অন্য শহর

ক্লান্তি-শূন্যতার রোম্যান্সে স্মৃতিমেদুর

কেবিনের আবডালে নিষিদ্ধ আমন্ত্রণ। সাবেক গোলাকার থাম, চিনা ক্যালিগ্রাফি আর প্রাচীন প্রাচ্যের সূক্ষ্ম কারুকাজখচিত সৌধটি তখন মিশমিশে মখমলে নিজেকে মুড়ে নিয়েছে।

Advertisement

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ১৩ অগস্ট ২০১৭ ০০:১৫
Share:

চেনা-অচেনা: বদলে গিয়েছে চারপাশের পরিবেশটাই । ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী

চারপাশে কদাকার বহুতলের ভিড়। কিংবা অফিসপাড়ার দিনগত পাপক্ষয়, ক্লান্তির দৈন্য। তার মাঝেই সে দাঁড়িয়ে।

Advertisement

নিউ সিআইটি রোড লাগোয়া গলির লাল ইটের খাঁজকাটা বাড়িটা যেন কোনও শাপভ্রষ্ট রাজপুত্তুর। খোলা ভ্যাট, ঝুপড়ি আর লরি-ম্যাটাডরের জঙ্গলের সৌজন্যে গলিতে পা রাখাই মুশকিল ছিল, এই সে-দিনও! সন্ধে নামলে সস্তার বিয়ারের লোভে কোনও মরিয়া তৃষ্ণার্ত তবু পায়ে কাদা মেখে এগোতেন। আরও কয়েক দশক আগে লোভ দেখাত অন্যতর হাতছানি। কেবিনের আবডালে নিষিদ্ধ আমন্ত্রণ। সাবেক গোলাকার থাম, চিনা ক্যালিগ্রাফি আর প্রাচীন প্রাচ্যের সূক্ষ্ম কারুকাজখচিত সৌধটি তখন মিশমিশে মখমলে নিজেকে মুড়ে নিয়েছে।রাজপথের ও-পারে নিজের কাঠের কারবারের কারখানার দরজায় দাঁড়িয়ে বাড়িটা আঙুল উঁচিয়ে দেখালেন সত্তরোর্ধ্ব পিটার চেন। ‘‘আমার গেঁড়ি বয়সে ওই বাহারি গ্রিলের বারান্দায় রাজ কপূর-নার্গিসদের হাত নাড়তে দেখেছি।’’ লালবাজারের পিছনে কলকাতার সাবেক চিনে মহল্লা। ২২ নম্বর ব্ল্যাকবার্ন রোডের বাড়িটা এ শহরের গত জন্মের খবর জানে। দেশের তাবড় মান্যগণ্যদের পদধূলিধন্য নানকিং রেস্তোরাঁ। পাড়ার বয়স্করা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবধি খেতে এসেছিলেন। নিয়মিত আসতেন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়।

আরও পড়ুন: কাপড় ধরে টানতেই বেরিয়ে এল জেঠুর পা

Advertisement

সুপ্রিয়াদেবীও বহু বার শুনিয়েছেন নানকিংয়ের মস্ত কেবিনে ‘তোমাদের দাদা’র সঙ্গে অভিসারের কাহিনি। ‘নিশীথে’ ছবির আউটডোর ছেড়ে তাঁদের প্রেমপর্বের গোড়ায় কী ভাবে বেণুর সঙ্গে গোপনে দেখা করতে ছিটকে আসেন উত্তমকুমার। সুপ্রিয়ার স্মৃতিতে উজ্জ্বল, নানকিংয়ের রুপোর কারুকাজ করা বাসন-চায়ের কাপ-নুনদানির শোভা। দশ বছর আগেও সেই শূন্য কেবিনের দরজা হাওয়ায় দুলত।

একদা ভারতবিখ্যাত প্রন বল্স, পর্ক রোস্ট বা মাছের স্প্রিংরোল উয়ু ছুঁ কি-র অবশ্য কবেই ‘দিন গিয়াছে’। রেস্তোরাঁর মালিক আও পরিবারের গিন্নি এক কড়া চিনা মহিলার তত্ত্বাবধানে শুধু বিয়ার মিলত। আর দাঁড়িয়ে থাকত অতীতের সাক্ষী একটা সোনালি বুদ্ধমূর্তি। সেই নানকিংয়ের বাইরেটাই যা টিকে রয়েছে। তাইল্যান্ডের একটি মঠ নতুন এক ধ্যানরত বুদ্ধমূর্তি দান করেছে। কলকাতার অতীতচারি প্রেমিকের তাতে মন ভরবে না। পুরনো ফলক পাল্টে এখন লেখা ‘টুঙ্গ অন চার্চ’। কলকাতার বৈভব, গরিমা, পাপ ও ক্ষরণের স্মারক অভিজাত রেস্তোরাঁ কী ভাবে ধর্মস্থানে পাল্টে গেল?

গির্জার সেক্রেটারি লি হান কুয়াংয়ের বয়সও কম হল না। দোতলায় কনফুসিয়াসের সে-যুগের মূর্তির সামনে বসিয়ে তিনিই শোনালেন এ বাড়ির তিন কালের গল্প। অপরূপ সৌধটির ভিতের পত্তন ঠিক ১০০ বছর আগে। গির্জা মানে বুদ্ধমন্দিরই ছিল আদিতে।

টুঙ্গ অন চার্চের অছি পরিষদই বাড়ির মালিক। ১৯২৪ থেকে নানকিংয়ের আভিজাত্যে ধর্মের ছাপটুকু মুছে যায়। কিন্তু ’৬২র যুদ্ধের সময়ে চিনেদের কলকাতা ছাড়ার হিড়িকে রেস্তোরাঁর অবক্ষয়ের শুরু। ক্রমে সান্ধ্য পাপের ঠেক হিসেবে কুখ্যাতিই হয়ে ওঠে তার পরিচয়। বছর দশেক আগে আও পরিবার কোন ব্যবসায়ীকে বাড়িটা বেচে দিয়েছেন বলে তুলকালাম বাধে।

কোর্টকাছারি করে শহরের চিনা সমাজই বাড়িটি উদ্ধার করেছে।

কিন্তু গলিতে প্রস্রাবখানা, ভ্যাটের বিরুদ্ধে পুরসভার সঙ্গেও লড়তে হয়েছে। এখন উন্নত প্রযুক্তির জঞ্জাল সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু হলেও পরিস্থিতি ভাল নয়। দোতলার সুদৃশ্য জানলাগুলো খুললেই দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ট্রাস্টের টাকা, চিনে সাংস্কৃতিক সংগঠনের আনুকূল্যে ছাদ-বারান্দা সারাই হয়েছে। তবে ফাঁকফোকরে এখনও সাবেক ডাললতার উঁকিঝুঁকি। পাশের বিসএনএল বিল্ডিং থেকে ছোড়া আশীর্বাদে তেতলার টঙে নিয়মিত মদের বোতল বর্ষণেও খামতি নেই। ‘‘এটা তো হেরিটেজ-বাড়ি! বাড়িটা বাঁচাতে সরকারের কি কোনও দায়িত্ব নেই?’’— অভিমান ঝরে লি হান কুয়াংয়ের গলায়।

ঝুপড়িবাসী শিশুর দল ঘিরে ধরে বাড়িটা থেকে বেরোতেই। সে-ও তো আর এক অনাদরের গল্প। বোদলেয়রের কবিতার নাগরিক পাপ-ক্লান্তি-শূন্যতার রোম্যান্স নিয়ে একটা জুতসই শব্দ ভেবেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। ক্লেদজ কুসুম। সাবেক নানকিংয়ের অভিঘাতে তা ফের ধাক্কা দিয়ে যায়।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন