শূন্য এ বুকে ফিরে আয়

হস্তিনীর দেহ আটকাল সঙ্গীরা, হাহাকার শাবকের

বৃহস্পতিবার সকালে গড়বেতার মাগুরাশোল জঙ্গলের পাশে শসা খেতে উদ্ধার হয় এক পূর্ণবয়স্ক হস্তিনীর দেহ।

Advertisement

রূপশঙ্কর ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ৩১ অগস্ট ২০১৯ ০০:৩৫
Share:

মাগুরাশোলের জঙ্গলে সাথীহারা হাতির দল। নিজস্ব চিত্র

মায়ের শোকে আকুল সন্তান। স্বজনহারার হাহাকার সঙ্গীদেরও। হাতির দলের সেই অব্যক্ত যন্ত্রণারই সাক্ষী রইল গড়বেতার জঙ্গল। শোক-সন্তাপ-হাহাকারে বন্দি হয়ে থাকতে হল বনকর্তা-কর্মীদেরও।

Advertisement

বৃহস্পতিবার সকালে গড়বেতার মাগুরাশোল জঙ্গলের পাশে শসা খেতে উদ্ধার হয় এক পূর্ণবয়স্ক হস্তিনীর দেহ। দিনভর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে বিকেল নাগাদ ক্রেনে দেহ তুলে ট্রাক্টরে চাপিয়ে ময়না তদন্ত ও শেষকৃত্যের জন্য ৪ কিলোমিটার দূরে বন দফতরের পাতরিশোল বিট অফিসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। মাগুরাশোলের গভীর জঙ্গলের মাঝে মোরাম রাস্তা ধরে ৬০ নম্বর জাতীয় সড়কে উঠে দ্রুত পৌঁছতে তড়িঘড়িই যাচ্ছিলেন বনকর্তারা। কিন্তু জঙ্গলের মাঝে হঠাৎই বিকট চিৎকার করে পথ আটকে দাঁড়ায় ৩-৪টি দাঁতাল। ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে বন দফতরের রূপনারায়ণ বিভাগের ডিএফও অসিতাভ চট্টোপাধ্যায়ের গাড়ি। থেমে যায় অন্য বনকর্তাদের গাড়িও। হাতির দলের চিৎকারে তখন কান পাতা দায়।

মাগুরাশোলের জঙ্গলেই সম্প্রতি ঘাঁটি গেড়েছে দলমার ৫০-৫৫ টি হাতির বড় দল। মৃত হস্তিনী এই দলের সদস্য ছিল। তার মৃত্যুতে সাথীহারা কয়েকটি হাতিই পথ আটকায়। বন দফতরের আমলাগোড়া রেঞ্জের অফিসার বাবলু মান্ডি বলেন, ‘‘হাতির দল কিছুটা দূর থেকে শুঁড় নাড়িয়ে চিৎকার করছিল। যে ট্রাক্টরে হস্তিনীর দেহ ছিল তার কাছাকাছি গিয়ে চিৎকার করে আবার পিছিয়ে যাচ্ছিল।।’’

Advertisement

দাঁতালরা যাতে জঙ্গলে ঢুকে যায় সে জন্য বন দফতরের গাড়িগুলি থেকে হুটার, সাইরেন বাজানো হয়। চিৎকার করে, হাততালি দিয়ে, মুখে নানা শব্দ করেও বনকর্মী ও হুলাপার্টির কয়েকজন তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু দাঁতালরা ছিল নাছোড়। হস্তিনীর দেহ নিয়ে জঙ্গলরাস্তা ছেড়ে বনকর্তাদের গাড়িগুলি ৬০ নম্বর জাতীয় সড়কে উঠতেই ফের রাস্তা আটকায় কয়েকটি হাতি। জাতীয় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেখানেও বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকতে হয় বন দফতরের কর্মী ও আধিকারিকদের। শেষে হাতিগুলি জঙ্গলে ঢুকে গেলে কনভয় রওনা দেয়।

ডিএফও রূপনারায়ণ অসিতাভ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘হস্তিনীর দেহ নিয়ে আসার সময় মাগুরাশোলের জঙ্গলে আমাদের পথ আটকায় ৩-৪ টি হাতি। দীর্ঘক্ষণ চিৎকার করে গাড়ির হুটার, সাইরেন বাজানোর পর ওরা জঙ্গলে ঢুকে যায়। আমরা তখন তড়িঘড়ি চলে আসি।’’ রাতেই পাতরিশোল বিটে হস্তিনীর ময়নাতদন্ত শেষে শেষকৃত্য করা হয়।

বন দফতর ও স্থানীয় সূত্রে খবর, মাগুরাশোলে শসা খেতের পাশে যেখানে হস্তিনীর দেহ পড়েছিল, রাতে সেখানে এসে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গিয়েছে ওই হস্তিনীর শাবককেও। এসে পৌঁছয় কয়েকটি হাতিও। ঘন্টা দুয়েক তারা সেখানে ছিল, চিৎকারও করছিল। গভীর রাতেও আরও একবার ওই জায়গায় এসে চিৎকার করতে থাকে কয়েকটি দাঁতাল।

এমন ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মাগুরাশোল গ্রামের বাসিন্দারা। বিশ্বনাথ হেমব্রম, সজল কিস্কুরা বলছিলেন, ‘‘মেয়ে হাতিটি মারা যাওয়ায় আমরা বুঝতে পেরেছিলাম জঙ্গল থেকে বাকি হাতিগুলি একবার ঘটনাস্থলে আসতে পারে।’’ বন দফতরের এক আধিকারিকেরও বক্তব্য, ‘‘হাতিরা অনুভূতিপ্রবণ। দলের সঙ্গীর মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি বাকি সদস্যরা। মৃত হস্তিনীর শাবকটিও মা হারানোর শোকে অস্থির হয়ে উঠেছে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement