নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডের পরে চলছে উদ্ধারকার্য। ছবি: শশাঙ্ক মণ্ডল।
ছাইয়ের গাদার সামনে ইতিউতি দাঁড়িয়ে ছিলেন ওঁরা। চোখে আকুতি, যদি অন্তত পোড়া দেহটুকুরও খোঁজ মেলে। কিন্তু ওই আকুতিই সার! দিনভর খুঁজেপেতেও প্রিয়জনের সন্ধান পাননি নাজিরাবাদ অগ্নিকাণ্ডে ‘নিখোঁজদের’ পরিজন। তাঁদের কারও কারও কানে বাজছে শেষ ফোনের কয়েকটি কথা। ভয়ার্ত গলায় কেউ শেষবারের মতো বাঁচার লড়াইয়ের কথা বলেছিলেন। কেউ বা বলেছিলেন, ‘‘আর কিছুক্ষণেই হয়তো পুড়ে শেষ হয়ে যাব।’’ কেউ বলেছিলেন, ‘‘বেরোনোর রাস্তা নেই। কী করব জানি না!’’
সোমবার থেকেই পরিজনের খোঁজ শুরু হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যাতেও তা শেষ হয়নি। কেউ নাজিরাবাদের পোড়া গুদামের সামনে চোখে অপরিসীম শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, কেউ বা বারবার ছুটে গিয়েছেন নরেন্দ্রপুর থানায়। পুলিশের দোরে চক্কর কেটে আবার ফিরে এসেছেন ছাইয়ের স্তূপের সামনে। পুড়ে ঝামা হওয়া, দলা পাকানো দেহাবশেষের সামনে গিয়েছেন। পরিজন, নিকটাত্মীয়কে চিনতে না-পেরে হতাশ চোখে তাকিয়ে থেকেছেন আকাশের দিকে।
এ দিন দুপুরে ঘটনাস্থলের চারদিকে ঘুরছিলেন সুদীপ জানা। আগুনের খবর পেয়েই সোমবার সকালে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দাদা কার্তিক জানার খোঁজ পাননি। সুদীপ জানান, বছর চল্লিশের কার্তিক আগে দিল্লিতে কাজ করতেন। বছর দেড়েক হল কলকাতায় ফিরে ডেকরেটরের গুদামে কাজে ঢোকেন। বাড়িতে স্ত্রী ছাড়াও দুই সন্তান আছে। দিন সতেরো আগে একবার গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছিলেন। সোমবার সকালে ফের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। ধরা গলায় সুদীপ বলছিলেন, ‘‘রবিবার রাত আটটা নাগাদ দাদা নিজেই বৌদিকে ফোন করে বাড়ি ফিরবে বলেছিল। বাড়িতে গিয়ে বৌদিকে কী বলব, জানি না।‘‘ সুদীপ ছাড়াও কার্তিকের আরও চার পরিজন এসেছেন খুঁজতে। তাঁদেরই একজন সনাতন সাউ বললেন, ‘‘আগুন লাগার পর ফোন করেছিল। বেশি কথা বলতে পারেনি।...সেই কথা এখনও কানে বাজছে।’’
আগুনের ঘটনায় নিখোঁজ পূর্ব মেদিনীপুুরের তমলুক উত্তর ধলহরার বাসিন্দা বছর সাতাশের রাজু মান্না। ছেলের খোঁজে নরেন্দ্রপুর থানার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর মা সীমা মান্না। বিপদের খবর পেয়েই গাড়ি ভাড়া করে কলকাতায় এসেছেন। বলছিলেন, ‘‘আগুনের খবর পেয়েই বারবার ছেলেকে ফোন করলাম। কিন্তু ফোন ধরল না। পুলিশও তো কিছু বলছে না। কোথায় যাবো?’’
ফুল সাজানোর কাজ করতে মাঝেমধ্যে পাঁশকুড়া থেকে কলকাতার আনন্দপুরে আসতেন বাসুদেব বেরা। তিনিও ‘নিখোঁজ’! দুঃসংবাদের আঁচ পেয়ে এ দিন সকালেই আমদাবাদ থেকে বিমানে চেপে কলকাতায় এসেছেন বাসুদেবের ছেলে খোকন। তিনি বলছিলেন, ‘‘রবিবার রাতেও বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল। বলল, ‘কাজ হয়ে গিয়েছে। সকালে বাড়ি যাব।’ মিনিট চারেক কথা হয়েছিল।”
সোমবার সকালে টিভিতে আগুনের খবর দেখাতেই খোকনকে ফোন করে তাঁর পরিবার। বাবাকেও ফোন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফোন ‘সুইচড অফ’ ছিল। খোকন বলছিলেন, ‘‘রাতেই বুঝি, বড় বিপদ হয়েছে। তাই প্লেন ধরে চলে এসেছি।’’ এ দিন বিমানবন্দর থেকে খোকনকে ঘটনাস্থলে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর প্রতিবেশী তথা বন্ধু বিশ্বজিৎ বাগ। বিশ্বজিতের কথায়, ‘‘এমন মৃত্যু যেন কারও না হয়।’’ ঘটনাস্থল থেকে নরেন্দ্রপুর থানাতেও গিয়েছিলেন খোকন। কিন্তু কোনও খবর মেলেনি। বিকেলেই নরেন্দ্রপুর থানার সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন নিখোঁজদের পরিজনেরা। তড়িঘড়ি ডিএনএ পরীক্ষার দাবিও তুলেছেন তাঁরা। এ দিকে, এ দিনই উদ্ধার হওয়া হাড় এবং দেহাংশ মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এসে পৌঁছায় কাঁটাপুকুর মর্গে। দু’টি বড় ব্যাগ ভর্তি নিয়ে আসে পুলিশের একটি জিপ। যদিও দেহাংশের সঙ্গে নিখোঁজদের আত্মীয়-পরিজনেরাকেউ আসেননি।
আসলে পুড়ে যাওয়া গুদামের সামনে দাঁড়িয়েও কোনও ‘অলৌকিক’ আশার জাল বুনছেন অনেকে। মনেপ্রাণে চাইছেন, যেন সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যায়! সে আশা বুকে রেখেই দগ্ধ গুদামের সামনে দাঁড়িয়ে এক নিখোঁজের আত্মীয় বলছিলেন, “কে বলতে পারে অলৌকিক কোনও কিছু ঘটেনি। একটা প্রাণ যাওয়া কিএতই সহজ?”
সহ-প্রতিবেদন: আর্যভট্ট খান
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে