শাকির আলি এবং অপরূপা পোদ্দার। —ফাইল চিত্র।
হুগলির রিষড়ায় তিন বছরের পুরনো রামনবমী-হিংসার ঘটনায় ধৃত তৃণমূল কাউন্সিলর স্বামী শাকির আলিকে দু’দিনের জন্য হেফাজতে চেয়ে আদালতে আবেদন করল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। সেই সঙ্গে বিচারবিভাগীয় হেফাজত হলেও জেলে গিয়ে জেরায় আপত্তি নেই বলে আদালতে বুধবার জানিয়েছে এনআইএ। তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ অপরূপা পোদ্দারের স্বামী শাকিরকে ২০২৩ সালের ওই মামলায় বুধবার এনআইএ গ্রেফতার করেছিল।
২০২৩ সালের ২ এপ্রিল রামনবমীতে অশান্তির ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ অপরূপার স্বামী কাউন্সিলর শাকিরের। তিন বছর পর মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ অপরূপাদের রিষড়ার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে গাঁধী সড়কের পাশের বাড়িতে চার ভ্যান সিআরপিএফ নিয়ে হাজির হন এনআইএর আধিকারিকেরা। কিছু ক্ষণ পরেই জানা যায়, এনআইএ গ্রেফতার করেছে প্রাক্তন সাংসদের কাউন্সিলর স্বামীকে। এর পরে সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। কিছু ক্ষণ পরে ধৃত শাকিরকে নিয়ে বেরিয়ে যান তদন্তকারীরা। বুধবার শাকিরকে রামনবমী মামলার ‘মূল চক্রান্তকারী’ বলে আদালতে দাবি করেছে এনআইএ। কেন্দ্রীয় সংস্থার আইনজীবী বলেন, ‘‘ওঁর স্ত্রী সেই সময় সাংসদ ছিলেন। উনি কাউন্সিলর। এলাকায় প্রভাব রয়েছে। ঘটনায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।’’
এনআইএ আদালতে জানিয়েছে, শাকিরের বাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের ৩৬টি কার্তুজ পাওয়া গিয়েছে। সেগুলি কোনও একটি আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য নয়। পরীক্ষার জন্য ফরেনসিকে পাঠানো হবে। এনআইএর আইনজীবীর কাছে বিচারক জানতে চান, ২০২৩ সালে মামলা শুরু হয়েছে এখন কেন হেফাজতে প্রয়োজন? এনআইএর আইনজীবী বলেন, ‘‘শাকিরকে আগে গ্রেফতার করা যায়নি। তা ছাড়া উনি তদন্তে সহযোগিতা করছেন না। এখনকার সরকারের কাছ থেকে ১০০ শতাংশ সাপোর্ট পাচ্ছি আগে এ রকম কাউকে গ্রেফতার করা স্বপ্নের মতো ছিল।’’
এর পরে শাকিরের হেফাজত কেন প্রয়োজন বিচারক জানতে চান মামলার তদন্তকারী আধিকারিকের (আইও)-র কাছে। আইও জানান, পুলিশ যা বাজেয়াপ্ত করার করেছে। তা ছাড়াও রাস্তায় ঘুরে তিনি নিজে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছিলেন। তাতে দেখা গিয়েছে, সব গাড়ি ভাঙা হলেও একটি গাড়িতে হামলা করেনি অশান্তিতে জড়িত দুষ্কৃতীরা! সাদা রঙের সেই গাড়িটি শাকির ব্যবহার করতেন। এ ছাড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, অশান্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এর পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অভিযুক্তদের কয়েক জনের ১৬৪ ধারায় বয়ান নথিভুক্ত করে এনআইএ। তদন্তকারী সংস্থার আইনজীবী আদালতকে জানান, তাতে স্বীকারোক্তি মিলেছে যে রামনবমীর আগে একটি ভোজসভার নাম করে স্থানীয় কমিউনিটি হলের করে কেয়ারটেকারের কাছ থেকে চাবি নিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে বৈঠক করে ইট এবং বোমার বন্দোবস্ত করা হয়। শাহরুখ বলে এক ব্যক্তিকে শাকির বোমা জোগাড়ের দায়িত্ব দেন বলে আদালতে জানান এনআইএর আইনজীবী। অন্য দিকে, শাকিলের আইনজীবী জানান, এনআইএর আইনজীবী দুই ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঝামেলা বললেও তিনি তা বলতে নারাজ বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘কেস তিন বছর হয়ে গিয়েছে। ওঁরা একটা গাড়ি নিয়ে পড়ে আছেন। এত সাক্ষী- প্রমাণ থাকলে আগে কেন গ্রেফতার করলেন না। মূলচক্রীকে এত দিন পর মনে পড়ল। আমি (শাকির) কাউকে মারধর করেছি এমন প্রমাণ আছে? আমি শান্তিরক্ষা করতে গিয়েছিলাম।’’
রিষড়ায় অশান্তির মামলার তদন্তে এনআইএর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শাকিরের আইনজীবী বলেন, ‘‘যাঁরা মিছিল করে আসছিলেন, তাঁদের ষড়যন্ত্র খুঁজে পেলেন না। যাঁরা শান্তিরক্ষা করতে গেলেন, তাঁদের ষড়যন্ত্র পেয়ে গেলেন। আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি করা যায়। কিন্তু গুলি বিক্রি করা যায় না। আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি এবং গুলি যে আমার কাছে আছে সেই নথিও দেখানো হয়েছে। ঘটনার দিন গুলি চালানোরও অভিযোগ নেই। কিছু দিন পর ওই গুলি আমি দাবি করব। সরকার পরিবর্তন হয়েছে বলেই গ্রেফতার হয়ে যাব, এটা হয় না। কেসের প্রয়োজনে গ্রেফতার হয়।’’ শাকিরের জামিনের আবেদন করে তিনি বলেন, ‘‘প্রয়োজনে প্রতি দিন তদন্তকারী অফিসারের সঙ্গে দেখা করব। আগেও যত বার ডাকা হয়েছে, গিয়েছি।’’ শাকির গুরুতর অসুস্থ এবং তাঁর শারীরিক পরীক্ষা চলছে বলেও আইনজীবীর দাবি।