হৃদয় যে বাঁধা পড়ে আছে কলকাতায়...

তিলোত্তমা কলকাতা জীবনের প্রতিটির মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ছোটবেলা থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়, তার পর চাকরি পেয়ে দুরুদুরু বুকে কলেজে প্রথম ক্লাস নিতে যাওয়া— সবই তো এই কলকাতায়। কলকাতার আনাচে-কানাচে, অলিতে-গলিতে জড়িয়ে আছে নানা স্মৃতি। অনেক ভাল লাগার মুহূর্ত! প্রথম শাড়ি পড়ে স্কুলে যাওয়া, প্রথম প্রেমপত্র পাওয়া, প্রথম বন্ধুদের সঙ্গে ‘এক দুজে কে লিয়ে’ দেখতে যাওয়া— এই রকম অনেক প্রথমের সাক্ষী এই শহর। তাকে কি ভোলা যায়? জীবনের সমস্ত ওঠা-পড়া, সুখ-দুঃখ, ভাল লাগা-খারাপ লাগা— কলকাতা যে তার নীরব সঙ্গী!

Advertisement

সোমা বসাক

শেষ আপডেট: ২১ জুলাই ২০১৫ ০০:০০
Share:

তিলোত্তমা কলকাতা জীবনের প্রতিটির মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

Advertisement

ছোটবেলা থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়, তার পর চাকরি পেয়ে দুরুদুরু বুকে কলেজে প্রথম ক্লাস নিতে যাওয়া— সবই তো এই কলকাতায়। কলকাতার আনাচে-কানাচে, অলিতে-গলিতে জড়িয়ে আছে নানা স্মৃতি। অনেক ভাল লাগার মুহূর্ত! প্রথম শাড়ি পড়ে স্কুলে যাওয়া, প্রথম প্রেমপত্র পাওয়া, প্রথম বন্ধুদের সঙ্গে ‘এক দুজে কে লিয়ে’ দেখতে যাওয়া— এই রকম অনেক প্রথমের সাক্ষী এই শহর। তাকে কি ভোলা যায়? জীবনের সমস্ত ওঠা-পড়া, সুখ-দুঃখ, ভাল লাগা-খারাপ লাগা— কলকাতা যে তার নীরব সঙ্গী!

আমরা যখন স্কুলে পড়তাম বা কলেজে তখন তো ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার এই সব কিছু ছিল না। তাই এখনকার মতো সমস্ত পৃথিবী জুড়ে শয়ে শয়ে ফেসবুক ফ্রেন্ড ছিল না। বন্ধু বলতে হাতে গোনা কয়েক জন— স্কুলে, কলেজে বা পাড়ায়। ছুটিছাটায় এখনকার মতো ‘লং ড্রাইভে’ বা ‘উইক-এন্ড ট্যুরে’ যাওয়ার এতটা চল ছিল না। ডিসেম্বরের ছুটিতে আমরা বাড়ির সকলের সঙ্গে বেড়াতে যেতাম চিড়িয়াখানায়, ভিক্টোরিয়ায় বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে। আমাদের ছোটবেলায় পৃথিবীটা যেন কলকাতাতেই আবদ্ধ ছিল।

Advertisement

কলকাতার সঙ্গে যেন এক অন্য রকমের অনুভূতি জড়িয়ে আছে.... তাই কর্মসূত্রে এই চেন্নাইতে এসেও তাকে ভুলিনি এক মুহূর্তের জন্যও! থাকতে থাকতে এখানকার ভাষা, মানুষজন বা সংস্কৃতির সঙ্গে হয়তো পরিচিত হয়েছি খানিকটা তবে সেটা নেহাতই অভ্যাস বা জীবনযুদ্ধের তাগিদে— তার সঙ্গে হৃদয়ের যোগ বড়ই কম। হৃদয় যে বাধা পড়ে আছে কলকাতায়!

তাই আজও অফিস থেকে ফিরে চায়ের কাপ নিয়ে দু’জনের গল্প শুরু হয় কলকাতা নিয়ে। আজ গরম কেমন বা আজ কলকাতায় বৃষ্টি হয়েছে কিনা থেকে শুরু করে কলকাতার যাবতীয় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক খুঁটিনাটির বিস্তারিত আলোচনা। এখানকার খবর নিয়ে বা তাপমাত্রার পারদ নিয়ে যত না কৌতহূল তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহ কলকাতার খবর জানতে। শুধু বাড়িতে কেন, এখানকার বাঙালিদের কোনও সমাবেশেও ঘুরে-ফিরে, জ্ঞানে-অজ্ঞানে কলকাতা তার সমস্ত সত্ত্বা নিয়ে ঢুকে পড়ে আমাদের আড্ডায়। সে দিন এখানকার এক বন্ধু ফোনে অনেক ক্ষণ ‘এনগেজ’ পেয়ে, পরের দিন অনুযোগ জানালে তাঁকে নির্দ্ধিয়ায় বলে ফেললাম, ‘‘কলকাতায় কথা বলছিলাম যে।’’ ভাবটা এমন, কলকাতার লোকের সঙ্গে আলাপচারিতায় সময়ের যে কোনও হিসেব থাকবে না এটাই যেন স্বাভাবিক। এখনও কোনও বাঙালি বন্ধু বাড়িতে এলে তাকে কলকাতার চা বা সেখানকার নলেন গুড়ের সন্দেশ খাওয়াতে পারলে সে কি আনন্দ! এতে যেমন আমার অতিথি, তেমন আমিও— দু’জনেই যেন কলকাতার খানিকটা স্পর্শ পেলাম। এই ভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি উপলব্ধিতে আজও কলকাতা জড়িয়ে আছে গভীর ভাবে।

Advertisement

নানা ছুতোনাতায় তাই মাঝে মাঝেই ছুটে যাই কলকাতায়। যে কারণ নিয়ে প্রাথমিক ভাবে যাওয়া, সেটা হয়তো হয়ে যায় গৌণ! আসলে কলকাতার উষ্ণ আবেগের পরশ পেতে যাই। ছোট কোনও জিনিস কেনার অজুহাত নিয়ে সারা দুপুর হাতিবাগান বা গড়িয়াহাটের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, অ্যাকাডেমিতে বাংলা নাটক দেখার পুরনো অভ্যাস ঝালিয়ে নেওয়া বা কোনও অলস সন্ধেতে আলুর চপ খেতে খেতে পুরনো বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা মারা— তখন কলকাতার বাইরে থাকার এতগুলো বছর কোথায় যেন হারিয়ে যায়, মনে হয় এখানেই তো ছিলাম!

একটু একটু করে কলকাতা পাল্টেছে অনেক— কথায় বা বেশভূষায়। এখন চারিদিক বড় বড় ফ্লাইওভার, বহুতল ফ্ল্যাট, সুন্দর সুন্দর বাস, বিশাল বিশাল শপিং মল। কিন্তু, সার্বিক চরিত্রটা পাল্টায়নি একটুও— সেই প্রাণের স্পন্দনটা আজও একটু আছে যেন। কলকাতার চরিত্রের এই স্বতন্ত্রতা কলকাতা থেকে যত না বোঝা যায়, কলকাতা ছেড়ে এলে তার চেয়ে অনেক বেশি বোঝা যায়। অনন্য কলকাতা তার ভিড়, জ্যাম-জট, মিছিল, স্লোগান, বন্ধু, ক্রিকেট, ফুটবল, নাটক, ট্রাম— সব কিছু নিয়ে তো দিব্যি আছে!

অন্য অনেক শহরের তুলনা করলে পরিসংখ্যান গত ভাবে কলকাতা মহানগরীর উন্নয়নে হয়তো সেই প্রত্যাশিত গতি নেই। তবু তো আজও কলকাতার পাতায় পাতায় পঁচিশে বৈশাখ আছে, পুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে নতুন শাড়ির গন্ধ আছে, বইমেলার প্রাঙ্গনে লাখো মানুষের ঢল আছে, আর হাওড়া বা এয়ারপোর্টে নেমে ট্যাক্সিতে উঠলে সেই অতি চেনা একটু গন্ধের আঘ্রান আছে... এটাই বা কম কিসে!

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর। তার পর বেশ কয়েক বছর, কলকাতারই একটি কলেজে অধ্যাপনা। স্বামীর কর্মসূত্রে ২০০৪ থেকে চেন্নাইতে বসবাস। বর্তমানে এখানে একটি ‘ই-লার্নিং’ কোম্পানিতে দায়িত্বপূর্ণ পদে কর্মরত। বই পড়ার পাশাপাশি একটু আধটু লেখালেখি আর ঘুরে বেড়ানোই প্যাশন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement