নদীতট জুড়ে পড়ে রয়েছে উৎসবের অবশেষ। মালদহে মহানন্দার ছবিটি তুলেছেন মনোজ মুখোপাধ্যায়।
জলের ওপরে ভাসছে শোলার মুকুট, রাংতা। পাড়ের কাদায় গেঁথে রয়েছে মাটির ঘট-প্রদীপ, পেরেক বের হওয়া কাঠের টুকরো। মালদহের মহানন্দা হোক অথবা মাদারিহাটের হলং—উত্তরবঙ্গের সব নদীর পাড়ে কমবেশি দূষণের চিত্র এমনই। পরপর তিন সপ্তাহে বিসর্জন চলেছে নানা নদীতে। দুর্গাপুজোর বিসর্জন চলেছে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। কিছু এলাকায় লক্ষ্মী পুজোর বিসর্জনও হয়েছে। এখনও চলছে কালীপুজোর বিসর্জন। তাতে দূষিত হচ্ছে উত্তরের নানা নদী। কোথায় কেমন পরিস্থিতি তা দেখল আনন্দবাজার।
পাড়ে ডাঁই কাঠামো
মালদহের জেলা সদর ইংরেজবাজার শহরের বেশিরভাগ দুর্গা ও কালীপুজোর বিসর্জন হয় মহানন্দা নদীর মিশন ঘাটে। ইংরেজবাজার শহরে প্রায় ১৩০টি দুর্গা পুজো এবং দু’শোর বেশি কালীপুজো হয়ে থাকে। এ ছাড়া বাড়ির পুজোও রয়েছে। বিসর্জনের বিপুল চাপ নিয়েই বইতে হয় মিশনঘাটের মহানন্দাকে। সোমবার রাতে বেশ কিছু কালী প্রতিমা ওই ঘাটে বিসর্জন হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর থেকেও মিশন ঘাটে বিসর্জন চলছে। দুর্গাপুজোর পরে পুরসভার তরফে দাবি করা হয়েছিল ঘাট পরিষ্কার করা হয়েছে। কালীপুজোতেও বিসর্জন এবং সাফাই এক সঙ্গে চলেছে বলে দাবি। যদিও ঘাটে গেলে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন দৃশ্য। তবে নদীর পাড়ে আবর্জনার স্তূপে ডাঁই হয়ে রয়েছে। মাটির ঘট, কলাগাছ, ঝুড়ি ভর্তি বেলপাতা কী নেই সেখানে? পচা ফুল ছড়িয়ে রয়েছে চতুর্দিকে। অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরেই মিশন ঘাট জুড়ে ওই আবর্জনা ডাঁই হয়ে পড়ে রয়েছে। যদিও, পুর কর্তৃপক্ষের কোনও হেলদোল নেই বলে দাবি। ইংরেজবাজার পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান দুলাল সরকার দাবি করলেন, ‘‘ঘাট সাফাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। ছটপুজোর আগে কাজ শেষ হয়ে যাবে।’’
নদীতে মিশছে বিষ
জঙ্গল ছুঁয়ে তিরতির করে বয়েছে হলং নদী। প্রচুর নদীয়ালি মাছ রয়েছে হলঙে। বেশ কিছু বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিরও। সেই নদীতে প্রতিদিনই এখন বিষ মিশে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। সে কবে দুর্গাপুজোর বিসর্জন হয়েছে, কিন্তু কাঠামো এখনও পড়ে রয়েছে নদীতে। কিছু কাঠামো নদীতে অর্ধেক ডুবে রয়েছে, কিছু কাঠামো গেঁথে পাড়ের কাদায়। প্রতিমার থেকে রং মিশছে শহরে। নদীর একাংশে জলের রং ঘোলা হয়ে গিয়েছে। পরিবেশ কর্মীদের দাবি, যে রাসায়নিক রং প্রতিমায় ব্যবহার করা হয়, তা জলে মিশলে মাছ সহ জলজ উদ্ভিদে ব্যাপক কুপ্রভাব পড়বে। বিশেষত জঙ্গল লাগোয়া নদীতে এমন বিষ মিশলে ক্ষতির আশঙ্কা আরও বেশি। যদিও প্রশ্ন উঠেছে দুর্গাপুজোর পরে এতদিন কেটে গেলেও, কেন নদী থেকে কাঠামো সরানো হল না?
অবাক পর্যটকেরাও
মাদারিহাটের জলদাপাড়া টুরিস্ট লজে ঢোকার মুখে পড়ে হলং নদী। এই নদীতেই মাদারিহাটের প্রায় সব পুজার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। জলদাপাড়া লজে থাকতে আসা বিভিন্ন জায়গার পর্যটকরা এই দৃশ্য দেখে অবাক হচ্ছেন। কলকাতা থেকে জলদাপাড়া লজে থাকতে আসা এক পর্যটক দেবীপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “নদীতে এখনও কাঠামো পড়ে আছে, অথচ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কেন। এই ভাবে পড়ে থাকলে জঙ্গলে নদীর মাছদের ক্ষতি হবে। কলকাতায় এমন ভাবে দূষণ হলে মামলা হয়ে যেত।” মাদারিহাট ঘাট কমিটির সভাপতি জহরলাল সাহা দূষণ ছড়ানোর কথা স্বীকার করে দাবি করেন, ‘‘বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় কাঠামোগুলি সরানো হয়নি। আমি কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে দু’দিনের মধ্যেই সরিয়ে নেব।”
ছড়িয়ে ঘট-প্রদীপ
জলপাইগুড়ি শহরকে দু’ভাগে ভাগ করা করলা নদী নাব্যতা হারিয়েছে দীর্ঘ দিন আগেই। পলি জমে নদীখাত ক্রমশ উঁচু হয়েছে। গত তিন মাসের বিসর্জনে নদীর খাত আরও আরও কিছুটা উঁচু হয়ে গিয়েছে বলে দাবি। নদী থেকে প্রতিমার কাঠামো সরলেও, ঘট-প্রদীপের ভগ্নাংশ ছড়িয়ে রয়েছে কিং সাহেবের ঘাট থেকে বাবুঘাট-মাসকলাইবাড়ি ঘাট পর্যন্ত। বাবুঘাটের দু’তিনটি সিঁড়ি ভেঙে নদীর কাছে পৌঁছতেই পচা গন্ধে গা গুলিয়ে উঠতে পারে। নদীর পাড়ের এক দিকে ফুল-বেলপাতা স্তূপাকৃতিতে জমেছে। নদীর জল লেগে ফুল-বেলপাতায় পচন ধরেছে। সেখান থেকেই গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ তো গেল নদীর পাড়ের কথা। জলের নীচে স্তরে স্তরে জমেছে মাটির ঘট-প্রদীপের ভাঙা অংশ, কলাগাছের অংশ। সমাজপাড়া ঘাটে নদীতে প্রতিমার কাঠামোও পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে মঙ্গলবার। কাঠামোয় মাটির প্রলেপ গলে গিয়েছে, বেরিয়েছে ভিতরের খড়। জলপাইগুড়ি পুরসভার সিপিএম কাউন্সিলার প্রমোদ মণ্ডলের অভিযোগ, ‘‘নদীর দূষণ রোধে পুরসভা শুধু ঘোষণাই করে৷ কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’’ গত সোমবার এবং মঙ্গলবার ছোট পুজো এবং বাড়ির পুজোর প্রতিমা বিসর্জন হয়েছে, এখনও বিগবাজেটের পুজোগুলির বিসর্জন বাকি রয়েছে। রসভার চেয়ারম্যান মোহন বসু সমস্যার কথা মেনে নিয়ে বলেন, ‘‘করলার দূষণ রোধে পুরসভা যথেষ্টই আন্তরিক৷ কিন্তু তা বলে সব সময় ঘাটে পুর কর্মীদের রেখে দেওয়া তো সম্ভব না৷ ছট পুজোর আগেই নদীতে পড়ে থাকা কাঠামো ও ফুল-মালা দ্রুত তুলে নেওয়া হবে।’’
পদক্ষেপ দাবি
নদীতে প্রতিমার কাঠামো, পুজোর ফুল, বেলপাতা পড়ে। শিলিগুড়িতে মহানন্দায় দুর্গাপুজোর বিসর্জনের কয়েকদিন পর ওই দৃশ্য দেখা গিয়েছে। কালী পুজোর বিসর্জনের পরও চটজলদি নদী থেকে কাঠামো তোলা বা আবর্জনা সরানোর হচ্ছে না বলে অভিযোগ। গত মঙ্গলবার এবং বুধবারও মহানন্দা নদী খাতে বিসর্জন দিতে এসে ফেলে যাওয়া পুজোর সমগ্রী পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। শহরের মধ্যে লালমোহন ঘাট ছাড়াও নৌকাঘাটেও বিসর্জন হয়। সেখানেও নদীর মধ্যে পুজোর ফুল, অন্যান্য সামগ্রী পড়ে রয়েছে। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘাট সাফসুতো রাখতে পুরসভার তরফে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ওই ঘাটেও ছট পুজোর আয়োজন হয়। নদী খাত অপরিষ্কার থাকায় তা নিয়ে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারাও। মেয়র অশোক ভট্টাচার্য বর্তমানে দিল্লিতে রয়েছেন। মহানন্দা সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় দুই মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছেন বলে দাবি করলেন। মেযর বলেন, ‘‘দুর্গা পুজোর বিসর্জনের পর প্রতিমার কাঠামো তখনই তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমি বাইরে রয়েছি। নদী সাফাইয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মেয়র পারিষদ দেখছেন।’’ পরিবেশ কর্মীদের দাবি, রাজনীতি নয় দূষণ রুখতে পদক্ষেপ হোক।