বিপ্লব চক্রবর্তী
কান্দির ছায়া পড়ল লালবাগে। কংগ্রেসের দখলে থাকা মুর্শিদাবাদ পুরসভার চেয়ারম্যান বিপ্লব চক্রবর্তীর মোবাইল-এ দফায় দফায় উড়ে এল হুমকি ফোন— কখনও অপহরণের হুঁশিয়ারি দিয়ে, কখনও বা সরাসরি খুনের ফতোয়া ঝুলিয়ে। দাবি পুরপ্রধানের পদ ছাড়তে হবে তাঁকে।
সন্ত্রস্ত বিপ্লব বিকেলেই বিষয়টি জানিয়েছেন মুর্শিদাবাদ জেলার পুলিশ সুপার সি সুধাকরকে। এ দিন বিকেলে বিপ্লব বলেন, ‘‘হুমকি ফোনের নম্বরও পুলিশকে দিয়েছি। পুলিশের কাছে নিরাপত্তাও চেয়েছি। জানি না শাসক দলের পুলিশ তা দেবে কিনা!’’
কংগ্রেসের দাবি, তলবিসভার ভোটে জিতে কান্দি দখলের রাস্তা মসৃণ করতেই দেবজ্যোতি রায় নামে কান্দির ওই কাউন্সিলরকে অপহরণ করেছিল শাসক দল। সে ঘটনার পরে সপ্তাহ কাটেনি, এ বার লালবাগের পুরপ্রধানকে পদত্যাগের হুমকি দিয়ে একই ভাবে ওই পুরসভা দখল নিতে চাইছে তৃণমূল বলে দাবি কংগ্রেসের।
অপহৃত হওয়ার আগের দিন কান্দি মহকুমাশাসকের সঙ্গে দেখা করে কান্দি পুরসবার নির্দল কাউন্সিলর দেবজ্যোতি তাঁর নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছিলেন। পুলিশ কিংবা প্রশাসন, সে ব্যাপারে কর্ণপাতই করেনি বলে দাবি। পরের দিনই স্কুল থেকে ‘তুলে’ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে।
এ বার বিপ্লবের ভাগ্য়েও কী একই ঘটনা ঘটতে চলেছে? বিপ্লব নিজেও সে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন— ‘‘অপহরণ ও খুন করার হুমকি ফোন আসছে। যা ভাষা যা সব ফতোয়া তাতে ওরা যে তৃণমূলের, সন্দেহ নেই।’’
তবে লালবাগের পুরপ্রধানের অভিযোগ পেয়ে মুর্শিদাবাদ পুলিশ সুপার বলছেন, ‘‘অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তও চলছে। পুরপ্রধানের কাছে জানতে চেয়েছি, কে ফোন করতে পারে ওঁর কাউকে সন্দেহ হচ্ছে কিনা।’’
এ দিন শুধু বিপ্লব নয়, দুষ্কৃতীরা এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছে, পদত্যাগ না করলে তাঁর গোটা পরিবারকেই ‘উড়িয়ে’ দেওয়া হবে। বিপ্লব বলেন, ‘‘পুর-প্রধানের পদ না ছাড়লে আমাকে সপরিবারে খুন করা হবে বলে যে হুমকি ফোন এসেছে, তা যে তৃণমূল থেকে সন্দেহ নেই।’’
কি ভাবে তিনি নিশ্চিত হলেন? পুরপ্রধান বলেন, ‘‘বৃহস্পতিবার দুপুরে পুরসভায় আমার কার্যালয়ে বসে আছি। আমার টেবিলের উল্টো দিকে আরও কয়েকজন বসে আছেন। এমন সময় অচেনা নম্বর (৯১৫৩৪৭৪৬৫৯) থেকে একটা ফোন এল। ব্যস্ত থাকায় প্রথমবার ফোনটি ধরিনি। দ্বিতীয় বার, ফের ফোন এল। ঘন ঘন ফোন আসায় ভাবলাম জরুরি ফোন। এ বার ফোনটা ধরলাম।’’
ফোন ধরেই তাঁর আক্কেল গুড়ুম! ও-প্রান্ত থেকে ভেসে আসে, ‘আর কত দিন এই চেয়ারে বসে থাকবি? এ বার চেয়ার ছাড়!’ পুরপ্রধান পাল্টা জানান, সাহস থাকলে সামনে এসে বলুক। জবাবে ভেসে এসেছিল— ‘‘সিসিটিভি লাগিয়েছিস যে। নইলে সামনে গিয়েই বলতাম। আমাদের তো চিনিস! কান্দির ব্যাপারটা দেখলি তো। এ বার লালবাগেরটা দেখ।’’
বিপ্লববাবুর দাবি, সঙ্গে তারা জুড়ে দিয়েছিল চেয়ার না ছাড়লে কেবল অপহরণ নয়, ‘তোর ফ্যামিলি সমেত উড়িয়ে দেব।’ সপরিবারে
খুন করার ওই হুমকি ফোন আর আশ্রাব্য গালমন্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে ওই হুমকি ফোনের বিষয়ে মুর্শিদাবাবাদ থানার আই সি-কে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি। ওই হুমকি তৃণমূল ছাড়া আর কারও নয়।’’
তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অবশ্য অস্বীকর করেছেন তৃণমূলের মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি মান্নান হোসেন। তিনি বলেন, ‘‘মোবাইলে যখন ফোন এসেছে বলছে, তখন তো নম্বর পেয়েই গিয়েছে। সেই লোককে তাহলে খুঁজে বের করাটা খুবই সহজ কাজ। আসলে বাজার গরম করার জন্য এই সব নাটক চলছে।’’
মুর্শিদাবাদ পুরসভায় কংগ্রেসই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৮ জনের মধ্যে মাত্র ২ জন কাউন্সিলর তৃণমূলের। মান্নানের ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যাখ্যা, ‘‘মুর্শিদাবাদ জেলার কংগ্রেসের অনেক পুরপ্রধান কলকাতায় গিয়ে পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করে তৃণমূলে যোগ দেবেন বলে এসেছেন। আর এখন নাটক করছেন।’’
মুর্শিদাবাদে এসে অপহরণ ও খুনের হুমকির মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন।’’
যা শুনে জেলা কংগ্রেসের মুখপাত্র অশোক দাস পাল্টা বলেন, ‘‘পুরভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে ধুলিয়ান ও কান্দিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারে কাছেও ছিল না তৃণমূল। তবু অসৎ পথে, সমাজবিরোধীদের সাহায্যে ধুলিয়ান পুরসভা দখল নিয়েছে। সেই নোংরা রাজনীতিই ফের কেলতে চাইছে তারা।’’