(বাঁ দিক থেকে) দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
গত শুনানিতে মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল আদালতে। কমিশন জানিয়েছিল, রাজ্য কর্মী না দেওয়ায় মাইক্রো অবজ়ার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আইনজীবীদের সঙ্গে আদালতে হাজির ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী দেওয়া হবে। সেই মতো কর্মী দেওয়ার কথা জানায় রাজ্য। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, রাজ্য নিশ্চিত করবে ৮,৫০৫ জনই গ্রুপ-বি অফিসার। মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ডিইও বা ইআরও-র কাছে তাঁদের রিপোর্ট করতে হবে। এবং, দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টে মুখ্যমন্ত্রীর সওয়াল নিয়ে একটি আবেদন করা হয়েছিল। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, “এতে অস্বাভাবিক কী আছে? এটাই তো সংবিধানের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রকাশ। এই বিষয়টিকে রাজনীতিকরণ করবেন না।”
কমিশনের আইনজীবীও আদালতকে জানান, “রাজ্য আমাদের নির্দেশ পালন করছে না। সাসপেন্ড করছে না। এফআইআর করছে না। রাজ্য বলছে আমাদের কিছু করার নেই। প্রতিটি পদক্ষেপে রাজ্য অসহযোগিতা করছে।”
আইনজীবী গোপাল এস বলেন, “কমিশন চাইছে মহকুমাশাসক পদমর্যাদার আধিকারিক দেওয়া হোক। পশ্চিমবঙ্গকে তা হলে ৮,০০০টি জেলা বানাতে হবে, যাতে ৮,০০০ জন মহকুমাশাসক দেওয়া যায়। এটা বাস্তবে অসম্ভব।” মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দিওয়ানও বলেন, “মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের বলা হচ্ছে তাঁরা ইআরও বা এইআরও-র সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত কি না, তা মার্ক করতে। মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের এক ধরনের বেআইনি ভূমিকা দেওয়া হচ্ছে। ইআরও এবং এইআরও ঠিক বলার পরেও, মাইক্রো অবজ়ার্ভারকে কার্যত ট্রাম্প কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এটা কোনও ভাবেই ঠিক নয়।”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি কান্ত বলেন, “তবে কি ইআরও এবং এইআরও-রা মাইক্রো অবজ়ার্ভারের মন্তব্যের জন্য অপেক্ষা করবেন?”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দিওয়ান বলেন, “নামের বানান গরমিলের ক্ষেত্রে ডিফল্ট অবস্থান হওয়া উচিত। এই ভোটারদের বাদ দেওয়া যাবে না। কমিশনকে এমন নির্দেশ দিন।” তবে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, “এই মুহূর্তে আমরা এমন কোনও নির্দেশ দিতে পারি না।” দিওয়ান আরও বলেন, “১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে। তারপর আর আপিল করার সুযোগ থাকবে না। একবার ফাইনাল রোল (চূড়ান্ত ভোটার তালিকা) হলে, তার পরেই নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি হবে। আমাদের একটাই উদ্বেগ— গণহারে যেন ভোটারদের বাদ না দেওয়া হয়।”
সুপ্রিম কোর্টে কমিশন জানায়, “আমরা কী ভাবে এখন রাজ্যের দেওয়া ৮,৫০০ জন অফিসারকে প্রশিক্ষণ ছাড়া নেব? ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ দিন। আসলে এই কাজ নিয়ে তিলকে তাল বানানো হচ্ছে।” তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, “এখন যে ৮,৫০০ জন পাঠানো হচ্ছে, তাঁদের আগামিকালই রিপোর্ট করে কাজে যোগ দিতে দিন।” তবে কমিশনের বক্তব্য, আগে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। কমিশনের আইনজীবী বলেন, “আগে ওই কর্মীদের প্রশিক্ষণ দরকার। না হলে তাঁরা কিছুই বুঝতে পারবেন না। কোনটা কী ভাবে করবেন?”
কমিশনের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, “সিদ্ধান্ত আপনারা নিন। তাঁরা শুধু সাহায্য করবে। আমরা বলছি না তাঁরা কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন।” কমিশনের আইনজীবী তাতে বলেন, “আমরা এই কর্মীদের প্রোফাইল দেখব। প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় কি না দেখা হবে, তারপর সহায়ক হিসেবে কাজে লাগানো হবে।”
কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, “আপনারা এমন লোকেদেরও নোটিস পাঠিয়েছেন, যাঁদের ৫–৬টি সন্তান রয়েছে। ৫০ হলে ঠিক আছে। তখন নোটিস পাঠানো যেতেই পারে। কিন্তু আপনারা যে সফটঅয়্যার টুল ব্যবহার করছেন, তা অত্যন্ত কঠোর।”
বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, “বাস্তবে সফটঅয়্যার ব্যবহার করে আপনারা ব্যাপক ভাবে নোটিস পাঠিয়েছেন। আপনারা বলছেন, ৫০ বছরের ব্যবধান মানে দাদু-নাতির সম্পর্ক। কিন্তু বাস্তবে তো বিয়ে হয় প্রায় ২০ বছর বয়সেও। এই সব বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে আপনাদের কাজ মিলছে না। কারণ, এই ভাবেই সফটওয়্যার কাজ করেছে।”
প্রধান বিচারপতি কান্ত বলেন, “যদি রাজ্যের দেওয়া এই অফিসারেরা আগামিকাল যোগ দিতে পারেন, তবে তাঁদেরও নথি দেখতে দিন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও সুবিধা হবে।” বিচারপতি বাগচী কমিশনের উদ্দেশে বলেন, “নোটিস মূলত ‘ম্যাপ্ড’ ভোটারদের জন্য। আপনারা যে সফটঅয়্যার টুল ব্যবহার করছেন, তাতে নামের সামান্য পার্থক্যের জন্য ডেকে পাঠানো হচ্ছে। বাংলা পরিবারে ‘কুমার’ প্রায়ই মধ্যনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদি ‘কুমার’ বাদ পড়ে, নোটিস পাঠাচ্ছেন।”
কমিশনের আইনজীবী বলেন, “মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের অন্তত ১০ দিনের প্রশিক্ষণ দরকার। আমরা সেই প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আর ১৪ লক্ষ শুনানি বাকি রয়েছে।”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দিওয়ান এজলাসে বলেন, “নামের বানান গরমিলের উদ্দেশ্য হল ভোটার বাদ দেওয়া।”
প্রধান বিচারপতি বলেন, “মাইক্রো অবজ়ার্ভারের কাজ ইআরও এবং এইআরও-কে সাহায্য করা। যদি রাজ্যের অফিসাররা যোগ দেন, তাঁরাও মতামত দিতে পারবেন। তাতে ইআরও-র সিদ্ধান্ত আরও মজবুত হবে।”
রাজ্য সরকারের আইনজীবী সিঙ্ঘভি বলেন, “কমিশন কখনওই আমাদের কাছে গ্রুপ-বি অফিসার চায়নি।” অন্য দিকে কমিশনের আইনজীবীর বক্তব্য, “আমাদের ৩০০ জন গ্রুপ-বি অফিসার দরকার ছিল। আমরা পেয়েছি মাত্র ৮০ জন। বাকি সবাই গ্রুপ-সি ও বিভিন্ন শ্রেণির।”
প্রধান বিচারপতি কান্ত বলেন, “যে কোনও নির্দেশের প্রয়োজন হলে আমরা দেব। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনও বাধা আমরা বরদাস্ত করব না। এই বিষয়টি সব রাজ্যকে স্পষ্ট ভাবে বুঝে নিতে হবে।”
সুপ্রিম কোর্টে কমিশন জানায়, “আমরা পাঁচটি চিঠি দিয়েছিলাম। যেখানে স্পষ্ট করে বলা ছিল কোন ধরনের অফিসারদেরই আমাদের প্রয়োজন। কিন্তু সেই অনুযায়ী কর্মী আমাদের দেওয়া হয়নি।”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, “এই ৮৫০০ অফিসাররা কি আগামিকালের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইআরও-দের কাছে রিপোর্ট করতে পারবেন?” এইআরও-রা রাজ্য সরকারের আধিকারিক কি না, তা-ও জানতে চান তিনি। কমিশন তাতে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ। তাঁদের পদমর্যাদা মাইক্রো অবজারভারদের থেকেও নীচে।” এইআরও-রা গ্রুপ এ না গ্রুপ সি আধিকারিক, তা জানতে চান বিচারপতি বাগচী। উত্তরে সিঙ্ঘভি বূলেন, “২৯৪ জন ইআরও স্তরের অফিসার গ্রুপ-এ অফিসার।”
আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভির সওয়াল, “পিএসইউ থেকে নেওয়া কর্মীদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কোনও সম্পর্ক নেই। অথচ তাঁদের মাইক্রো অবজার্ভার হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে।” তবে এতে অসুবিধার কিছু নেই বলেই মনে করছেন প্রধান বিচারপতি। তবে সিঙ্ঘভি বলেন, “তাঁরা অনেকেই গ্রুপ ডি কর্মী, কাস্টমার অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে কর্মরত। তাঁদের দিয়ে এই কাজ কী ভাবে সঠিক ভাবে করা যেতে পারে? তাঁদের নামের তালিকা দেখুন। আর রাজ্য গ্রুপ বি অফিসার দিচ্ছে।”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবীর সওয়াল, “আমাদের কাছে নামের তালিকা রয়েছে। সব গ্রুপ বি অফিসার দেওয়া হয়েছে।” তখন প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, “সেই তালিকা কমিশনের কাছে দিয়েছিলেন কি?” তাতে আইনজীবী দিওয়ান জানান, প্রত্যেকের নাম-সহ জানাতে সময় প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, “তার মানে আপনাদের কাছে নামের তালিকা এখনও সম্পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত নেই। ওই কর্মীরা কী ভাবে ডিইও-র কাছে রিপোর্ট করবেন?”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী জানান, জেলাভিত্তিক বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। তবে কমিশনের আইনজীবী জানান, সেই তথ্য তাঁদের হাতে পৌঁছোয়নি। প্রধান বিচারপতি এ অবস্থায় বলেন, “এই বিষয়ে বিতর্ক চাই না। নামের তালিকা নিয়ে আমাদের মুখ্যসচিবকে ডেকে পাঠাতে হবে।”