রবিবার সিঙ্গুরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: সংগৃহীত।
মোদী বলেন, “তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের এবং দেশের সুরক্ষা নিয়ে খেলা করছে। এখানকার তরুণদের বিশেষ করে সতর্ক থাকতে হবে। তৃণমূল এখানে অনুপ্রবেশকারীদের বিভিন্ন সুবিধা দেয়। অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচাতে ধর্নায় বসে। তৃণমূল অনুপ্রবেশকারীদের এই কারণেই পছন্দ করে, কারণ তারা ওদের ভোটব্যাঙ্ক। অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচাতে তৃণমূল যে কোনও পর্যায়ে যেতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার গত ১১ বছর ধরে তৃণমূল সরকারকে বার বার চিঠি লিখছে। বলা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে কাঁটাতার দিতে হবে। জমি দরকার। কিন্তু তৃণমূলের কোনও হেলদোল নেই। যারা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ভুয়ো নথি বানিয়ে দেয়, তাদের সাহায্য করে তৃণমূল। অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করতে হবে। যাঁরা অতীতে বিভিন্ন ভুয়ো নথি বানিয়ে এ দেশের ভি়ড়ে মিশে গিয়েছেন, তাঁদেরও নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে।”
মোদী বলেন, “এখানে কলেজে ধর্ষণ এবং হিংসায় লাগাম টানতে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা দরকার। আপনার একটি ভোটই নিশ্চিত করবে এ রাজ্যে সন্দেশখালির মতো ঘটনা আর হবে না। আপনার ভোটই নিশ্চিত করবে যে, আগামী দিনে ফের কখনও হাজার হাজার শিক্ষক নিজেদের চাকরি হারাবেন না। হুগলিকে তারা শিক্ষক নিয়োগদুর্নীতির জন্য বদনাম করেছে। এ রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ঠিক হলে তবেই বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু এখানে মাফিয়াদের ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে সব কিছুতে সিন্ডিকেট ট্যাক্স বসিয়ে রাখা হয়েছে। এই সিন্ডিকেট ট্যাক্স এবং মাফিয়াবাদকে বিজেপিই শেষ করবে। এটাই মোদীর গ্যারান্টি।”
মোদী বলেন, “ত্রিপুরায় যখন বামপন্থীদের সরকার ছিল, তখন ১০০টির মধ্যে চারটি বাড়িতে প্রশাসনের তরফে পানীয় জল সরবরাহ হত। এখন বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকারের জন্য সেখানে ১০০টির মধ্যে ৮৫টি বাড়িতে পানীয় জল সরবরাহ হচ্ছে। এখন পশ্চিমবঙ্গে অর্ধেক মানুষের বাড়িতে জল সরবরাহ হয় না। ত্রিপুরায় বিজেপি ক্ষমতা না-এলে সেখানে এখনও সেই পরিস্থিতিই থাকত। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এলে এই পরিস্থিতি বদলাবে।”
মোদী বলেন, “দেশের ভোটারেরা এখন জেগে গিয়েছেন। যাঁরা বাধা দিচ্ছেন (উন্নয়নে), তাঁরা প্রত্যেকে সাজা পাচ্ছেন। দিল্লিতেও এমনই একটি সরকার ছিল, যারা কেন্দ্রের প্রকল্পকে কার্যকর হতে দিত না। আমরা তাদের বার বার বলতাম গরিবদের চিকিৎসার আয়ুষ্মান প্রকল্প চালু করো। কিন্তু ওরা শুনতই না। শুধু রাজনৈতিক হিসাবনিকেশ করতে ব্যস্ত থাকত। সেই জন্য দিল্লিবাসী ওদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষও স্থির করে নিয়েছেন, তাঁরাও তৃণমূলের নির্মম সরকারকে ‘সবক’ শেখাবেন এবং বিজেপির সরকার তৈরি করবেন।”
মোদী বলেন, “মৎস্যজীবীদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম খুলেছে। বিভিন্ন রাজ্য সেখানে নিজ নিজ এলাকার মৎস্যজীবীদের নাম রেজিস্টার করছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তাতে ‘ব্রেক’ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি বার বার এ রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে চিঠি লিখি। মুখ্যমন্ত্রী চিঠি পড়েন না। কিন্তু অফিসারদের তো পড়তে দিন। তৃণমূল সরকার এখানকার মৎস্যজীবী যোজনায় রেজিস্ট্রেশনে কোনও সাহায্য করছে না। তৃণমূল রাজ্যের মৎস্যজীবীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করছে।”
মোদী বলেন, “আমি পশ্চিমবঙ্গের তরুণ, কৃষক, মা-বোনেদের যথাসম্ভব সেবা করতে চাই। কিন্তু তৃণমূল সরকার এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পকে আপনাদের কাছে পৌঁছোতেই দেয় না। এদের মোদীকে নিয়ে সমস্যা, তা আমি বুঝি। বিজেপির সঙ্গে শত্রুতা, তা-ও আমি বুঝি। কিন্তু তৃণমূল তো পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের সঙ্গেই শত্রুতা করছে। তৃণমূল এ রাজ্যের তরুণ, কৃষক, মৎস্যজীবী এবং মা-বোনদের সঙ্গে শত্রুতা করছে তৃণমূল।”
মোদী বলেন, “ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দের জন্মজয়ন্তীকে জাতীয় স্তরে পালন করার উদ্যোগও নিয়েছে আমাদের সরকার। বিজেপি বিকাশ এবং ঐতিহ্য উভয়কেই গুরুত্ব দেয়। এই দুইয়ের মডেলেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বিকাশে গতি দেবে। পশ্চিমবঙ্গের অনেক সামর্থ্য রয়েছে। অনেক বড় বড় নদী রয়েছে। বিশাল উপকূলরেখা রয়েছে। উর্বর জমি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলায় কিছু না কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। এখানকার সাধারণ মানুষদের বুদ্ধি, প্রতিভা, সামর্থ্য রয়েছে। বিজেপি প্রত্যেক জেলার হিসাবে পরিকল্পনা তৈরি করবে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট জেলার মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। যেমন এই জেলায় ধনিয়াখালি শাড়ি আছে, এখানে পাট আছে, হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িত অন্য সামগ্রী রয়েছে। বিজেপির ‘এক জেলা, এক পণ্য’ প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেক জেলার এমন পণ্যে উৎসাহ দেবে। বিজেপি সরকার এলেই প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে কড়়া নীতি গৃহীত হবে। পাট শিল্পকে আরও উৎসাহিত করা হবে।”
মোদী বলেন, “বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতিও আমাদের সরকারের আমলেই হয়েছে। বিজেপি দিল্লিতে সরকার গঠনের পরই তা হয়েছে। এর ফলে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণায় আরও গতি আসবে। বিজেপি সরকারের উদ্যোগেই দুর্গাপুজোকে ইউনেসকো কালচারাল হেরিটেজের স্বীকৃতি দিয়েছে।”
মোদী বলেন, “বিজেপি সরকারই দিল্লিতে কর্তব্যপথে ইন্ডিয়া গেটের সামনে নেতাজি সুভাষবাবুর প্রতিমা বসিয়েছে। প্রথম বার লালকেল্লা থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের অবদানকে স্মরণ করা হয়েছে। আন্দামান নিকোবরে নেতাজির নামে দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে। আগে ২৬ জানুয়ারির কর্মসূচি ২৪-২৫ তারিখ থেকে শুরু হত। ৩০ তারিখ শেষ হত। আমরা তা বদলে দিয়েছি। এখন ২৩ জানুয়ারি নেতাজি সুভাষবাবুর জন্মজয়ন্তী থেকে শুরু করেছি। মহাত্মা গান্ধীর পূণ্যতিথিতে তা পূরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
মোদী বলেন, “পুরো সংসদ, পুরো দেশ ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে। হুগলি এবং বন্দেমাতরমের সম্পর্ক তো আরও গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, এখানেই ঋষি বঙ্কিমজি বন্দেমাতরমকে পূর্ণতা দিয়েছেন।”
মোদী বলেন, “বিহারে এনডিএ জঙ্গলরাজ আরও এক বার আটকে দিয়েছে। এ বার পশ্চিমবঙ্গও টিএমসি-র মহাজঙ্গলরাজকে বিদায় করতে প্রস্তুত।” স্লোগান তোলেন, “পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার।” শনিবারও প্রধানমন্ত্রীর মুখে এই স্লোগান শোনা যায়।
মোদী বলেন, “আমাদের আসল পরিবর্তন চাই। সকলে এই মনোভাব নিয়েই আজ সভায় এসেছেন। সকলেই ১৫ বছরের মহাজঙ্গলরাজকে বদলাতে চাইছেন।”
মোদী বলেন, “আজ সকালে আমি মা কামাখ্যার মাটিতে ছিলাম। এখন বাবা তারকনাথের মাটিতে আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
সরকারি কর্মসূচি শেষ করে দলীয় জনসভার মঞ্চে পৌঁছোলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
মোদী বলেন, “ভারত বর্তমানে মৎস্যকেন্দ্রিক এবং সামুদ্রিক খাদ্যের উৎপাদন এবং রফতানিতে দ্রুত এগিয়ে চলছে। আমার স্বপ্ন পশ্চিমবঙ্গ এতে দেশকে নেতৃত্ব দিক।”
ইলেকট্রিক ক্যাটামেরান পরিষেবার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিশেষ ধরনের অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি এই জলযান ৫০ জন যাত্রীকে বহন করতে সক্ষম। শীততাপনিয়ন্ত্রিত কেবিন-সহ এই জলযান শহরের যানজট কিছুটা কমাতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন প্রকল্পগুলির ফলে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন আরও বৃদ্ধি পাবে পশ্চিমবঙ্গে। সিঙ্গুরের সভা থেকে এমনটাই বললেন মোদী।
প্রধানমন্ত্রী মোদী জানান, রবিবার যে তিনটি অমৃত ভারত এক্সপ্রেস চালু করা হয়েছে, তার মধ্যে একটি ট্রেন তাঁর নিজ সাংসদীয় এলাকা কাশী (বারাণসী)-র সঙ্গে যোগাযোগ আরও উন্নত করবে।
মোদী বলেন, “কাল আমি মালদহে ছিলাম। আজ এখানে। হুগলিতে আপনাদের কাছে আসার সৌভাগ্য হয়েছে। বিকশিত ভারতের জন্য পূর্ব ভারতের বিকাশের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ধারাবাহিক ভাবে কাজ করছে। পশ্চিমবঙ্গের কয়েকশো কোটি টাকার প্রকল্পের শিলান্যাস করলাম।”
জয়রামবাটী–বড়গোপীনাথপুর–ময়নাপুর নতুন রেললাইনের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনটি নতুন অমৃত ভারত এক্সপ্রেসের এবং একটি নতুন প্যাসেঞ্জার ট্রেনেরও সূচনা করলেন তিনি।