পরিজনদের মধ্যমণি খগেন মণ্ডল। নিজস্ব চিত্র।
চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে আগেই। ছেলে খগেনের খোঁজে আত্মীয়দের বাড়ি, থানা, হাসপাতাল— সর্বত্র ছুটে দিয়েছেন বসন্ত মণ্ডল। কেউ আশার আলো দেখাতে পারেননি। খগেনকে ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন বাকি পরিজনেরাও। পাক্কা আট বছর পর মঙ্গলবার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে খুঁজে পেলেন বসন্তবাবু।
২০০৮ সালে দিদির বাড়ি যাচ্ছি বলে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সন্দেশখালি থানার গেলিয়াখালি গ্রামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বছর বত্রিশের যুবক খগেন। সম্বল বলতে ছিল ১০ টাকা। তারপরে আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। অনেক জায়গায় খোঁজ করেও সন্ধান না মেলায় পুলিশে ছেলের নিখোঁজ ডায়েরি করেন বসন্তবাবু। আইন অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার সাত বছর পরেও কোনও ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া না গেলে তাঁকে মৃত বলে ধরা হয়। তাই খগেনের ফেরার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল তাঁর পরিজনেরা। মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা থেকে খগেনের সন্ধান মেলে। ভাইকে ফিরে পেয়ে আর চোখের জল আটকাতে পারছিলেন না বড়দা পঙ্কজবাবু। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ধরে নিয়েছিলাম ভাই আর বেঁচে নেই। ওঁকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু ভাইকে ফের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব ভেবে খুব ভাল লাগছে।’’
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, পেশায় চাষি বসন্তবাবুর তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। খগেন মেজ ছেলে। বসন্তবাবুর তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বড় ছেলে পঙ্কজ ও ছোট ছেলে তরুণ দু’জনেই স্কুল শিক্ষক। খগেনের পরিবার সূত্রে দাবি, দীর্ঘদিন কোনও কাজ না পাওয়ায় অবসাদে ভুগছিলেন খগেনবাবু। ২০০৮ সালে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যায় তাঁর। ওই বছরই দিদির বাড়ি যাব বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছিলেন খগেনবাবু। দিন পাঁচেক আগে ডেবরার ডুঁয়ার কিসমতডুঁয়া গ্রামে ললিত দাসের বাড়ির মন্দিরে রামনবমীর অনুষ্ঠানে কোনওভাবে চলে আসেন তিনি। অনুষ্ঠান শেষেও তিনি মন্দির চত্বরেই বসেছিলেন। ললিতবাবু তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি কিছু বলতে পারেননি। তা দেখে ললিতবাবু তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। ললিতবাবু জানান, ‘‘সোমবার কথা বলার মাঝেই তাঁর স্ত্রীকে খগেন বাড়ির ঠিকানা জানায়। এরপরেই তাঁরা ওই ঠিকানা নিয়ে ডেবরা থানায় যোগাযোগ করেন।’’
ডেবরা থানা থেকে সন্দেশখালি থানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সন্দেশখালি থানা থেকে খগেনের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়। ভাইয়ের খোঁজ পেয়ে মঙ্গলবার সকাল হতেই ডেবরা চলে যান খগেনের বাবা, বড়দা ও দিদি। খগেনকে চিনতে অবশ্য অসুবিধা হয়নি কারও। ভাইকে দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দিদি রানি মণ্ডল। এ দিনই খগেনকে বাড়ি নিয়ে যান পরিজনেরা।
এত দিন কোথায় ছিলেন? সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু না বললেও খগেনবাবু জানান, এতদিন তিনি মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতেন। কোনওদিন খাবার জুটত আবার কোনওদিন না খেয়েই থাকতে হত। তিনি বলেন, ‘‘ঠাকুমাকে (ললিত দাসের স্ত্রী) বাড়ির কথা জানাই।’’ এ বিষয়ে বাসন্তীদেবী বলেন, ‘‘ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলত, বাড়ি যাবে। পরে ওঁর থেকে বাড়ির ঠিকানা জানতে পেরে পুলিশকে জানাই।’’ খগেনেরও মায়ের নাম বাসন্তী মণ্ডল। স্থানীয়দের অনেকের ধারণা, বাসন্তী দাসের নাম শুনে হয়তো খগেনবাবুর মায়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। তা থেকেই তাঁর স্মৃতি ফিরে এসে থাকতে পারে।
এ নিয়ে মেদিনীপুরের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অরিত্র মজুমদার বলেন, “ঘটনার কথা শুনে মনে হচ্ছে খগেন সম্ভবত ‘ডিসোশিয়েটিভ ফিউজ’ রোগে আক্রান্ত। এই রোগে কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হতে পারে, লোপ পেতে পারে স্মৃতিও।’’ অরিত্রবাবু বলছেন, ‘‘মানসিক চাপ থেকে এই রোগের উপসর্গ আরও প্রকট হয়। আবার চাপ কিছুটা কেটে গেলে কোনও ব্যক্তির স্মৃতি ফিরেও আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে ওই রোগীর নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন।”