—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
ইদের সময়ে বাড়তি বিরিয়ানির চাপ কী করে সামলাবেন, ভেবে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন শহরের এক নামী বিরিয়ানি-স্রষ্টা। তাঁর আকুল এসওএস-এ শেষ বেলায় গ্যাস সিলিন্ডারের কালোবাজারের দরজা খুলেছে। সেই রেস্তরাঁ-কর্তা বলছেন, “মনে হচ্ছে, ইদের চাহিদা সামলানো যাবে। তবে, শুধু বিরিয়ানি, চাঁপ। তন্দুরে কাবাব সেঁকছি। কোর্মা, কালিয়া এখন হচ্ছে না।” তন্দুরের সুবিধার জন্য অনেক রেস্তরাঁ তাদের কর্মীদের জন্যও ভাতের বদলে শুধু রুটি সেঁকছে।
আপৎকালীন পরিস্থিতিতে পরিবেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্র পেয়ে অনেকেই উনুনের বন্দোবস্ত করছেন। পার্ক স্ট্রিট থেকে পাইস হোটেল এবং ছোট-বড় অনেক রেস্তরাঁও সেই দলে পড়বে। বৈদ্যুতিক ইন্ডাকশন কুকটপ-পন্থীদের দলেও মোক্যাম্বো, পিটার ক্যাট থেকে বাগবাজারের কারখানার কে সি দাশ রয়েছে। অনেকেই ঢাউস হাঁড়ি, ডেকচি উনুনে চাপিয়ে, ছোট ছোট অর্ডারের পদগুলি ইন্ডাকশন কুকটপে সারছেন। মার্কো পোলোর ম্যানেজার কল্লোল বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, “ইলেকট্রিকে রান্নায় সময় একটু বেশি লাগছে। অতিথিদের সেটা জানিয়ে বাড়তি সময় চেয়ে রাখছি।”
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ-চালিত এই দুঃসময়ে টুকটাক ‘শহিদ’ও হয়েছে কিছু ছোট রেস্তরাঁ। নিউ মার্কেটের নাহুম পরিস্থিতি বুঝে ক’টা দিন বিশ্রাম ঘোষণা করেছে। ম্যানেজার জগদীশ হালদার বললেন, “কর্মীদের একটা ইদের ছুটিও দেওয়া গেল! রবিবারের পরে আশা করি, আবার খুলব।” উত্তর কলকাতার কৈলাস বসু স্ট্রিটের প্রায় শতক পেরোনো উৎকলীয় রেস্তরাঁ জগন্মাতা হোটেলেরও আপাতত ঝাঁপ বন্ধ। কর্তা উমাকান্ত মিশ্র বললেন, “গ্যাসের জোগান পেতে প্রতিযোগিতার টেনশনে ঘুম নষ্ট হচ্ছিল। তার থেকে এটা ভাল।” ভবানী দত্ত লেনের স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল সাবেক উনুন ব্যবস্থায় ফিরেছে কয়েক দিনে। কলেজ স্ট্রিট লাগোয়া প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসের বাড়ির মহল হোটেলও উনুনের বিকল্প প্রস্তুত করছে। মহল-কর্তা প্রজ্ঞান ভট্টাচার্য বললেন, “উচ্ছে, আলুভাজা, নিম-বেগুন থেকে পোস্তর বড়ার বিলাসিতা বন্ধ রাখছি। মাছের পদও কমসম করে হচ্ছে। যুদ্ধ কত দিন টানবে, সেই দুশ্চিন্তায় মন খারাপ!”
বিজলিগ্রিলের কর্ণধার তপন বারিকের স্বর থমথমে, “ফিশ ওরলিও আপাতত বন্ধ আমাদের! উনুনে বেলভিউ হাসপাতালের রোগীদের প্রাত্যহিক আমিষ খাবার, স্টাফদের রান্না হচ্ছে!” তিনি জানালেন, তাঁদের বিভিন্ন আউটলেটে এখন প্রধানত ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, ফ্রাই, ফিশ রোলই মিলছে। মোগলাই পরোটা, চাউমিন, বিরিয়ানি, ওরলির মুখদর্শন কার্যত স্থগিত।
যুদ্ধের বাজারে অনুপস্থিত তালিকায় কলকাতার ভোজ-রসিকদের প্রিয়জনেরা আরও অনেকেই রয়েছে। ভীম নাগের শোকেসে ধ্রুপদী দই এবং কড়াপাকই নেই। শুধু নরম পাক দেলখোস, প্যারাডাইস ইত্যাদি হচ্ছে। রসালো লাল চমচম, রকমারি সুরভিত গজা— সব বন্ধ। মিহিদানা, বোঁদে, ক্ষীরের চপ ঘুরেফিরে হচ্ছে। প্রদীপ নাগ বললেন, “গ্যাস সিলিন্ডারের অনিশ্চয়তায় কপাল ঠুকে যেটুকু চলছে।” সন্দেশ-বিশারদ নকুড় নন্দীর দোকানের পার্থ নন্দীর কথায়, “অনেকের চাহিদায় কড়াপাক একটু করছি। তবে মালাই রোলের মতো সরের মিষ্টি বন্ধ।”
চিনে পাড়ার ডাকসাইটে রেস্তরাঁ কর্ত্রী মনিকা লিউ বললেন, “এই সঙ্কটে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাই আমাদের ভরসা।” টেরিটিবাজারের ছোট চিনে রেস্তরাঁ ডি-লে বাড়তি দাম দিয়ে গ্যাস নিয়েই হেঁশেল খোলা রেখেছে। তবে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের এই দৌড় আরও কত দিন চলবে? কেন এ রাজ্যে এখনও গ্যাসের পাইপলাইনের বন্দোবস্ত হবে না? এই প্রশ্নগুলিই বেশির ভাগ রেস্তরাঁর হেঁশেল তাতিয়ে রেখেছে এখন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে