যাত্রা: মালদহের পারলালপুর ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে মাঝ গঙ্গায় মাছ ধরতে যাওয়ার পথে পার অনন্তপুরের বাহাদুর চৌধুরী, ভরত চৌধুরী, দুর্যোধন মণ্ডলরা। সোমবার। নিজস্ব চিত্র
একসময়ে জমি ছিল, ভিটেও ছিল। জমির ফসল বিক্রি করেই চলত সংসার। এখন সেই জমিও নেই, ভিটেও নেই। ভাঙনে সবই গ্রাস করেছে গঙ্গা। কোনও রকমে অন্যের জমিতে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হয়েছে এখন। আর গঙ্গায় মাছ ধরে টেনেটুনে সংসার চলে। কিছুদিন ধরে গঙ্গায় সেভাবে মাছও মিলছে না। রাতভর নৌকা নিয়ে নদীতে জাল ফেলেও মাছ উঠছে না। এ দিকে রান্নার গ্যাস থেকে আনাজ সবেরই দাম চড়া। এই পরিস্থিতিতে মাথায় হাত পড়েছে মালদহের পার অনন্তপুরের মৎসজীবী বাহাদুর, ভরত, দুর্যোধনদের। কী করে সংসার চলবে, সেই দুশ্চিন্তা চেপে বসেছে মনে।
পাঁচ বছর আগেও বাহাদুর চৌধুরীর টিনের চালের বড় বাড়ি ও প্রায় চার বিঘা আবাদি জমি ছিল পারদেওনাপুর-শোভাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চৌধুরীপাড়ায়। সেই জমির ফসল বিক্রি করে স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভালই চলছিল তাঁর সংসার। কিন্তু চার বছর আগে গঙ্গার ভাঙনে বাহাদুরের ভিটেমাটি ও বাড়ি তো বটেই, পুরো চার বিঘা আবাদি জমিই গঙ্গায় তলিয়ে যায়। ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তিনি পরিবার-সহ আশ্রয় নিয়েছিলেন এই পঞ্চায়েতেরই পার অনন্তপুর গ্রামে। সেখনে অন্যের জমিতে অস্থায়ী আস্তানা করে এখন দিন কাটছে তাঁর। জমি, ভিটেমাটি হারিয়ে সেই থেকে সংসার চালাতে তিনি গঙ্গায় মাছ ধরার পেশা বেছে নিয়েছেন।
একই পরিস্থিতি পার অনন্তপুরে আশ্রয় নেওয়া বাহাদুরের প্রতিবেশী ভরত চৌধুরী, দুর্যোধন মণ্ডলের। নিজেদের জমি ও ভিটেমাটি গঙ্গা ভাঙনে তলিয়ে যাওয়ার পর তাঁরাও অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। আর গঙ্গায় মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। সোমবারও দুপুরে একই নৌকায় গঙ্গায় মাছ ধরতে বেরিয়েছেন বাহাদুর, ভরত, দুর্যোধনরা। তবে তাঁদের আক্ষেপ, গঙ্গায় এখন আগের মতো আর মাছ ধরা পড়ছে না। ফলে সংসার চালানো তাঁদের কাছে কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাহাদুর বললেন, ‘‘আগে এই সময়ে গঙ্গায় নৌকা নিয়ে ঘণ্টা তিনেক ঘুরে জাল ফেললে অন্তত কেজি খানেক পিউলি ধরা পড়ত। এ ছাড়া বাছা, কাজলি, ফ্যাঁসা, ট্যাংরাও মিলত বেশ। কিন্তু কিছুদিন ধরে গঙ্গায় নৌকা নিয়ে প্রায় পাঁচ ঘন্টা ধরে ঘুরে জাল ফেলেও আধ কেজি মাছ হচ্ছে না। চার-পাঁচজন মিলে ওই সামান্য মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে আবার রান্নার গ্যাসের দাম হাজার টাকা পেরিয়ে গেছে। আনাজ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও চড়া।’’
ভরত বলেন, ‘‘গঙ্গায় মাছ কমে গিয়েছে। যে সামান্য পরিমাণ মাছ ধরছি তা বিক্রি করে সংসার চলছে না।’’ কেন গঙ্গায় মাছ কম? এক পরিবেশপ্রেমী বলেন, ‘‘নদী দূষণের পাশাপাশি নেট-জাল দিয়ে মাছ ধরা গঙ্গায় মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।’’