যোগ শিক্ষা দিয়েই ইচ্ছাপূরণ পারমিতার

ছোট থেকেই যোগাসন তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। নিজের সাধনাকে অন্যের মধ্যেও ছড়িতে দিতে ২০০২ সালে স্কুলে পড়ার সময় ঝাড়গ্রামের স্টেশনপাড়া চৌধুরী কলোনি এলাকায় বাড়িতে পারমিতা জানা সামন্ত গড়ে তোলেন একটি যোগ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

Advertisement

কিংশুক গুপ্ত

শেষ আপডেট: ১০ অগস্ট ২০১৫ ০০:৫৪
Share:

ছেলে কোলে নিয়ে ছাত্রীদের নির্দেশ দিচ্ছেন পারমিতা। দেবরাজ ঘোষের তোলা ছবি।

ছোট থেকেই যোগাসন তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। নিজের সাধনাকে অন্যের মধ্যেও ছড়িতে দিতে ২০০২ সালে স্কুলে পড়ার সময় ঝাড়গ্রামের স্টেশনপাড়া চৌধুরী কলোনি এলাকায় বাড়িতে পারমিতা জানা সামন্ত গড়ে তোলেন একটি যোগ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বিয়ের পরও নিছক গৃহবধূর পরিচয়ে আটকে থাকেননি এই ‘দ্রোণাচার্য’। তমলুকের শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে তিনি নিয়মিত ছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেন। এ বার জাতীয় স্তরের যোগাসন প্রতিযোগিতায় জঙ্গলমহলের যে ১২ জন সফল হয়েছেন, তাঁদের সকলেরই হাতেখড়ি পারমিতার বাড়ির ছাদের ‘তরুণ অ্যাথলেটিক যোগাকেন্দ্রে’।

Advertisement

ছোটবেলায় ঝাড়গ্রামের জাগ্রত সঙ্ঘ জিমন্যাসিয়ামে যোগাভ্যাস শুরু করেন পারমিতা। ক্রমে যোগাসনে দক্ষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু কোনও দিন বড় মাপের কোনও প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়ার সুযোগ পাননি। পারমিতার কথায়, “২০০২ সালে তখন একাদশ শ্রেণিতে পড়ি। একেবারেই নিজের খেয়ালে এলাকার জনা চারেক খুদে স্কুল পড়ুয়াদের যোগাসন শেখাতে শুরু করলাম। সেই শুরু। তারপর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েও যোগাসন শেখানোটা বন্ধ করিনি। এখন ৪২ জনকে শেখাই। কিন্তু এটা আমার পেশা নয়। বলতে পারেন এটাই আমার ভাল থাকার চাবিকাঠি।”

শিক্ষার্থীদের ভালবাসার নামমাত্র দানেই চলছে ঝাড়গ্রামে পারমিতার বাপের বাড়ির ছাদে গড়ে ওঠা এই যোগাকেন্দ্র। বৃষ্টি হলে প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন চলে এক তলার বৈঠক খানায়। গত ১৩ বছরে পারমিতার ছাত্রছাত্রীরা জেলা ও রাজ্যস্তরের নানা প্রতিযোগিতায় সফল হয়েছেন। কিন্তু এ বারই প্রথম জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় ১২ জন যোগ দিয়ে সকলেই ভাল ফল করেছেন।

Advertisement

এ বার ছত্তীসগঢ় স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে ভিলাইয়ে গত ২৪-২৬ জুলাই ‘সেকেন্ড ন্যাশনাল যোগা স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৫’-এর আয়োজন করা হয়। ‘যোগা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন, ওয়েস্ট বেঙ্গল’-এর সম্পাদক শরত্‌কুমার দাস বলেন, “আমাদের সংস্থার মাধ্যমে রাজ্যের ৫৫ জন প্রতিযোগী ওই জাতীয় প্রতিযোগিতার বিভিন্ন বিভাগে যোগ দেন। জঙ্গলমহল থেকে পারমিতার ১২ জন শিক্ষার্থী যোগয়েছিলেন। সকলেই সফল হয়েছেন।”

অনুর্ধ্ব-১১ বালিকা বিভাগে দলগত ভাবে প্রথম হয়েছে স্কুল পড়ুয়া অলিভিয়া ভৌমিক, অস্মিতা দাস, অঙ্কিতা দাস, স্নেহা মণ্ডল। অনুর্ধ্ব-১১ বালক বিভাগে দলগত ভাবে দ্বিতীয় হয়েছে অভ্রদীপ গুহ ও আকাশদীপ গুহ। অনুর্ধ্ব-১৪ বালিকা বিভাগে দলগত প্রথম হয়েছে রাইমা ধর। অনুর্ধ্ব-১৪ বালিকা বিভাগে একক ভাবে দ্বিতীয় সুনীতা রায়চক্রবর্তী, তৃতীয় হয়েছে মুসকান কুমারী ঠাকুর ও পঞ্চম হয়েছে অনু বর্মা। এছাড়া ১৮ উর্ধ্ব পুরুষ ও মহিলা বিভাগে পঞ্চম হয়েছেন কলেজ পড়ুয়া রাজু সোনকার ও নীলম শর্মা।

স্কুল পড়ুয়া অভ্রদীপ, অলিভিয়া, অঙ্কিতাদের কথায়, “পারমিতাদির জন্যই আমরা সফল হয়েছি। দিদি আমাদের শিখিয়েছেন, সুস্থ থাকার জন্য যোগাসন কতটা জরুরি। পড়াশোনার চাপ কমাতে যোগাসনের যে জুড়ি নেই, সেটা অন্যদেরও বোঝাই।” বিয়ের পর এখন পারমিতাকে মাঝে-মধ্যে তমলুকের হোগলা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে যেতে হয়। কিন্তু ছাদের অনুশীলন বন্ধ থাকে না। পারমিতার বড়দি নিবেদিতা জানার তত্ত্বাবধানে কলেজ পড়ুয়া নীলম শর্মা ও রেণু সোনকার-রা নিয়ম করে সবাইকে নিয়ে যোগাভ্যাস করেন।

পারমিতার বাবা একটি বেসরকারি সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী। মা গৃহবধূ। ২০১৩ সালে পারমিতার বিয়ে হয় তমলুকের হোগলা গ্রামের বাসিন্দা রাজীব সামন্তের সঙ্গে। রাজীববাবুর কথায়, “আমি চাই পারমিতা নিজের স্বপ্নকে নিয়ে এগিয়ে চলুক। স্ত্রী-র স্বপ্নপূরণে আমি সব সময়ই পাশে রয়েছি।”

গত বছর নভেম্বরে পারমিতার একটি ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। আট মাসের ছেলে পরাগকে কোলে নিয়েই এখন যোগাসনের প্রশিক্ষণ দেন পারমিতা। দ্রোণাচার্যের কথায়, “পরাগ জন্মানোর আগের দিন পর্যন্ত নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। এখন পরাগকে কোলে নিয়েই প্রশিক্ষণ দিই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement