—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
রেলকে ঘিরেই গোড়াপত্তন মিশ্র সংস্কৃতির এই শহরের। এক সময়ে এখানে রাজনীতির নিয়ন্ত্রক ছিল মাফিয়ারা। তাদের ‘ট্রিগারে’ ত্রস্ত ছিল শহরবাসী। বছর দশেক আগেও তৃণমূল-মাফিয়া যোগের অভিযোগ তুলে প্রথম এই বিধানসভায় জিতেছিলেন বিজেপির দিলীপ ঘোষ।
২০১৯ সালে দিলীপ সাংসদ হওয়ার পরে উপ-নির্বাচনে জিতে প্রথম খড়্গপুর শহরে ঘাসফুল ফোটাল তৎকালীন পুরপ্রধান প্রদীপ সরকার। এ বার এখানে ভোট-যুদ্ধে মুখোমুখি সেই দিলীপ-প্রদীপ। শহর ঘুরে প্রদীপ শোনাচ্ছেন ‘উন্নয়নের পাঁচালি’। আর চা-চক্রে দিলীপের মুখে ফিরছে তৃণমূল-মাফিয়া-পুলিশের আঁতাত-তত্ত্ব।
খড়্গপুর সদর (শহর) বিধানসভা অর্থাৎ নিজের পছন্দের আসনেই এ বার প্রার্থী হয়েছেন বঙ্গ বিজেপির অন্যতম মুখ দিলীপ। তাঁকে ‘যাযাবর’ খোঁচা দিয়ে তৃণমূল প্রার্থী করেছে ‘ঘরের ছেলে’ প্রাক্তন পুরপ্রধান তথা প্রাক্তন বিধায়ক প্রদীপকে। যদিও বিধায়ক হওয়ার পরে খড়্গপুরই দিলীপের ‘খাসতালুক’ হয়ে ওঠে। দিলীপ প্রার্থী হওয়ায় এই কেন্দ্রে ২০২১ সালে প্রদীপকে হারানো বিজেপির হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে সরতে হয়েছে।
এই আবহে মানুষের দুয়ারে তৃণমূল প্রার্থী পৌঁছচ্ছেন রেলের অনুন্নয়ন ও নিজেদের উন্নয়নের খাতা নিয়ে। প্রায় প্রতিটি কর্মিসভায় প্রদীপকে বলতে শোনা যাচ্ছে, “দিলীপ ঘোষ বিধায়ক ও সাংসদ থাকাকালীন আট বছরে যদি ভাল কাজ করেই থাকেন তাহলে ২০২৪ সালে দিলীপ ঘোষকে অন্যত্র সরিয়েছিল কেন? আবার এ বার হিরণকে সরিয়ে দিলীপ ঘোষকে প্রার্থী করল কেন? আসলে এরা যাযাবর। আমি পুরপ্রধান ও দেড় বছর বিধায়ক থাকাকালীন কী করেছি তা আপনাদের সামনে রয়েছে। তাই আপনারা ঠিক করুন যাযাবর না ঘরের ছেলের পাশে থাকবেন।”
পাল্টা প্রদীপকে ‘স্পিডব্রেকার’ তকমা দিয়ে দিলীপ পুরসভার ব্যর্থতা তুলে সরব হচ্ছেন সেই মাফিয়া-তৃণমূল যোগ নিয়ে। পুলিশের আইসিকে হুঁশিয়ারি দেওয়া দিলীপ ঘোষ এক চা-চক্রে বলেছেন, “তৃণমূলের যিনি প্রার্থী, তিনি ছিলেন স্পিডব্রেকার পুরপ্রধান। ওঁর একটাই কাজ ছিল দিলীপ ঘোষের উন্নয়নের কাজ আটকে দেওয়া। এই তৃণমূল নেতারা মাফিয়াদের চামচাগিরি করে জিতেছে। এখনও মাফিয়া সাথে নিয়ে চলছে। এই ডাকাতদের আগামী দিনেও এমন হিসাব করব যে হিসাব মেলাতে পারবে না।”
হিসাব অবশ্য বলছে, গত কয়েক বছরে শহরে বিজেপির ‘লিড’ কমেছে। ২০১৬ সালে ৬,৩০৯টি ভোটের ‘লিড’ পেয়েছিল বিজেপি। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান কমে হয় ৩,৭৭১। আবার ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে খড়্গপুর সদরে প্রায় ৪৫ হাজার ‘লিড’ থাকলেও ২০২৪-এ তা কমে এসেছে ২১ হাজারে। এই অঙ্কে অতীতে বাম-কংগ্রেস জোটে ভোট ভাগাভাগিও জড়িয়ে। ২০১৬ সালে জোট প্রায় ৫৫ হাজার ভোট পেয়েছিল। সে বার পরাজিত কংগ্রেসের ১০ বারের বিধায়ক ‘চাচা’ জ্ঞানসিংহ সোহন পালের মৃত্যুর পরে ২০২১ সালে জোটের ভোট নামে ১০ হাজারে।
এ বার বাম-কংগ্রেস আলাদা লড়ছে। বিজেপি থেকে আসা পাপিয়া চক্রবর্তীকে প্রার্থী করায় কংগ্রেসের শহর কার্যালয় ভাঙচুর করেছেন নেতা-কর্মীরা। ফলেস ‘বিক্ষুব্ধ’ কংগ্রেসের ভোট কোন দিকে যাবে, জল্পনা চলছে। সিপিএম প্রার্থী করেছে প্রায় চার দশকের দলীয় সদস্য মধুসূদন রায়কে। তিনি তৃণমূল-বিজেপি দু’দলের বিরুদ্ধেই শিল্পদূষণ, কালো জল, নিকাশি, দুর্নীতি, অনুন্নয়ন নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। পরিস্থিতির চাপে শিল্পদূষণ নিয়ে সরব প্রদীপ-দিলীপও।
তবে, এই আসনে বরাবর নির্ণায়ক, প্রায় ৩৪ শতাংশ তেলুগু ভোট। তৃণমূল তাই স্মরণ করাচ্ছে, তেলুগুদের ভাষাকে রাজ্যে স্বীকৃতি, রেলবস্তিতে পুরসভার মাধ্যমে উন্নয়ন থেকে রেলের উচ্ছেদ প্রতিরোধের কথা। বিজেপির কাছে ‘কিছুই নেই’ বোঝাতে তেলুগু ভোটারদের সামনে গিয়ে তৃণমূল প্রার্থী বলছেন, “এমি লেদু!” ভোট ভাঙছে ধর্মের ভিত্তিতেও। তৃণমূল ইদের পাশাপাশি রামনবমীতেও পথে ছিল। প্রদীপ-দিলীপ দু’জনেই আখড়ার শোভাযাত্রায় লাঠি ঘুরিয়েছেন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে