কাঁদতেন। দেখে খুব কষ্ট হতো আমাদের। ওঁর হিন্দিতে এমন একটা টান ছিল যে, কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল।’’ সুপারের কথায়, ‘‘মাঝেমধ্যে একটু আধটু স্মৃতি ফিরতে উনি ফৈজাবাদের কথা বলতেন। নাম করতেন লখনউ হাউজিং ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের।’’ হাসপাতালের অ্যাকাউন্টস বিভাগের কর্মী অশোক তিওয়ারির বাড়িও উত্তরপ্রদেশে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই সামান্য সূত্র ধরে অশোকবাবুকেই খোঁজখবর নিতে বলেন।

এর পরের গল্পটা শোনা গেল অশোকবাবুর মুখে। তিনি বলেন, ‘‘আমার সঙ্গে ইউপি গেস্ট হাউসের এক ম্যানেজার প্রদ্যুম্নকুমার শ্রীবাস্তবের আলাপ ছিল। তাঁর কিছু পরিচিত লোকজন ছিল ফৈজাবাদে। তাঁদের কাছে খোঁজখবর করতে দু’দিনের মধ্যেই বৃদ্ধর পরিবারের খোঁজ মিলল। জানা গেল, বৃদ্ধের পৈতৃক বাড়ি ফৈজাবাদে। চাকরিসূত্রে তিনি লখনউয়ে থাকতেন। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পরে আত্মীয়েরা ফৈজাবাদে থানায় ডায়েরি করেছিলেন। বৃদ্ধের ছবি দিয়ে প্যাম্ফলেট ছাপিয়ে দেওয়ালে-দেওয়ালে লাগানো হয়েছিল। ফলে ঠিকানা পেতে সমস্যা হল না।’’ সেখান থেকেই জানা যায়, বৃদ্ধের নাম রামখিলাওন তিওয়ারি। বয়স ৭২।

Advertisement

খবর পেয়ে গত ১০ ফেব্রুয়ারি রামখিলাওনের ভাইপো পবন তিওয়ারি-সহ বেশ কিছু আত্মীয় এসে পৌঁছন শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। নথিপত্র দেখিয়ে বাড়ি নিয়ে যান বৃদ্ধকে। আর এক ভাইপো ওমপ্রকাশ তিওয়ারি বলেন, ‘‘রামখিলাওন চাকরিসূত্রে লখনউয়ের ইন্দিরানগরে থাকেন। ভাল সরকারি চাকরি করতেন। সচ্ছল, ধর্মপ্রাণ রামখিলাওনের স্ত্রী রামপতি দেবী ও দুই ছেলে ছিল। অল্প দিনের ব্যবধানে দুই ছেলে মারা যাওয়ার পরেই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। স্মৃতি নষ্ট হতে থাকে। তার পরেই হঠাৎ এক দিন নিখোঁজ
হয়ে যান।’’

শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা-কর্মীদের মানবিকতায় মুগ্ধ তিওয়ারি পরিবার। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যকে তাঁদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কলকাতার হৃদয়কে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাঁরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement