সরকারি নির্দেশ মেনে গরমে পড়ুয়াদের রেহাই দিতে সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে পঠনপাঠন বন্ধ রয়েছে। এমনকী সারা বছর যে সব সরকারি স্কুলগুলি প্রাতঃবিভাগে হয় সেগুলিতেই পঠনপাঠন বন্ধ। কিন্তু ছুটি পায়নি লালগড়ের তিলাবনি হাইস্কুলের পড়ুয়ারা। রোজ সকালে ক্লাস হচ্ছে সরকারি অনুদান প্রাপ্ত (গর্ভমেন্ট স্পনসর্ড) এই স্কুলে। মঙ্গলবার থেকে সব ক’টি ক্লাসের প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ণের পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ।
তৃণমূল প্রভাবিত স্কুল পরিচালন কমিটির এমন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত কেন? জানা গেল, জঙ্গলমহলে ভোটের জন্য মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে দিন দশেক স্কুলভবনে কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল। গত ৪ ও ১১ এপ্রিল দু’দফায় স্কুলের শিক্ষকরা ভোটের ডিউটি করতে অন্যত্র গিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে ২১ দিন স্কুলে পঠনপাঠন বন্ধ ছিল। সেই কারণে পড়ুয়া-অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষ আলোচনার ভিত্তিতে কেবলমাত্র প্রাতঃবিভাগে স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
লালগড় ব্লকের বেলাটিকরি অঞ্চলের তিলাবনি হাইস্কুলটিতে (উচ্চমাধ্যমিক) পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। মোট ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১,২০০। স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রদীপকুমার মণ্ডল অবশ্য স্কুল খোলা রাখার ব্যাপারে দোষের কিছু দেখছেন না। তাঁর কথায়, “গ্রামাঞ্চলের পড়ুয়াদের সবার কোচিং সেন্টারে বা গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ার ক্ষমতা নেই। সেক্ষেত্রে সিংহভাগ পড়ুয়ার কাছে স্কুলই ভরসা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করতে না পারলে ওদের সমস্যা হবে। তাই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”
স্কুল সূত্রের খবর, জানুয়ারির গোড়ায় নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়া চলার জন্য ১২ জানুয়ারি নাগাদ পুরোদস্তুর ক্লাস শুরু হয়। তারপরই পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এলাকার মূলবাসীদের মকর পরব ছিল। ১৯ জানুয়ারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের চাঁদিপুরে শিক্ষামূলক ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতেও সরস্বতী পুজো উপলক্ষে দিন তিনেক পঠনপাঠন হয়নি। এরপর ভোটের জন্য স্কুলভবনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের থাকার ব্যবস্থা হয়। গত ২৬ মার্চ স্কুলে ঢোকে বাহিনী। জঙ্গলমহলে ৪ এপ্রিল ভোট মেটার পরে বাহিনী স্কুল ছেড়ে যায়। এর মধ্যে ৯ এপ্রিল গরমের জন্য সরকারি ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলের ক্লাস বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশিকা জারি করে শিক্ষা দফতর। প্রধান শিক্ষক প্রদীপবাবু জানালেন, পড়ুয়াদের প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন এপ্রিলের গোড়ায় নেওয়ার কথা। অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে দ্বিতীয় পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন এবং নভেম্বরের শেষ নাগাদ তৃতীয় পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন নেওয়ার কথা। রবিবার ও ছুটির দিন বাদে শিক্ষাবর্ষের ২১টি দিন পঠনপাঠন না হওয়ায় পিছিয়ে গিয়েছে পড়ুয়ারা। প্রদীপবাবুর কথায়, “মে মাসের মাঝামাঝি গরমের ছুটি পড়ে যাবে। তাই ছাত্রছাত্রীদের ডেকে মতামত জানতে চেয়েছিলাম। সবাই পরীক্ষা দিতে রাজি হয়। ওদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে সকাল সাতটা থেকে পরীক্ষা নেওয়ার সময় ধার্য করা হয়েছে।”
পঞ্চম শ্রেণির সুদীপ সিংহ, অষ্টম শ্রেণির স্বাতী মাহাতো, বৃষ্টি বেজ, নবম শ্রেণির মানিক মাহালি, গীতা মাহাতো, দশম শ্রেণির অসিতবরণ দাসের কথায়, “অনেক গুলো দিন ক্লাস হয়নি। সকালে স্কুল হওয়ায় স্যারেদের কাছে পড়াশুনো দেখিয়ে নিচ্ছি। পরীক্ষাও দিচ্ছি।” স্কুলের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সেক্রেট্যারি তথা জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক তড়িত্ গোস্বামী বলেন, “ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থেই সর্বসম্মত ভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” স্কুল পরিচালন কমিটির সদস্য অশোক প্রতিহার বলেন, “স্কুলে কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল। আরও নানা কারণে টানা ক্লাস বন্ধ ছিল। ফলে, স্কুল বন্ধ রাখলে ছাত্রছাত্রীদেরই আরও সমস্যা বাড়ত। স্কুল ছুটি হয়ে যাচ্ছে সকাল ৯টার মধ্যেই। ”
কিন্তু গরমে স্কুল ছুটি দেওয়া তো শুধু ছুটি নয়, এর পিছনে রয়েছে কিছু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ও। ঝাড়গ্রাম জেলা হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ পুলকরঞ্জন মাহাতো বলেন, ‘‘ সকাল ১০টা থেকে রোদের শিশুদের জন্য ভাল নয়। লু লেগে ওদের শরীর অসুস্থ হতে পারে। তবে যদি কোনও স্কুল ৯টার মধ্যে ছুটি হয়ে যায়, তবে সমস্যা নাও হতে পারে।’’
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ শ্যাম পাত্র বলেন, “স্থানীয় কোনও পরিস্থিতির জন্য হয়তো স্কুল কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা নিচ্ছেন। সরকারি নির্দেশ সত্ত্বেও কেন ওই স্কুলে পড়ুয়াদের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে সেটা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।”