মেনু তৈরি।
শহরের ডাকসাইটে ক্যাটারারকে তলব করে ঘণ্টা খানেক এ’টার সঙ্গে ও’টা মিলিয়ে, তালিকায় কচি পাঁঠার সঙ্গে জাফরানি পোলাও, ভেটকি পাতুরির সঙ্গে মাঝারি চিংড়ি এমনকী ছোট পিসি আর ধর্মমায়ের কথা মাথায় রেখে পাঁচ মিশেলি একটা শুক্তোও জায়গা করে নিয়েছিল মেনুতে।
বায়না শেষে দাঁতের কোণে দেশলাইয়ের কাঠি গুঁজে ক্যাটারারের ছেলেটি জানিয়ে গিয়েছিল ‘‘যা খাওয়াচ্ছেন কাকু, পান’টা না হয় আমার তরফ থেকে...।’’ হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন, ‘‘কী যে বল ভাই, এক মাত্র মেয়ের বিয়ে দিচ্ছি।’’
গোল বাধাল সেই অমোঘ মঙ্গল রাত। নোটের গুঁতোয় দিন দুয়েকের মধ্যেই ক্যাটারার জানিয়ে দিয়েছিল, ‘‘পাঁঠা উধাও কাকু!’’
অথচ হাজার বিশেক বায়না করে বসে আছেন যে, অতএব ফের বৈঠক। এবং সাত দিনে উনত্রিশ বার ব্যাঙ্কে গিয়ে যে টাকা বগলদাবা করতে পারা গিয়েছিল তাতে পাঁঠা কোথায়, ব্রয়লার মিলবে কিনা তার উপরেই পড়ে গিয়েছে প্রশ্ন চিহ্ন।
বিস্তুর দর এবং নোটের হিসেব কষে পাঁঠার বদলে তাই পাতে উড়ে এসেছে পোলট্রির ব্রয়লার। ভেটকির জায়গায় মাঝারি রুই। পান’টা যে ফ্রি বলেছিলে ভাই? উত্তর এল, ‘‘এই বাজারে আবার পান চাইছেন, কী বলছেন কাকু!’’ কৃষ্ণনগরের কাঁঠালপোঁতার রতন বিশ্বাসের বিয়ে বাড়িতে এখন ভাঙা হাটের সানাই।
ক্যাটারার জানিয়ে দিয়েছে, ‘‘নোটের গুঁতোয় পাঁঠার মাংসের যা দর হাঁকছে কাকু ভাবতে পারবেন না। তার উপরে বড় নোট কোথায় যে মাল কিনব! তার চেয়ে চলুন সমঝোতা করে মুরগিতেই নেমে আসি, লোকটা আমার চেনা, ধারে মাল দেবে।’’
বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা খালবোয়ালিয়ার জয়ন্ত মজুমদারের মেনুতেও শেষতক সেই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকেই যেতে হয়েছে। নিজে থেকেই সব ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। এক কুইন্টাল খাসির মাংসের অর্ডারও দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। আগাম গিয়েছিল দশ হাজার। কিন্তু, চল্লিশ কেজি পাঠার দাম মিটোতে গেলে বড় নোট ছাড়া চলবে কী করে?
রাত জেগে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা জোগার করেছেন জয়ন্ত, তাতে পাঠা নয়, আপাতত তাঁর পাতেই ফড় ফড় করে উড়ে এসেছে সেই রুগ্ন মুরগির ঠ্যাং।
মেনুতে ছাঁটাই পর্বে নাম লিখিয়ে পড়শি মুর্শিদাবাদেও কোথাও ক্ষীর চমচমের বদলে নিতান্ত সাদামাটা রসগোল্লা কিংবা হবিবি চাঁপের বদলে চুপচাপ জায়গা করে নিয়েছে রামপাখির ঝোল।
হ্যালোজেনের বদলে টুনি, ফুলের গেটের বদলে বেলুন-বাহার!
রুদ্রনাথ পাল বলছেন, ‘‘ছেলের বিয়েটা একটু ঢেলে করব ভেবেছিলাম, টাকাই তুলতে পারলাম না। তাই ফুল থেকে বেলুনে নামতে হল ভাই।’’
কৃষ্ণনগরের এলিট ক্যাটারারের মালিক অরুণ চক্রবর্তী। বলছেন, ‘‘হাওড়ার মাছ বাজারও তো গড়ের মাঠ। নোট নেই তো মাছও নেই। লোককে কী খাওয়াব বলুন তো!’’ বহরমপুরের রানা সরকারও তার ক্যাটারিং ব্যবসার এমন মন্দা বাজারে বলছেন, ‘‘বায়নার টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছি ভাই, এ ভাবে মুখ পোড়াতে পারব না। আমার তো একটা ইজ্জত আছে।’’
কোনও ক্যাটারার আবার জানাচ্ছে, অনেকেই আপাতত নমো নমো করে আত্মীয় স্বজনের পরিধিতেই বিয়ের অনুষ্ঠানটা সারছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভোজ পর্ব হবেখন।
মাজদিয়ার ঘুগরোগাছির সুখেন বিশ্বাস পড়েছেন মহা ফাপড়ে। মেয়ের বিয়ে বলে আগে থেকেই লাখ খানেক টাকা বাড়িতে মজুত রেখেছিলেন। সেই টাকা নিয়ে এখন এক বার ব্যাঙ্কে এক বার পরিচিতদের দোরে দোরে ঘুরছেন। কেউ যদি বদলে দেয়। তবে, বিয়ের ক্ষেত্রে দুই বাড়ি মিলিয়ে আড়াই লক্ষ টাকা তোলা যাবে শুনে একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়ছেন যেন।
কিন্তু জমানো লাখ খানেকের কী হবে? চোখের সামনে অজস্র সর্ষে ফুল, সুখেন অর্ডার দিলেন, ‘‘এক কাপ চা হবে নাকি গো!’’
উত্তর ফিরে এল, ‘‘বাড়িতে তেরো টাকা পড়ে, তিন দিন চিনি আসেনি, খেয়াল আছে!’’