Debraj Chakraborty

‘দেবরাজনীতি’-র আড়ালে কোটি কোটি টাকার ‘তোলা-সিন্ডিকেট’! ‘ডিসি গ্লোবাল’ ছাড়া আরও তিন সংস্থা তদন্তকারীদের নজরে

কেবল হোর্ডিং পোস্টারে নয়, বাস্তবেও দলের অন্দরে সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন দেবরাজ এবং তার সঙ্গীরা। তাঁরা পরিচিত ছিলেন ‘দেব- অনুগামী’ হিসাবেই।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ১৭:১৮
Share:

কী ভাবে চলত দেবরাজের তোলা-সিন্ডিকেট? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ভিআইপি রোডের উপর কেষ্টপুর থেকে কৈখালি পর্যন্ত মাঝেমধ্যেই কিছু ব্যানার এবং হোর্ডিং দেখা যেত। দেবরাজ চক্রবর্তীর ছবি দেওয়া হোর্ডিংয়ে লেখা থাকত ‘দেবরাজনীতি-তে বিশ্বাসী’।

Advertisement

বিগত সরকারের জমানায় শাসকদলের কোনও নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ছাড়া নিজের ছবি দিচ্ছেন, এটা ভাবাও যেত না। কিন্তু দেবরাজের বিরুদ্ধে দল কোনও দিন এই ধরনের হোর্ডিং দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ করেছে বলে শোনা যায়নি। দলের অন্দরেও দেবরাজের দাপট কতটা ছিল, তা এই তথ্যটুকু থেকেই বোঝা যায়।

কী ভাবে চলত দেবরাজের তোলা-সিন্ডিকেট?

Advertisement

কেবল হোর্ডিং পোস্টারে নয়, বাস্তবেও দলের অন্দরে সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন দেবরাজ এবং তার সঙ্গীরা। তাঁরা পরিচিত ছিলেন ‘দেব-অনুগামী’ হিসাবেই। এই তালিকায় বিধাননগর পৌর নিগমের অন্তত এক ডজন কাউন্সিলর, পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ দমদম পুরসভার বেশ কয়েক জন কাউন্সিলর, নিউটাউন লাগোয়া তিনটি পঞ্চায়েতের অধিকাংশ সদস্য এবং এক বিধায়কও ছিলেন বলে দাবি তৃণমূল কর্মীদের। দেবরাজের কাছে কার্যত ‘আত্মসমর্পণ’ করে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাঁচিয়েছিলেন ওই প্রাক্তন বিধায়ক, এমনটাই তৃণমূলের অন্দরে গুঞ্জন। আর এই অনুগামীদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল দেবরাজের তোলাবাজ সিন্ডিকেট, দাবি প্রাক্তন তৃণমূল কর্মী (বর্তমানে বিজেপি) বিশ্বজিৎ বিশ্বাসের।

নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর দেবরাজ পর্যন্ত পৌঁছোনোর আগেই তোলাবাজি-সহ একাধিক অভিযোগে গ্রেফতার হন বিধাননগর পুরনিগমের কাউন্সিলর সুশোভন মণ্ডল ওরফে মাইকেল। ‘দেব-অনুগামী’ তালিকায় প্রথম সারির। ঠিক সেরকমই দেবরাজের দুর্নীতির শিকড় খুঁজতে গিয়ে বার বার সেই অনুগামীদের নাম উঠে আসছে তদন্তে, যাঁদের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট দেবরাজ চালাতেন বলে অভিযোগ। নির্মাণ ব্যবসায়ী অভিজিৎ সাহা বাগুইআটি থানায় ২২ মে দেবরাজের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগেও উঠে এসেছে বিধাননগর পুরনিগমের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর মণীশ মুখোপাধ্যায়ের নাম।

বিভিন্ন ওয়ার্ডে অনুগামী কাউন্সিলরদের দিয়ে প্রোমোটারদের কাজ আটকে হুমকি দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা দাবি করত এই সিন্ডিকেট। টাকা দিয়েও রেহাই মিলত না। রাজারহাট বাগুইআটি এলাকায় একাধিক বড় আবাসন তৈরির সঙ্গে যুক্ত এক নির্মাণ ব্যবসায়ী বলেন, ‘‘আগেও সিন্ডিকেট ছিল। কিন্তু দেবরাজের মতো ভয়ঙ্কর ছিল না। দেবরাজ সিন্ডিকেটকে এককালীন টাকাও দিতে হত। পাশাপাশি, সমস্ত মালপত্রের বরাত দিতে হত দেবরাজের ঠিক করা সংস্থাকে। দেড়গুণ বেশি দামে কিনতে হত মালমশলা।’’

বাগুইআটি অর্জুনপুরের এক পুরনো প্রোমোটারের অভিজ্ঞতা, ‘‘তোলাবাজি শুরু হয়ে যেত জমি হস্তান্তর থেকে। যে কিনছে এবং যে বিক্রি করছে, দু’পক্ষের কাছ থেকেই তোলা নিত সিন্ডিকেট।’’

বিক্রয়যোগ্য জমির খবর পেলে দেবরাজের সিন্ডিকেটই কম পয়সায় মালিকের কাছ থেকে জমি দখল করে নিত। অভিযোগ, গায়ের জোরে ঠিক করত জমির দাম। দেবরাজের বিরুদ্ধে বেআইনি ভাবে জমি দখল করার সংগঠিত সিন্ডিকেট চালানোর অভিযোগও দায়ের হয়েছে।

দেবরাজের এই তোলা সিন্ডিকেটের গোড়ায় পৌঁছোতে তদন্তকারীরা তাই জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তলব করেছেন সেই ‘দেব অনুগামী’ একাধিক প্রাক্তন কাউন্সিলরকে। তার মধ্যে রয়েছেন, মণীশ মুখোপাধ্যায়, গোপাল বাগুই, মাইকেল, বিনু মণ্ডল। তালিকায় রয়েছেন রতন মৃধার মতো দেবরাজের ঘনিষ্ঠও, যিনি দেবরাজের অজ্ঞাতবাসের সময় সঙ্গী ছিলেন বলে পুলিশের সন্দেহ।

ডিসি গ্লোবাল রহস্য

দেবরাজের দুর্নীতির তদন্তে নেমে বার বার উঠে আসছে ডিসি গ্লোবাল নামে একটি সংস্থার নাম। জিএসটি খাতা ছাড়া যে সংস্থার অস্তিত্ব একমাত্র মেলে দেবরাজের একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের বাগুইআটি শাখায় রয়েছে ডিসি গ্লোবালের অ্যাকাউন্ট। টাকা রয়েছে আড়াই লাখেরও কম। কোম্পানির ঠিকানা হিসাবে উল্লেখ দেবরাজের তেঘড়িয়ার বাড়ির। খাতায়কলমে সাদা এবং বিদেশি মার্বেলের সাপ্লায়ার। কিন্তু বাগুইআটি থেকে এয়ারপোর্ট বা দক্ষিণ দমদমের অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পেরেছে, ডিসি গ্লোবালের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে কোটি কোটি টাকা। ডিসি গ্লোবালের আড়ালেই টাকা পাচার হয়েছে বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের। কারণ, এই সংস্থার কোনও ব্যবসার অস্তিত্ব না থাকলেও, সংস্থার নামে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় এবং ভিন্‌রাজ্যেও সম্পত্তি কেনা হয়েছে।

তদন্তকারীদের নজরে আরও তিন সংস্থা

দেবরাজের তোলা সিন্ডিকেটের বিপুল অর্থের হদিস পেতে গোয়েন্দাদের নজরে কেষ্টপুর শুলংগুড়ির ঠিকানায় নথিভুক্ত একটি অর্থলগ্নি সংস্থা।

দ্বিতীয় ছত্তীসগঢ়ের একটি সংস্থা। যারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাইনিং থেকে শুরু করে, রাস্তা, বা পরিকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন কাজ করে থাকে। জলজীবন মিশনের কাজের সঙ্গেও যুক্ত এই সংস্থা।

এই দুই সংস্থার সঙ্গেই দেবরাজের আর্থিক লেনদেনের হদিস মিলেছে। বিপুল অঙ্কের এই লেনদেনের নেপথ্যে রয়েছে কী রহস্য, জানতে চান গোয়েন্দারা।

তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই তল্লাশি চালিয়ে দেবরাজের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হদিস পেয়েছেন। এপ্রিল-মে মাসে বিপুল টাকা তোলা হয়েছে বলেও জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

অদিতির কোম্পানিও নজরে

দেবরাজের স্ত্রী, প্রাক্তন বিধায়ক অদিতি মুন্সি ২০২২ সালে একটি সংস্থা খোলেন। রেজিস্টার অফ কোম্পানিজ়ের দেওয়া তথ্য অনুসারে, সংস্থার মূল ব্যবসা মেলা, খেলা থেকে শুরু করে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। সেই সঙ্গে লটারি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। অদিতির শ্যামনগর উদ্বাস্তু কলোনির ঠিকানায় নথিভুক্ত এই সংস্থার আসল ব্যবসা কী, তা স্পষ্ট নয়। ওই সংস্থার আড়লেও সিন্ডিকেটের টাকা লগ্নি বা পাচার হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক পুলিশ আধিকারিকের কথায়, দেবরাজ এবং তাঁর স্ত্রীর ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পত্তির ফারাক সাদা চোখেই খুব প্রকট। তিনি অদিতির নামে থাকা তিনটি বিলাসবহুল গাড়ির কথা উল্লেখ করেন। যে তিনটি গাড়ির দামই কোটি টাকার বেশি। যতই তদন্ত এগোচ্ছে, ততই দুর্নীতির এই মডেল দেখে তাজ্জব হচ্ছেন গোয়েন্দারা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement