মোদীকে এ বার সরাসরি চোর বলে আক্রমণ মমতার

বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার তদন্তে নেমে সিবিআই যখন নতুন করে তৃণমূলের একাধিক নেতা-নেত্রীকে নোটিস ধরাতে শুরু করেছে, তখন আর কোনও লক্ষ্মণরেখা মানলেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ ডিসেম্বর ২০১৬ ০৩:০৯
Share:

কোলাঘাটের সভায় মুখ্যমন্ত্রী। বুধবার। ছবি: পার্থপ্রতিম দাস।

বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার তদন্তে নেমে সিবিআই যখন নতুন করে তৃণমূলের একাধিক নেতা-নেত্রীকে নোটিস ধরাতে শুরু করেছে, তখন আর কোনও লক্ষ্মণরেখা মানলেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নোট বাতিলের নেপথ্যে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বুধবার কোলাঘাটে প্রশাসনিক জনসভার মঞ্চ থেকে তিনি বললেন, ‘‘কী ভাবছেন, সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে প্রতিবাদ থামিয়ে দেবেন? যান চ্যালেঞ্জ করলাম, ক্ষমতা থাকলে সকলের বিরুদ্ধে মামলা করুন। জেলে পুরুন! কিন্তু আপনি চুরি করেছেন, এক বার নয়, হাজার বার বলব!’’

Advertisement

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নাম না করলেও মমতার আক্রমণের লক্ষ্য যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সারদা, রোজভ্যালির মতো অর্থলগ্নি সংস্থার দুর্নীতি নিয়ে ২০১৪ সালে তদন্ত শুরু করেছিল সিবিআই। তবে শুরুতে কিছু দিন তৎপরতা দেখানোর পরে গত প্রায় দেড় বছর ধরে কার্যত হাত গুটিয়ে ছিল তারা। ইদানীং সেই ফাইল ফের খুলেছে সিবিআই। রোজভ্যালি-কাণ্ডে মঙ্গলবার তৃণমূলের লোকসভার নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিস ধরিয়েছে তারা। সূত্রের খবর, নোটিস পাঠানো হয়েছে তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায়ের কাছেও। সিবিআইয়ের পাশাপাশি সম্প্রতি আয়কর দফতরের তরফেও তৃণমূলের বেশ কিছু মন্ত্রী ও নেতাকে নোটিস পাঠানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার এ হেন সক্রিয়তার নেপথ্যে বিজেপির প্রতিহিংসার রাজনীতি রয়েছে বলে মঙ্গলবারই এক প্রস্ত সরব হয়েছিলেন মমতা। সেই সুরই আরও চড়িয়ে এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, বাংলায় অস্থির পরিবেশ তৈরি করার জন্য ষড়যন্ত্র করছেন মোদী-অমিত শাহেরা। সম্প্রীতির বাতাবরণ বিগড়ে দিচ্ছেন। ফের নাম না করে তাঁর অভিযোগ, ‘‘এক জন গুন্ডা আর এক জন পাণ্ডা গোটা দেশটাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে!’’ এর পরেই সিবিআই তদন্তের প্রসঙ্গ তোলেন মমতা।

Advertisement

ঘটনাচক্রে, এ দিন সকালেই তামিলনাড়ুর মুখ্যসচিব পি রামমোহন রাওয়ের বাড়িতে হানা দেয় আয়কর দফতর। তাঁর বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালিয়ে নতুন নোটে ৩০ লক্ষ টাকা ও ৫ কেজি সোনা বাজেয়াপ্ত হয়েছে বলে খবর। ওই ঘটনার প্রসঙ্গও টেনে এনে মমতা অভিযোগ করেছেন, এর আগে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবালের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারির অফিসে তল্লাশি চালিয়েছিল আয়কর দফতর। এ বার তামিলনাড়ুতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হল। রাজ্য সরকারকে আগাম না জানিয়ে যে ভাবে এই তল্লাশি চালানো হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী। মোদী সরকারকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমার অফিসারদের এক বার গ্রেফতার করে দেখুক। কত দম আছে দেখব! শুধু ওদের আইন আছে! রাজ্যের আইন নেই?’’

এক জন গুন্ডা আর এক জন পাণ্ডা গোটা দেশটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।... যান চ্যালেঞ্জ করলাম, ক্ষমতা থাকলে সবার বিরুদ্ধে মামলা করুন। জেলে পুরুন। কিন্তু আপনি চুরি করেছেন, এক বার নয় হাজার বার বলব।

Advertisement

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন অনেকে। তৃণমূল নেতাদের একাংশের মতে, মমতা হয়তো আশঙ্কা করছেন, নেতাদের পাশাপাশি এ বার রাজ্যের আমলাদের একাংশের বিরুদ্ধেও তদন্ত-তল্লাশি শুরু করতে পারে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থা। সরকার চালানোর ক্ষেত্রে মমতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমলাদের উপরে আস্থা রাখেন। তাই তদন্তের নামে মোদী-শাহেরা রাজ্য প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারেন, এমন আশঙ্কা করে আগেভাগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখছেন তিনি।

পর্যবেক্ষকদের একাংশ আবার মনে করছেন, দুর্নীতির অভিযোগের চেয়ে প্রতিহিংসার রাজনীতিকে বড় করে দেখানোটাই মমতার কৌশল। তৃণমূল ভবনে আজ, বৃহস্পতিবারই দলের কোর কমিটির বৈঠক রয়েছে। সেখান থেকে মমতা কেন্দ্র-বিরোধী আন্দোলনে আরও কর্মসূচির নির্দেশ দেবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও রাজ্য বিজেপির নেতারাও অভিযোগ করছেন, প্রতিহিংসার তত্ত্ব সামনে এনে মমতা দুর্নীতির অভিযোগকেই আড়াল করতে চাইছেন। তামিলনাড়ুর মুখ্যসচিবের বাড়িতে আয়কর হানার সমালোচনা করায় মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘দেখা যাচ্ছে, যেখানেই কালা ধন, সেখানেই তৃণমূলের সমর্থন!’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘নোট বাতিলে তৃণমূল বাস্তবিকই যে সমস্যা পড়েছে, তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দলে দলে পঞ্চায়েত বা পুরসভার সদস্যদের তৃণমূলের পতাকা হাতে নেওয়া প্রায় বন্ধ রয়েছে ৮ নভেম্বরের পর থেকে!’’

তবে প্রশ্ন থাকছে, সিবিআই তো তদন্ত হাতে নিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। তা হলে কি প্রতিহিংসার অভিযোগ নিয়ে সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে পাল্টা আদালতে যাবে তৃণমূল? দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের উত্তর, ‘‘এর জবাব এই মুহূর্তে দেব না!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement