বাজার জুড়ে এমনই হাল।
দৃশ্য-১: বাগরি মার্কেট। ঘিঞ্জি রাস্তার পাশেই ছোট বড় অজস্র দোকান। রয়েছে সরু গলিও। মাথার উপরে বহু জায়গায় জটপাকানো ছোট-বড় অসংখ্য তার। কোথাও ল্যাম্পপোস্টে জড়ানো, আবার কোথাও বাজারের মধ্যেই বাড়ি থেকে পেঁচিয়ে ঢুকে গিয়েছে দোকানে। আর তার নীচ দিয়েই যাতায়াত করছেন অসংখ্য মালবাহক ও সাধারণ মানুষ।
দৃশ্য-২: রাজাকাটরা মার্কেট। চাপা অপরিসর গলির মধ্যে যাতায়াত করাই মুশকিল। তার মধ্যেও মাথার উপরে বিভিন্ন জায়গায় জটপাকানো তার। বেশ কিছু তার থেকে আরও তার টেনে ঢোকানো হয়েছে একাধিক দোকানে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বড়বাজারের বিভিন্ন মার্কেটে ঘোরাফেরা করলে নজরে পড়বে এমনই বহু চিত্র। আর সেগুলিই উস্কে দেবে ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে নন্দরাম মার্কেটের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি। যে আগুনে পুড়ে গিয়েছিল মার্কেটের ১২০০টিরও বেশি দোকান। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় আগুন লেগেছে বড়বাজারে। নন্দরামের অগ্নিকাণ্ডের পরেই কলকাতা পুরসভা এবং দমকল বিভাগ থেকে অগ্নিবিধি মেনে চলার কথাও ঘোষণা করা হয়। সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অবশ্য আমূল পাল্টে ফেলা হয়েছে নন্দরাম মার্কেটের বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু বড়বাজারের অন্যান্য মার্কেটগুলিতে ঘুরে দেখা গেল অগ্নিনির্বাপণ ও সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা রয়ে গিয়েছে সেই মান্ধাতার আমলেই।
কলকাতার ব্যস্ততম এলাকাগুলির একটি হল বড়বাজার। সেখানেই নন্দরাম মার্কেট, বাগরি মার্কেট, রাজাকাটরা, মনোহরদাসকাটরা, লোহিয়াকাটরা, সদাসুখকাটরার মতো বেশ কয়েকটি বড় এবং অসংখ্য ছোট ছোট মার্কেট কমপ্লেক্স। কিন্তু অধিকাংশই পরিকল্পিত ভাবে গড়ে ওঠেনি। প্রায় সবক’টি বাজার জুড়ে প্রায় মাকড়সার জালের মতো মাথার উপরে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য তার। পুরনো বিপজ্জনক বাড়ির তলায় সেই তারের জালের নীচেই চলছে দোকানগুলি। বেশ কিছু আইনি সংযোগ থাকলেও রয়েছে বেআইনি বিদ্যুৎ সংযোগও।
পুরসভা সূত্রে খবর, নন্দরাম মার্কেটে আগুন লাগার পরে ওভারলোডের কারণে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন আটকাতে সিইএসসি থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল পুর-বাজারগুলির বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে সার্কিট ব্রেকার লাগানো হবে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৩ সালে পুরসভা এবং সিইএসসি থেকে যৌথ সমীক্ষা চালানো হয়। দেখা যায়, দমকলের ছাড়পত্র ছাড়াই রমরমিয়ে চলছে ২৪০টি বাজার। এর মধ্যে কলকাতা পুরসভার নিজস্ব বাজার ৪৬টি। বাকিগুলি চলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। এর মধ্যে প্রায় ১৪৫টি বাজারেই ইলেকট্রিক ওয়্যারিংয়ের অবস্থা তথৈবচ। যার মধ্যে অন্যতম বড়বাজার।
কী বলছে কলকাতা পুরসভা? মেয়র পারিষদ (বাজার) তারক সিংহের অভিযোগ, যে বাজারগুলিতে সিইএসসি থেকে সার্কিট ব্রেকার লাগানো হয়েছিল, সেখানেও অনেক অসাধু ব্যবসায়ী তাতে কাঠ গুঁজে রাখেন, যাতে কখনই বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে না যায়। তারকবাবুর কথায়, “অগোছালো ভাবে নিয়ম না মেনে যে যার মতো বিদ্যুৎ টেনে নিয়েছে। আমরা বাজার ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ এবং ভিডিওগ্রাফি করছি। সমস্ত তথ্য মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হবে।”
দমকলের কর্তাদের একাংশই মনে করছেন, আচমকা অগ্নিকাণ্ডে বড়বাজারের অনেক মার্কেটেই আগুন নেভানো খুব বড় একটা সমস্যা। দমকলের ডিজি ডি পি তারানিয়া বলেন, “বড়বাজারের মতো এলাকায় জায়গার অভাবে কিছু করাটাই খুব সমস্যার। এলাকায় চওড়া নর্দমা, জলের ট্যাঙ্ক অবশ্যই দরকার। এ বিষয়ে মেয়র পারিষদের সঙ্গে কথাও হয়েছে। কিন্তু অত লোকজনকে একেবারে সরিয়ে কিছু করাটাই তো অসুবিধের।”
তবে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ছাড়া কোনও ব্যবস্থা নেওয়াই যে সমস্যার, তা স্বীকার করছেন প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্তারাই।
ছবি: রণজিৎ নন্দী।