দু’টুকরো হয়ে লড়ছে বহরমপুর

বছর ভর মিলমিশেই কাটে। এ পাড়ার ছেলে দিব্যি ও পাড়ায় আড্ডা মারে।

Advertisement

অনল আবেদিন

শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০১৬ ০১:০২
Share:

বছর ভর মিলমিশেই কাটে। এ পাড়ার ছেলে দিব্যি ও পাড়ায় আড্ডা মারে।

Advertisement

ও পাড়ার মেয়ে এ পাড়ায় এসে চুটিয়ে প্রেম করে যায়। কোনও অশন্তি নেই। যত রেষারেষি দুর্গাপুজোয়। কী যে হয়! সারা বছর গলায় গলায় বন্ধুত্ব, কিন্তু পুজো এলেই ‘বিবাদ’— প্রতিমা, মণ্ডপ, আলো আর অবশ্যই ভিড়ের তারতম্য নিয়ে। বহরমপুর শহরটা এ ভাবেই আড়াআড়ি দু’টুকরো হয়ে আছে উত্তর-দক্ষিণে।

৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক বরাবর উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ হয়ে যাওয়া বহরমপুরে উত্তরের লোয়ার কাদাইয়ের সঙ্গে দক্ষিণের হরিদাসমাটির লড়াই তো রীতিমতো শহরের হট টক।

Advertisement

প্রতিমার উচ্চতা কত? লোয়ার কাদাই-এর জবাব, ‘‘সরকারি নিয়ম মেনে বিশ্বের সব থেকে বড় দুর্গা’’ হরিদাসমাটি ঐক্যতান সঙ্ঘের পাল্টা চিমটি, ‘‘আমাদের প্রতিমার হাইট কি তার চেয়েও বেশি!’’

মেঘ ছুঁয়েছে কে? পুজোর ক’টা দিন উত্তর-দক্ষিণে দু’টুকরো হয়ে এ বার সে লড়াইয়ে নেমেছে বহরমপুর।

Advertisement

দক্ষিণের অভ্যূদয় সঙ্ঘ অতীত দিয়ে নয়, তাঁরা অত্যাধুনিক ডিজনিল্যান্ড দিয়ে দর্শকের মন ভরাতে চায়। অভ্যূদয় সঙ্ঘের বক্তব্য, ‘‘বড় বড় ভাবনার ভিড়ে ছোটদের জন্য ভাবনাটাই হারিয়ে যায়। তাই এ বার আমাদের থিম আমেরিকার ডিজনিল্যান্ড।’’ কাশিমবাজার ভাটপাড়া মিলনী ক্লাবের মণ্ডপ এ বার প্রয়াত মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর গৌরবময় ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজপ্রাসাদ। এই রাজবাড়িতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে প্রথম বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন হয়। এই রাজবাড়িতেই মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্রদের পুজোর সময় ডেকে নিয়ে এসে পাত পেড়ে খাইয়ে তাঁদের প্রণামী দিয়ে হস্টেলে ফেরত পাঠাতেন। ভাটপাড়া পুজো কমিটির কথা, ‘‘অতীতকে বর্তমানের চোখের সামনে তুলে ধরতে রাজবাড়ি-সহ নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ও নীল বিদ্রোহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।’’

দক্ষিণের রানিপুকুর শ্রীসঙ্ঘের পুজো এ বার কেবল পুকুরের জল থেকে ডাঙাতেই তুলে আনা হয়নি, আরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। থিম করা হয়েছে সরকারি প্রকল্প ‘নির্মল বাংলা’, ‘সহজপাঠ’ এ ‘মিডডে মিল’। সরকারি প্রকল্পের প্রচারে দক্ষিণ ব্যস্ত থাকলেও উত্তরের বহরমপুর সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি কিন্তু সরকারি অনাদরে প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়া পটচিত্র, কাঠের পুতুল, কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি মুখোশের মতো লোকশিল্পকে হাতিয়ার করেছে। এই সব রেষারেষিতে নেই এ বার দক্ষিণের নবারুণ সমিতি।

থাকার কথাও নয়। নবারুণ সমিতি মানেই কাল্টুদা, অর্থাৎ বহরমপুর টাউন কংগ্রেস সভাপতি অতীশ সিংহ। পুজোর মুখে দলবদলের জেরে বহরমপুর পুরসভা ও জেলাপরিষদ কংগ্রেসের হাতছাড়া। তাই রাজনৈতিক অস্ত্র খুইয়ে এ বার নবারুণ সমিতির দুর্গা নিরস্ত্র। প্রতিপক্ষ উত্তর ‘তৃণমূলগন্ধী’ ভৈরবতলা দুর্গাপুজো কমিটির মণ্ডপে দেবী ছয় ছয়টি অসুর বধ করেছেন।

উত্তর-দক্ষিণের মধ্যেই লড়াই সীমাবদ্ধ নেই। উত্তরে নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। মৈত্রী সঙ্ঘ, বাবুলবোনা ইয়ংস কর্ণার, বিষ্ণুপুর বালার্ক সঙ্ঘ, বিষ্ণুপুর অনামি ক্লাব ও বিষ্ণুপুর আমার ক’জনের অবস্থান স্বল্পদৈর্ঘের মিসাইল-স্কাডের আওতার মধ্যে। ফলে তারা দর্শক টানার যুদ্ধে পরস্পরকে টেক্কা দিতে বরাবরের মতো এ বারও ‘বিগ বাজেট’-এর পুজোর আয়োজন করেছে। তবে শহরের সবার আতঙ্ক ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’- এর আক্রমনের মতো পশ্চিম দিক থেকে ধেয়ে আসা আয়েসবাগের ‘দেড় কোটি’ টাকা বাজেটের সোমনাথ মন্দিরের দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র ঘিরে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement