—প্রতীকী চিত্র।
বছর কয়েক আগের কথা। বর্ষাকালে একটি রেলব্রিজ ভেঙে দেশের অন্য অংশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল উত্তরবঙ্গ। বেহাল সড়কপথে ক্ষীণ যোগাযোগ টিকে ছিল। বাগডোগরা বিমানবন্দর হয়ে উঠেছিল একমাত্র বিকল্প। মাঝে কয়েকবছর কেটে গিয়েছে। দ্বিতীয় লাইন-সহ রেলপথের বৈদ্যুতিকিকরণ হয়েছে। সড়কপথও অনেকটা উন্নত। ফোর-লেনের মসৃণ পথে দ্রুত ছুটছে গাড়ি। বিভিন্ন জায়গায় যানজট এড়ানো গিয়েছে। বহু জায়গায় নদীর উপরে দ্বিতীয় সেতু তৈরি হয়েছে। ফলে, রেলপথে যেমন ছুটছে বন্দে ভারতের মতো দ্রুত গতির ট্রেন, সড়কপথেও দেখা যাচ্ছে দ্রুতগতির আধুনিক বাস।
কিন্তু আজ পর্যন্ত বাগডোগরা ছাড়া উত্তরবঙ্গে, সেই অর্থে, আর কোনও বিমানবন্দর গড়ে ওঠেনি। যদিও তা খুবই জরুরি। সেই কারণেই, ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলটি যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পিছিয়ে রয়েছে। কোচবিহার বা মালদহতে বিমানবন্দর থাকলেও, আমরা জানি সেগুলির অবস্থা কী। কিছুদিন আগেও সপ্তাহে ছ’দিন কোচবিহার থেকে ছোট বিমান চালু ছিল। বর্তমানে বিমান উড়ছে মাত্র এক দিন। অন্যদিকে, মালদহে বিরাট রানওয়ে থাকলেও পরিষেবা নেই। ফলে, দার্জিলিং পাহাড়, সিকিম থেকে শুরু করে সমগ্র ডুয়ার্স, এমনকি নিম্ন অসমের একটি বিরাট অঞ্চলের মানুষকে সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে বাগডোগরার উপরে।
মুশকিল হল, উত্তরবঙ্গের বহু জায়গা থেকে বাগডোগরায় পৌঁছতে সময় লাগে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা। তারপরে বিমানবন্দরেও ঘণ্টা দেড়-দুই অপেক্ষা করতে হয়। গন্তব্যে পৌঁছতে যদি এক ঘণ্টাও লাগে, তবুও মোট সময় লাগছে আট-নয় ঘণ্টা। আর যদি কোনও কারণে বিমানবন্দর বন্ধ থাকে, তবে কী হয়রানি হয় সেটা ভুক্তভোগীরা জানেন। তাই উত্তরের আরও দু’-একটি জায়গায় যদি উড়ানের ব্যবস্থা থাকত, তবে সহজে এই অবস্থা এড়ানো যেত।
উত্তরবঙ্গ থেকে ভারতের নানা প্রান্তে প্রতিদিন কত যাত্রী নানা জায়গায় যান, বাগডোগরা বিমানবন্দর তার প্রমাণ। এ মুহূর্তে প্রতিদিন সেখান থেকে ১২ হাজারেরও বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। বছরের হিসেবে সংখ্যাটি ৩০ লক্ষ। উড়ানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৭৪। এই বিপুল সংখ্যক যাত্রীর অধিকাংশই উত্তরবঙ্গের নানা এলাকার। মজার কথা হল, মুম্বই-চেন্নাই বা তিরুবন্তপুরমের মতো বহু দূরের জায়গা থেকে তাঁরা দুই-আড়াই ঘণ্টায় বাগডোগরায় পৌঁছে যান। কিন্তু সেখান থেকে বাড়ি পৌঁছতে তাঁদের অনেকের সময় লাগে চার-পাঁচ ঘণ্টা কিংবা আরও বেশি। আজ, যদি উত্তরবঙ্গের আরও দুই-একটি জায়গায় চালু বিমানবন্দর থাকত, তবে যাত্রীদের সময় ও খরচ দু’টিই বাঁচত। কোচবিহারের ৭০ কিমি দূরের রূপসী-গৌরীপুর থেকেও প্রতিদিন উড়ান ছিল। অজানা কারণে সেটিও আজ প্রায় ‘নন-ফাংশনাল’। কোচবিহারের মতোই সেই বিমানবন্দরটিও যেন ‘ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দার’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
অন্তত আরও একটি বিমানবন্দর দ্রুত উত্তরবঙ্গে চালু করা হোক। এ ব্যাপারে প্রশাসনের অনিচ্ছা বোধহয় উত্তরবঙ্গবাসীর গা সওয়া হয়েছে। তাই বিমানবন্দর চালু হওয়ার কথা শুনেও, এখন কেউ কর্ণপাত করেন না। কারণ নির্বাচন এলেই শেয়ালের কুমিরছানা দেখানোর মতো বিষয়টিকে গর্ত থেকে টেনে বের করা হয়। আর তারপর—যাহা পূর্বং, তথা পরং হয়ে যায়।
শিক্ষক, কোচবিহার
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে