বদ-অভ্যাস: সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি যেখানে। বৃহস্পতিবার, প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডে। নিজস্ব চিত্র
কিছু দিন আগেই মাস্ক পরাকে ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ করে তোলার আবেদন জানিয়েছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রী থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের একটি অংশের মধ্যেই ঠিক ভাবে মাস্ক ব্যবহারে অনীহা দেখা যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা। এমনকি, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধনও মুখ থেকে মাস্ক নামিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে মুখোমুখি হয়েছেন। এ রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীদেরও হামেশাই এমন করতে দেখা যাচ্ছে। যা দেশের মাস্ক-চিত্রের ভাল বিজ্ঞাপন নয় বলেই মনে করছেন অনেকে।
এখানেই শেষ নয়। মাস্ক নিয়ে নানা ভ্রান্ত প্রচারও শুরু হয়েছে। যেমন মাস্ক বেশি ক্ষণ পরে থাকলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায় বা দমবন্ধ লাগে। এই ধারণা এতই ডালপালা বিস্তার করেছে যে, তা ভাঙতে বিষয়টিকে ‘মিথ বাস্টারস’ বিভাগে যুক্ত করতে হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (হু)। হু-র এক গবেষকের কথায়, ‘‘মাক্স বেশি ক্ষণ পরলে অনভ্যাসের কারণে একটা অস্বস্তি হতে পারে। কিন্তু শরীরে অক্সিজেন কমে যাওয়ার তথ্য ঠিক নয়।’’
কিন্তু তার পরেও কেন এই প্রচার, যার জন্য আসরে নামতে হল হু-কে?
কারণ, অক্সিজেনের ঘাটতি, কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি-সহ একাধিক মাস্ক সংক্রান্ত অভিযোগের উৎসস্থল হল মন। এমনটাই জানাচ্ছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট যশোবন্ত মহাপাত্র। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের অভ্যাস নেই মাস্ক পরার। সেই অনভ্যাসের পক্ষে যুক্তি খাড়া করতে এই প্রচার শুরু হয়েছে। এ সবের বাস্তব ভিত্তি নেই।’’
আরও পড়ুন: স্কুলের ফি মকুব করার দাবিতে বিক্ষোভ ধর্মতলায়
বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, মাস্ক ব্যবহারকারীদের আলাদা আলাদা শ্রেণি রয়েছে। প্রথম শ্রেণি হল, যাঁরা সব নিয়ম মেনে মাস্ক পরেন। এই সংখ্যাটা খুবই কম। দ্বিতীয় শ্রেণি হল, যাঁরা মাস্ক পরেন, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ নয়। মাস্ক পরার কিছু ক্ষণ পরেই সেটি তাঁরা খুলে রাখেন। আবার যখন ইচ্ছে হল, তখন তা পরেন। অর্থাৎ, মাস্ক পরাটা তাঁদের খেয়াল-খুশি নির্ভর। তৃতীয় শ্রেণি হল, যাঁরা মাস্ক পরেন, কিন্তু তা না-পরার মতো করে। তাঁদের মাস্ক পরার ধরনটি হল, কানের দু’পাশে শুধু মাস্কটির স্ট্র্যাপ লাগানো থাকে। এ দিকে মুখ-নাক খোলা। ফলে এঁদের ক্ষেত্রে মাস্ক পরার উদ্দেশ্যই পূরণ হয় না। আর চতুর্থ শ্রেণি, যাঁরা মাস্ক পরেনই না। কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা যতই বাড়ুক না কেন, তাঁদের মনোভাব বেপরোয়া।
শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান সংযুক্তা দত্তের কথায়, ‘‘আনলক ফেজ ওয়ানের কারণে রাস্তাঘাট, অফিসে লোকসংখ্যা বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সংক্রমণও। ফলে অসুখ হলে যেমন মানুষ ইঞ্জেকশন নেন, তেমনই নিজের ও অন্যদের সুস্থতার জন্য মাস্ক পরতেই হবে। এর অন্য বিকল্প নেই।’’ মাইক্রোবায়োলজিস্ট এম কে দেশমুখ আবার বলছেন, ‘‘কোভিড ১৯-এর হাতে একে-৪৭ দেখা যাচ্ছে না। ফলে জনসংখ্যার বড় অংশই মনে করছে তাদের সামনে কোনও বিপদ নেই, তাদের কিছুই হবে না।’’ ইমিউনোলজিস্ট ইন্দিরা নাথ জানাচ্ছেন, আর্থিক ভাবে দুর্বল, প্রান্তিক মানুষদের বারবার মাস্ক কেনার অর্থ নেই ঠিকই। সে ক্ষেত্রে সুতির কাপড় দিয়ে বাড়িতে মাস্ক তৈরি করে মুখে দেওয়া যেতে পারে। তবে মাস্ক যে সবার জন্যই প্রয়োজনীয়, সেটা প্রান্তিক মানুষদের ভাষায়, তাঁদের মতো করে বোঝাতে হবে। ইন্দিরাদেবীর কথায়, ‘‘তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই মাস্ক পরার ক্ষেত্রে অনীহা রয়েছে। রাজনৈতিক নেতা এমনকি, মন্ত্রীদের অনেকেই নিয়ম মেনে মাস্ক পরছেন না। কিন্তু মাস্ক পরা নিয়ে এখন আর টালবাহানা করলে হবে না। কারণ, ভারতের যা জনসংখ্যা, সেখানে মুহূর্তের অসাবধানতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। শুধুই খাতায়-কলমে নয়, আক্ষরিক অর্থেই মাস্ককে জীবনের অংশ করে তোলা দরকার।’’ (চলবে)