এখনও ‘সচল’ নয় বহু মান্ডি, তৎপর প্রশাসন

চাষিরা যাতে ন্যায্য দাম ও বাজার পান,  সে জন্য নেওয়া হয়েছিল বেশ কিছু সরকারি ব্যবস্থা। সেই কৃষি বিপণনের অবস্থা কী

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৪:১৩
Share:

আগাছায় ঢাকা বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের কৃষক বাজার। ছবি: শুভ্র মিত্র

সাদা-নীল বাড়িগুলো কাজে লাগার কথা ছিল চাষিদের। সেখানে নিয়মিত বসার কথা ছিল বাজার। এমন একটা জায়গা, যেখানে বিক্রেতা-ক্রেতার মাঝে কেউ নেই। কিন্তু রাজ্যের কোথাও সেগুলোতে থাকে কাঠের আসবাব, প্লাইউডের জিনিস। অনেকগুলো আবার বিলকুল শুনশান। বহু কোটি টাকা ব্যয়ে গড়া কিসান মান্ডিগুলোর একটা বড় অংশ কার্যত চাষিদের কাজে আসছে না বুঝে নানা ভাবে সেগুলোকে সচল করতে চাইছে প্রশাসন। তবে চাষিরা বলছেন, ‘‘গোড়ায় গলদ। যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা— দু’পক্ষই সহজে যেতে পারেন, তেমন জায়গায় মান্ডি বানালে, এমন হত না।’’

Advertisement

হুগলির পুরশুড়া কৃষক বাজারে চাষিদের আনাগোনা নেই। সেখানে বিক্রি হয় কাঠের আসবাব, প্লাইউডের জিনিস। দীর্ঘদিন পড়ে ছিল বৈদ্যবাটীর কিসান মান্ডি। লকডাউনে দূরত্ব-বিধি মানা হচ্ছে না, এই যুক্তিতে শেওড়াফুলির আনাজ হাট সেখানে সরায়, তা চলছে। একই কারণে হাওড়ায় পাঁচটি কিসান মান্ডির মধ্যে চালু একটি (বাগনান), বাকি চারটি ফাঁকা। ছবিটা উজ্জ্বল নয় দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর দিনাজপুর বা নদিয়ায়।

বীরভূমে ১৯টি ব্লকের মধ্যে ১৩টিতে মান্ডি রয়েছে। অধিকাংশ মান্ডিতে দোকান ভাড়া দেওয়া হলেও এখনও সেগুলি চালু হয়নি। উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গার রেগুলেটেড মার্কেট কমিটির তৈরি কিসান মান্ডিটি (চিত্ত বসু বাজার) উত্তর ২৪ পরগনার অন্যতম প্রধান বাজার। তৃণমূলের আমলে সামান্য সময়ের জন্য তা চালু হলেও এখন কার্যত বন্ধ রয়েছে।

Advertisement

পশ্চিম মেদিনীপুরে ১১টির মধ্যে চার, পূর্ব মেদিনীপুরে সাতটির মধ্যে চার আর ঝাড়গ্রামে চারটির মধ্যে চালু রয়েছে দু’টি কিসান মান্ডি। বাঁকুড়ায় ন’টির মধ্যে পুরোদমে সচল একটি। সবেধন নীলমণির সচল থাকার কারণ, বছর দু’য়েক আগে শহরের রাস্তা দখলমুক্ত করতে হকারদের সেখানে পুনর্বাসন দেওয়া হয়। শিলিগুড়ি মহকুমায় দু’টি মান্ডি রয়েছে। তাতে নামমাত্র বাজার বসে। জলপাইগুড়িতে ছ’টির মধ্যে দু’টি, মালদহে ন’টির মধ্যে পাঁচটি মান্ডি চালু।

সমস্যাটা কোথায়?

Advertisement

পূর্ব মেদিনীপুরের মাইশোরার চাষি বিশ্বজিৎ মাজি বলেন, ‘‘বাড়ি থেকে পাঁশকুড়া কিসান মান্ডির দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। আর পাঁশকুড়া স্টেশন বাজারের দূরত্ব ১১ কিলোমিটার। মান্ডিটি একেবারে ফাঁকা জায়গায়, স্টেশন থেকে দূরে হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আসেন না। মান্ডির সম্পূর্ণ পরিকাঠামোও গড়ে ওঠেনি। বাধ্য হয়ে পাঁশকুড়া স্টেশন এলাকার পাইকারি আনাজ বাজারে আনাজ বেচতে যাই।’’ একই সুর পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের আশরাফুল হক কিংবা মেমারির সাধন ঘোষের গলায়, যাঁরা বলেছেন, ‘‘গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মান্ডি। ভ্যানে করে আনাজ নিয়ে যেতে যেতে নষ্ট হয়ে যাবে। তার চেয়ে কাছের বাজারে আনাজ বেচা ঢের সহজ।’’

সেই সূত্রেই সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অমিয় পাত্রের অভিযোগ, “পরিকল্পনাহীন ভাবে মান্ডি তৈরি করার খেসারত দিতে হচ্ছে।” বাঁকুড়ার বিজেপি সাংসদ সুভাষ সরকারের মন্তব্য, “যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই এমন জায়গায় কোটি-কোটি টাকা খরচ করে কিসান মান্ডি বানালেও সেগুলিকে চালু করা গেল না। জনতার করের টাকা নষ্ট হল।”

অথচ, ঠিকঠাক জায়গায় মান্ডি হলে যে সব পক্ষই লাভবান হতে পারে, তার উদাহরণ— সিঙ্গুর। তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমি-আন্দোলনের ক্ষেত্র সিঙ্গুরে ২০১৪-র ফেব্রুয়ারিতে কিসান মান্ডি চালু হয়। বাজারটি সিঙ্গুরের রতনপুরে বৈদ্যবাটী-তারকেশ্বর রোডের ধারে। ধারেকাছে কামারকুণ্ডু এবং সিঙ্গুর স্টেশন। ঢিল ছোড়া দূরত্বে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে। কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে দিল্লি রোড এবং জিটি রোড। সড়ক ও রেল যোগাযোগ ভাল হওয়ায় সহজেই কলকাতা-সহ অন্য জায়গায় পৌঁছনো যায়। আশপাশের চাষিরা সেখানে ফসল নিয়ে আসেন। তাঁরা জানান, রাজ্য সরকার সুফল বাংলার আনাজ এখান থেকে কেনে। ব্যবসায়ীরাও আসেন আনাজ কিনতে।

এই পরিস্থিতিতে নড়েচড়ে বসেছে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন। মুর্শিদাবাদে ২১টি মান্ডির পড়ে থাকা অংশে কৃষি বিপণন ও পার্ক গড়তে উদ্যোগী হয়েছে জেলা। কৃষি-পণ্য, উদ্যানপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো ১১৬টি প্রকল্প তৈরির প্রস্তাব রাজ্যে পাঠানো হয়েছে। পূর্ব বর্ধমানের গলসি ১ ব্লকের কিসান মান্ডিকে ‘মডেল’ করে কৃষিভিত্তিক শিল্প-তালুক গড়ার দিকে এগোতে চাইছে জেলা। বাঁকুড়ায় কিসানমান্ডিগুলিকে আংশিক ও সম্পূর্ণ— দু’ভাবেই ‘লিজ’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, হিমঘর, রাইসমিল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সংক্রান্ত কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করতে শিল্পোদ্যোগীদের বলা হয়েছে।

‘অচল’ মান্ডি কি এতে ‘সচল’ হবে? রাজ্যের কৃষিবিপণনমন্ত্রী তপন দাশগুপ্ত বলেন, “মান্ডিগুলিকে আকর্ষণীয় করতে অন্য দফতরের সঙ্গে একত্রে পরিষেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। আমরা আশাবাদী।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement