চশমার আড়ালে শিক্ষার্থীর দৃষ্টি অস্থির। সামনে খাতা খোলা, ব্ল্যাক বোর্ড থেকে সে লেখা তুলছে, কিন্তু লেখায় মন নেই। অভিজ্ঞ শিক্ষকের দৃষ্টি এড়ায় না বিষয়টি। তার এমন উদাসীনতা কেন? আদর এবং তিরস্কার কোনও কিছুই তাকে বদলাতে পারে না। এক দিন শিক্ষকের ধোঁয়াশা কাটে অন্য এক অভিভাবকের ফোন পেয়ে। সেই অভিভাবক শিক্ষককে অনুরোধ জানান, ওই অন্যমনস্ক কিশোরের পাশে তাঁর সন্তানকে যেন না বসানো হয়। সে তাঁর সন্তানকে এমন কিছু কথা বলেছে, যা শিক্ষকের সামনে তিনি উচ্চারণ করতে অপারগ।
এ বার শিক্ষকের কাছে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায় বিষয়টি। তিনি সরাসরি অন্যমনস্ক কিশোরের অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই অভিভাবক তখনই কিছু বলতে চাননি। দুই দিন পরে নিজেই ফের যোগাযোগ করে শিক্ষককে জানান, তাঁর ছেলে এখন পড়তে গিয়েছে, সেই সুযোগে তিনি কথা বলছেন। ওই কিশোর অনেক দিন ধরে তীব্র ভাবে মোবাইল ফোনে আসক্ত। তা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে, যে ডাক্তারের সাহায্য নিতে হয়েছে। কিন্তু এখনও সুরাহা হয়নি। ফোন হাতে না দিলে সে ক্রুদ্ধ হয়ে হিংস্র আচরণ করে।
শিক্ষকের মনে একটি প্রশ্ন জাগে। শিক্ষার্থী স্মার্টফোন এ ভাবে যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ পেল কী করে? তাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলেই সে পেয়েছে। সে দেখেছে, পরিবারের অন্যরাও দীর্ঘসময় ধরে মোবাইল ফোনে নিমগ্ন থাকেন। তা হলে তার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা কেন।
যদি আমরা মনে করি, আমাদের সন্তান আমরা যেমন চাই, তেমন আচরণ করবে, তবে আমাদেরও কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আমরা তাকে যেমন যখন-তখন স্মার্টফোন দেখতে নিষেধ করব, নিজেরাও প্রয়োজনের বাইরে ফোন দেখব না। সামাজিক পরিসরে এমনও দেখা যায়, অনুষ্ঠানবাড়িতে মায়েরা গল্প করছেন, তাঁদের সন্তানেরা মায়ের ফোন নিয়ে ‘গেম’-এ বুঁদ হয়ে রয়েছে। পরস্পরের মধ্যে ভাব বিনিময় করছে না। এই ত্রুটি তবে কার?
এ সব আসক্তির ক্ষেত্রে সমাধান একটাই হতে পারে, অভিভাবক সন্তানকে নিয়ে বাইরে কোথাও চলে যান কয়েক দিনের জন্যে। যেখানে যোগাযোগের সামান্য সংযোগ ছাড়া আর কিছু থাকবে না। খোলা চোখে প্রকৃতিকে দেখুক সকলে। একটি ছোট্ট ক্যামেরায় ছবি তোলা হোক। যেমন আমাদের শৈশবে তোলা হত। এ সব সুন্দর স্মৃতি ধরা থাক ছবিতে, অ্যালবামে। সে সব দেখে দেখে মনে মায়া জাগুক।
না, এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি।
শিক্ষিকা, কোচবিহার
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে