ত্রিফলার পরে এ বার বাসস্ট্যান্ড। শহর সৌন্দর্যায়ন ঘিরে ফের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠল কলকাতা পুরসভার অন্দরে।
অভিযোগ, সাংসদ ও বিধায়ক তহবিলের টাকায় বাসস্ট্যান্ড নির্মাণে বেশি খরচ হচ্ছে। এই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই তহবিল খরচ সংক্রান্ত পুরসভার নবনির্মিত কমিটির উপদেষ্টা তথা প্রাক্তন মেয়র পারিষদ পার্থ হাজারি স্বয়ং। পুরসভা সূত্রের খবর, সম্প্রতি তহবিল সংক্রান্ত মাসিক বৈঠকে পার্থবাবু সরাসরি বলে ফেলেন, বাসস্ট্যান্ড নির্মাণের জন্য যে পরিমাণ টাকা খরচ করা হচ্ছে, তা বেশি বলেই মনে হচ্ছে।
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, এক-একটি বাসস্ট্যান্ড নির্মাণে ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা ৪ লক্ষ টাকাও ছাড়িয়ে গিয়েছে। খরচ এতটা কোনও মতেই হওয়ার কথা নয় বলে মত পার্থবাবুর। পুরসভার একাধিক ইঞ্জিনিয়ারেরও মন্তব্য, শহরে যে ধরনের বাসস্ট্যান্ড হয়েছে এবং হচ্ছে, তার খরচ বড়জোর দেড় থেকে দু’লক্ষ টাকা। এর বেশি হওয়া উচিত নয়। পার্থবাবুর কানেও তা তোলা হয়েছে বলে জানান ওই ইঞ্জিনিয়ারেরা। এক অফিসারের কথায়, বাসস্ট্যান্ড পিছু দু’লক্ষ টাকা খরচ হলে হিসেব মতো ২০০ বাসস্ট্যান্ডের জন্য অতিরিক্ত তিন কোটিরও বেশি টাকা গচ্চা গিয়েছে ওই দুই তহবিল থেকে। এ বার তা নিয়েই খোঁচা দিয়েছেন খোদ উপদেষ্টা। বিষয়টি স্বীকার করে পার্থবাবু শনিবার বলেন, ‘‘কমিটির বৈঠকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। সেখানে সকল সাংসদ, বিধায়কের প্রতিনিধি এবং পুরসভার যুগ্ম কমিশনার-সহ অন্যান্য আধিকারিক ছিলেন।’’ তিনি কি বিষয়টি লিখিত ভাবে মেয়র বা পুর-কমিশনারকে জানিয়েছেন? পার্থবাবুর উত্তর, ‘‘না, লিখিত দিইনি।’’ কেন? পার্থবাবুর বক্তব্য, ‘‘বিধানসভা ভোটের আগে এটাই ছিল কমিটির শেষ বৈঠক। ভোটের পরে জানাব ঠিক করেছি।’’
যদিও পুরসভার শিডিউলে ওই খরচের হিসেবই করা হয়েছে বলে জানান এক আধিকারিক। কিন্তু ওই শিডিউল যে ঠিক, তা কী ভাবে ঠিক হল, প্রশ্ন উঠছে তা নিয়েও।
একাধিক পুর-ইঞ্জিনিয়ারের কথায়, ত্রিফলার দাম ঠিক করার ক্ষেত্রেও তো পুরসভা শিডিউল তৈরি করেছিল। পরে দেখা যায় ওই দাম বাজারের চেয়ে অনেক বেশি। এর পরে ত্রিফলা কেলেঙ্কারির ঘটনায় পুরসভার একাধিক অফিসারকে মাসুল দিতে হয়েছে। চরম অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল পুর-প্রশাসনকেও।
কলকাতার ১৭ জন বিধায়ক এবং লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে ১৮ জন সাংসদের তহবিল খরচের দায়িত্ব কলকাতা পুরসভার উপরে। অর্থাৎ, ওই তহবিল খরচের নোডাল এজেন্সি কলকাতা পুরসভা। বছরে সাংসদদের জন্য পাঁচ কোটি এবং বিধায়কদের জন্য ৬০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়। সেই হিসেবে সাংসদ তহবিলে ৯০ কোটি এবং বিধায়ক তহবিলে ১০ কোটি ২০ লক্ষ টাকা প্রতি বছর জমা পড়ে পুরসভার তহবিল সংক্রান্ত ভাণ্ডারে। সাংসদ এবং বিধায়কদের সুপারিশ এলে সেই টাকা খরচ করে পুরসভার বিভিন্ন দফতর। কিছু ক্ষেত্রে তহবিল বিধি মেনে সরাসরি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং সরকারের কোনও দফতরের মাধ্যমেও টাকা খরচ করা হয়।
কলকাতা পুরসভার সিভিল ইঞ্জনিয়ারিং দফতরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, মহানগর জুড়ে সাংসদ ও বিধায়ক উন্নয়ন তহবিলের টাকায় প্রায় ২০০ বাসস্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে।
কী ভাবে হয় এই কাজ?
পুরসভার এক ইঞ্জিনিয়ার জানান, পুরসভার বরাত যে-ই পাক, সেই ঠিকাদার আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাজ ভাগ করে দেন ছোট কিছু ঠিকাদারকে। এমনই এক ঠিকাদারের কথায়, ‘‘এখন যে সব বাসস্ট্যান্ড তৈরি হচ্ছে, তা করতে আমরা ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা নিচ্ছি।’’ আর এক জন বলেন, ‘‘অল কমপ্লিট ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকায়। ঝাঁ চকচকে হবে।’’ প্রথম দিকে যে সব বাসস্ট্যান্ড তৈরি হয়েছিল, তার খরচ আরও কম ছিল বলে জানান তাঁরা।
খরচ কম হলে শিডিউলে বাড়তি দর ধরা হয়েছে কেন?
এর জবাবে পুরসভার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং দফতরের এক আধিকারিক জানান, পূর্ত দফতরের শিডিউল মেনেই দর ঠিক করে পুরসভা। কেন বেশি, তার জবাব দিতে চাননি তিনি। বিষয়টি নিয়ে ফোন করা হয় পুর-কমিশনার খলিল আহমেদকে। ফোন ধরেননি। জবাব মেলেনি এসএমএস-এরও।
পুরসভা সূত্রের খবর, সাংসদ ও বিধায়ক তহবিলের খরচ দেখভাল নিয়ে পুরসভায় একটি দফতর থাকলেও এত কাল ওই দফতরের মাথায় কোনও পরামর্শদাতা কমিটি ছিল না। গত পুরভোটের পরে পার্থবাবুকে উপদেষ্টা পদে বসিয়েছিলেন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। সেই মতো তাঁকে সাংসদ তহবিল এবং বিধায়ক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প তহবিল (বিইইউপি) সংক্রান্ত দফতরের উপদেষ্টা পদে বসানো হয়। পার্থবাবুর কথায়, ‘‘নেত্রী আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তা যথাযথ ভাবে দেখা আমার কাজ বলেই মনে করি।’’