তিন বন্ধু। কুচকাওয়াজের মহড়া চলাকালে রেড রোডে গাড়ির ধাক্কায় জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় তিন জনেই জড়িত বলে অভিযোগ। তবে ধরা পড়ার পরে তৌসিফ সোহরাব ওরফে সাম্বিয়া, শাহনওয়াজ খান ওরফে শানু এবং নুর হোসেন ওরফে জনিকে আর একসঙ্গে রাখার ঝুঁকি নিচ্ছেন না তদন্তকারীরা। তাঁরা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে যাতে কোনও গল্প তৈরি করতে না-পারেন, সেই জন্যই তাঁদের আলাদা রাখার বন্দোবস্ত হয়েছে বলে জানাচ্ছে পুলিশ।
লক-আপ থেকে তদন্তকারীদের জেরার ঘর— কোথাও একসঙ্গে রাখা হচ্ছে না ওই তিন জনকে। লালবাজার সূত্রের খবর, গ্রেফতারের পরে ১২ দিন কেটে গেলেও ধৃত তিন বন্ধুকে এখনও এমন কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি, যাতে তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে পারেন। এমনকী তদন্তের স্বার্থে রাঁচিতে নিয়ে যাওয়া হলেও তিন জনকে আলাদা আলাদা জায়গায় রেখেছিলেন তদন্তকারীরা।
তিন বন্ধুকে এত সতর্কতার সঙ্গে আলাদা ভাবে রাখা হচ্ছে কেন?
লালবাজারের খবর, রেড রোডের ঘটনার পরে তিন জনেই একসঙ্গে কলকাতা ছেড়ে রাঁচিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তদন্ত শুরু হওয়ার পরেই অভিযোগ উঠতে থাকে, গত ১৩ জানুয়ারি রেড রোডে বায়ুসেনার কর্পোরাল অভিমন্যু গৌড়কে গাড়িতে পিষে মারার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সাম্বিয়া খুবই প্রভাবশালী। তাঁর বাবা মহম্মদ সোহরাব প্রাক্তন বিধায়ক এবং শাসক দল তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ। ফলে তাঁরা প্রভাব খাটিয়ে অন্য অভিযুক্তদের ফাঁসিয়ে দিতে পারেন। তদন্তকারীরা জানান, জেরার মুখে ধৃতেরা প্রচুর অসঙ্গতিপূর্ণ বয়ান দিয়েছেন। তা থেকে পরিষ্কার, তিন অভিযুক্ত তদন্ত বানচাল করে দিতে চান। একসঙ্গে রাখলে নিজেদের মধ্যে কথা বলে তাঁরা আট ঘাট বেঁধে সেটা করতে পারেন। তাই এই ব্যবস্থা।
রাতেও লালবাজারের সেন্ট্রাল লক-আপে তিন অভিযুক্তকে এমন জায়গায় রাখা হয়, যাতে কেউ কারও মুখ দেখতে না-পান। এক তদন্তকারী অফিসার জানান, ওই তিন জনকে আলাদা আলাদা ভাবেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এখনও মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হয়নি। ‘‘ধৃতদের কেউ তথ্য দিলে তা আলাদা ভাবে অন্য দু’জনকে দিয়ে যাচাইও করিয়ে নেওয়া হচ্ছে না,’’ বললেন ওই অফিসার।
পুলিশি সূত্রের দাবি, ঘটনার দিন সাম্বিয়াই গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং সেই সময় গাড়িতে একা ছিলেন। তদন্তকারীরা এই দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ‘টিআই (শনাক্তকরণ) প্যারেড’ করাতে চান চলতি সপ্তাহেই। তার জন্য সেনাবাহিনীর সাহায্যের দিকে তাকিয়ে কলকাতা পুলিশ।
কেন? লালবাজার জানাচ্ছে, সে-দিনের ঘটনার সব প্রত্যক্ষদর্শী সেনাবাহিনীর। আদালত অনুমতি দিলেই সেনাবাহিনীর কাছে ওই প্রত্যক্ষদর্শীদের নাম চাইবেন তদন্তকারীরা। যাতে তাঁরা শনাক্তকরণ প্যারেডের সময় উপস্থিত থেকে অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে পারেন। লালবাজারের দাবি, টিআই প্যারেডে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া হয়ে গেলেই আদালতে চার্জশিট পেশ করা হবে।
তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, রাঁচি থেকে সোমবার রাতেই অভিযুক্ত তিন বন্ধুকে নিয়ে তাঁরা কলকাতায় ফিরে এসেছেন। গোয়েন্দাদের একাংশ জানান, ঘটনার পরে সাম্বিয়া যখন রাঁচিতে আত্মগোপন করে ছিলেন, সেই সময় এক ব্যক্তি মোবাইলের একটি সিমকার্ড এবং নগদ ২০ হাজার টাকা পৌঁছে দেন তাঁর কাছে। রাঁচিতে সেই ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছেন সাম্বিয়া। গোয়েন্দাদের দাবি, ওই ব্যক্তি ব্যবসায়ী এবং সাম্বিয়াদের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। ওই ব্যবসায়ীর অনেক টাকা ধার ছিল সাম্বিয়াদের কাছে। পলাতক অবস্থায় সাম্বিয়া রাঁচির ফল মান্ডির ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সেই টাকারই কিছুটা নেন।
সাম্বিয়ারা প্রথমে পালিয়ে গিয়েও ধরা পড়েছেন। কিন্তু সাম্বিয়ার বাবা মহম্মদ সোহরাব অধরাই। তাঁর অন্তর্ধান নিয়ে রহস্য ঘোরালো হচ্ছে। সরকারি ভাবে লালবাজার থেকে বলা হচ্ছে, জোরদার তল্লাশি সত্ত্বেও সোহরাবের হদিস মিলছে না। অথচ পুলিশের একাংশের দাবি, সোহরাব তদন্তকারীদের নাগালের বাইরে নেই। তা হলে গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন? পুলিশের ওই অংশের অভিযোগ, বিশেষ তদন্তকারী দল সোহরাবকে গ্রেফতার না-করে আদালতে আত্মসমর্পণ করার সুযোগ করে দিতে চাইছে। এই অভিযোগ অস্বীকার করে লালবাজারের কর্তারা অবশ্য বলছেন, অভিযুক্তকে ধরার জন্য সব রকম চেষ্টাই চলছে। এই বক্তব্যে খুশি নয় সেনাবাহিনী। ঘটনার ১৪ দিন পরেও সোহরাব ধরা পড়লেন না কেন, সেটা বোধগম্য হচ্ছে না ফৌজিদের।