শনিবার সকালে ধর্মতলার মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
মমতা নিজের লেখা কবিতা পড়ে শোনালেন, নাম ‘আতঙ্ক’।
মমতা জানান, যে মানুষগুলি এখানে এসেছেন, তাঁদের জন্যই আন্দোলন। তাঁর কথায়, ‘‘অন্যায় কে করল? এরা ভোটার নয়? সব কাগজ রয়েছে, তা-ও ভ্যানিশ করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারও থাকবে।’’
মমতা বলেন, ‘‘দিল্লি দূরে নয়। বাংলা রাজি মানুষের স্বার্থে যে কোনও লড়াই করতে। বিহারে তথ্যগত অসঙ্গতির বিষয় ছিল না। দয়া করে এখানকার মানুষদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দিন। ১৩টি নথি লাগে না। একটি হলেই হল। আধার কেন্দ্রীয় সরকার চালু করেছিল। কেউ নিজেকে সুপাহিউম্যান, সুপারম্যান ভাবে। মাকালী, আল্লা, যিশুর থেকেও বেশি ভাবে। মানুষ না থাকলে আপনিও থাকবেন না। আরও অনেকে রয়েছে, যাঁদের তালিকায় নাম নেই। সকলে প্রকৃত ভোটার।’’ মমতা সকলে মঞ্চের সামনে গিয়ে নথি দেখাতে বললেন। বললেন, ওরা মহিলাদের ভয় পায়।
মমতা বলেন, ‘‘বিচারক, বিচারপতিদের অনুরোধ, দয়া করে মানুষকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দিন। ৫৮ লক্ষ আনম্যাপড। ৬ লক্ষ নতুন ভোটারের নাম ঢুকেছে। এখন ৪.৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিচ্ছেন। মহিলা, কৃষক, মতুয়া, রাজবংশী, তফসিলি, সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দিচ্ছেন। নির্বাচনের আগে চাইছে, বিজেপি যাতে জেতে। ওরা জিতবে না।’’
মমতা বলেন, ‘‘এরা আমার ভোটার। আমাকে কাটবে! ঘেঁচু করবে। হোঁদল কুতকুত আছে, তিনি বসে বসে কলকাঠি নাড়ছেন। চার মাস ধরে দখল করেছো বাংলা। নির্বাচনের ১৫ দিন আগে ধনখড়ের মতো বদল করলে আনন্দ বোসকে। আর কত? কত নেবে মানুষের প্রাণ? স্বৈরাচারী, ধ্বংসকারী, হঠকারী। এত মানুষের মৃত্যু, হৃদয়ে মায়া জাগে না! যার নাম কেটেছে, ভাবছে, আমি কি এদেশে থাকতে পারব। আমি পাশে আছে। চিন্তা করবেন না। ’’
মমতা বলেন, ‘‘আপনাদের জবাব দিতেই হবে মানুষকে, সংবিধানকে। আপনারা (কমিশন) শুধু বিজেপি-কে সন্তুষ্ট করছেন। ভ্যানিশ কুমার। পক্ষপাতদুষ্ট বিজেপি, ডার্টি, নটি বিজেপি। যারা ভোটারদের নাম ডিলিট করছে, তারাও তা-ই। স্বার্থপর দৈত্যের মতো কাজ করছে।’’
মমতা বলেন, ‘‘প্রমাণপত্র নিয়ে এসেছি জনগণের সামনে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য় করছে ওরা। দেখুন, এঁদের সকলের আধার কার্ড রয়েছে (মঞ্চে হাজির নাম কাটা যাওয়া ব্যক্তিদের)। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আধারও একটি নথি হতে পারে। বিজেপির পক্ষপাতদুষ্ট কমিশনের কারণে সব অমান্য করা হচ্ছে। ভোটারদের নাম কেন কাটা হচ্ছে? জবাব দিন।’’
ধর্মতলার মঞ্চে নাম কাটা যাওয়া ভোটারদের হাজির করালেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পরেই কটাক্ষ করলেন কেন্দ্রীয় সরকারকে। তিনি বলেন, ‘‘অধিকার লুট করছে দেখুন, ভোটাধিকার লুট করছে, এই লুটেরাদের ক্ষমা রয়েছে? নোটবন্দি, ভোটবন্দি, গ্যাসবন্দি, সংবিধানবন্দি। লড়তে পারে একমাত্র বাংলা, আমরা প্রমাণ করে দেব।’’
ধর্মতলার মঞ্চে চলছে গান। গান গাইলেন তৃণমূল সাংসদ দোলা সেন। মমতা জানান, সংস্কৃতি হল আন্দোলনের প্রাণ। তুলে ধরলেন নিজের অভিজ্ঞতা।
মমতা বলেন, ‘বেচারা নীতীশ কুমার! ভোটের আগে ওবিসি নিয়ে রাজনীতি। ভোটের পরে তুমি হলে দিল্লিবাসী। যে-ই গেছ বিজেপির খপ্পরে, পড়েছ থাপ্পড়ে। দেখলেন তো আনন্দ বোসকে কী ভাবে সরানো হল। ভয় দেখিয়ে।’’
মমতা জানান, রাজ্যে মহিলাদের কী কী সুবিধা রয়েছে। মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ, মাতৃত্বকালীন ছুটি।
মমতা জানান, দিনহাটায় ৩৬ হাজার নাম কেটেছে। আমার কেন্দ্রে ৬০ হাজার কেটেছে। সব কেটে নাও, চ্যালেঞ্জ রইল। কাল মিছিল হবে, গ্যাস নাই, রান্না নাই। হাড়ি, কড়াই, হাতা, খুন্তি নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল হবে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে। মানবিকতা পালনের জন্য মা-বোনদের রাস্তায় নামতে বলেন তিনি। কাল শাড়ি পরার কথাও জানান তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘এটা প্রতিবাদের জন্য, অশান্তির জন্য নয়। প্রতিবাদের ভাষা বেছে নিতে হবে।’’
মমতা বলেন, ‘‘কেরোসিনও নেই যে স্টোভ জ্বালাবে। বাস্তব জীবনে যা প্রয়োজন, সকলের প্রয়োজন। কেন উপহার নেওয়ার আগে পরিকল্পনা করেননি? জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছেন! বঙ্গভঙ্গ করার জন্য ভোট কাটার পরিকল্পনা! মানুষ যাতে প্রতিবাদ করেত না পারে, তাই পরিকল্পনা। প্রত্যাঘাত সহ্য করতে হবে। আমরা লেজ গুটিয়ে পালানোর লোক নই। আপনাদের মুখোশ খুলব।’’
মমতা বলেন, ‘‘গত কাল ৬০ টাকা গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। তিন দিন আগে ৪৯ টাকা বাড়িয়েছে। বড় সিলিন্ডারের দাম ২১০০ টাকা। ছোট সিলিন্ডার ১০০০ টাকা হয়েছে। ২১ দিন আগে বুক করতে হবে। গ্যাস না থাকলে কার মাথা খেয়ে থাকবেন! এগুলো আগে ভাবা উচিত ছিল না কমরেডদের? ওদের কমরেড বলি। কমরেড শব্দ শ্রদ্ধা করি। বেনামি কমরেডদের নয়। ’’
ধর্মতলার অবস্থানমঞ্চে শনিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
মমতা বলেন, ‘‘বাংলা ভাষা দেশ স্বাধীনের অনেক আগে স্বীকৃতি পেয়েছিল। বাংলার অস্তিত্ব, অস্মিতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মেধা, প্রতিভা , চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির। আমি ওদের নাম নিই না। বলছে বাংলা বিহার ভাগ করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করবে। ওদের ধান্দা বাংলাকে ভাগ করা। বিহারকে করেছে একবার। লুটেপুটে খাওয়া ওদের কাজ।’’
মমতা বলেন, ‘‘দেওচা পচামি হচ্ছে। এক লক্ষ মানুষের চাকরি হবে। ১০০ বছর বিদ্যুতের অভাব হবে না। সব জায়গায় বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে। ৬ লক্ষ কোটি টাকা দেনা আগের সরকারে শোধ করেছি। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ২ লক্ষ কোটি টাকা পাই। ৮ লক্ষ কোটি টাকা বাদ দিয়ে ধনে, জিডিপি, পরিকাঠামো, রাজস্বে উপরে রয়েছি। সব উৎসব পালন হয়।’’
মমতা জানান, শয়ে শয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক হয়েছে রাজ্যে। তাঁর কথায়, ‘‘জাতীয় পলিসি করে আমাদের কয়লা নিয়ে চলে যাওয়া হয়। বদনাম দেওয়া হয়। যদিও এটা আমাদের অধীনে নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। সিআইএসএফ দেখে, কোল ইন্ডিয়া দেখে।’’
মমতা বলেন, ‘‘আমরা জিআই ট্যাগ পেয়েছি। বর্ধমানে সীতাভোগ, মিহিদানা, বিষ্ণুপুরের বালুচরি, ডোকরা থেকে জয়নগরের মোয়া, দক্ষিণ দিনাজপুরের তুলাইপঞ্জি চাল, মুর্শিদাবাদের সিল্ক থেকে অনেক শিল্প রয়েছে, যাতে জিআই ট্যাগ পেয়েছি। অনেক ছেলে-মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। ছ’টি ইকোনমিক করিডর সারা বাংলাকে জুড়বে।’’
মমতা জানান, রাজ্যে ছ’টি ইকোনমিক করিডর হচ্ছে। শালবনিতে ১৬০০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে দু’টি। তাঁর কথায়, ‘‘তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে রাজ্য এক নম্বরে। বেঙ্গালুরুর থেকেও বেশি মানুষ এখানে কাজ করেন। ২০০টি সংস্থা নতুন করে এসেছে। যারা বাংলাকে নিয়ে বদনাম করে, তাদের জানা উচিত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আমরা দেশে এক নম্বরে। চাকরি করে দেড় কোটি মানুষ। লেদার হাবে সাড়ে সাত লক্ষ মানুষ কাজ করেন।’’