গল্পগাঁথা
‘গল্পগাঁথা’ সুদীপ চৌধুরীর ছোটগল্প সংকলন বইটির প্রথম গল্প ‘ক্রাচ’-এ উঠে এসেছে উপলব্ধি কথা, ‘সবটাই তো শূন্য, মেধাবী ছেলে-মেয়ে দুটিকে মানুষ করতে গিয়ে নিজেকে নিঃশেষিত করেছি। তারা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত অথচ আমাকে নির্বাসিত করেছে। পাখি উড়তে শিখলে আগে নিজের নীড়কেই অস্বীকার করে।’ এ ভাবে সুদীপের গল্প ক্রমশ একজন থেকে বহুজনের হয়। লেখক তৈরি করেছেন তাদের অজস্র টানাপড়েন। বিশ্বাস-অবিশ্বাস, স্বপ্ন-স্বপ্নহীনতা এবং সুখ-দুঃখের পাশাপাশি, সমান্তরাল ভাবে তাঁর গল্প বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কথাও বলে। দেখায়, ঝাঁ-চকচকে জীবনের নেপথ্য মলিনতা। বিষয়বিন্যাস এবং স্বচ্ছ ভাষা—দুই-ই সমান দক্ষতায় ব্যবহার করা।
ভাণ্ডানী ডাংধরামা
ভাণ্ডানী পূজা ও উৎসবকে কেন্দ্র করে ‘উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী মাইতি যাওয়া (লুপ্তপ্রায়) সংস্কৃতিচর্চার প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হল মাথাভাঙ্গা মহকুমার প্রেমেরডাঙায়। উদ্বোধক বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মন জানালেন, জলপাইগুড়ি, ডুয়ার্স অঞ্চলে এই পুজোর প্রচলন সবচেয়ে বেশি। কোচবিহারে ভাণ্ডানী পুজোর প্রচলন সার্বিক ভাবে এখনও হয়নি। প্রসঙ্গক্রমে উঠে আসে কোচবিহারের থেতি ফুলবাড়ির ৭৮ বছরের পুরনো ভাণ্ডানী পুজোর কথা। প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে লৌকিক দেবতা ডাংধরামাও-এর পুজো। ডাং অর্থে চিতাবাঘ। এক সময় এলাকায় গোয়ালঘরে চিতাবাঘের হানা ছিল নিত্য দিনের ব্যাপার। মানুষের বিশ্বাস ছিল, এই পুজো না দিলে চিতাবাঘ ছাগল, বাছুর খেয়ে যাবে। লোকায়ত এই সংস্কৃতিগুলি বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।
প্রধান অতিথি জলপাইগুড়ি জেলার সাংসদ বিজয় চন্দ্র বর্মনের কথায়, প্রেমেরডাঙ্গা অঞ্চলটি ছিল লোকসংস্কৃতির পীঠস্তান। অনুষ্ঠিত হত কুশান, ভাওয়াইয়া, বিষহরা, দোতরাডাঙ্গা গানের আসর। চারুচন্দ্র সান্যালের ‘দ্য রাজবংশী’জ অফ নর্থ বেঙ্গল’ উত্তরবঙ্গের দেবদেবী সম্পর্কিত প্রথম পরিচয়সূত্র গ্রন্থ। জানালেন, কুশল গান, বাঁশ খেলা বা মদনকামের গান এখন লুপ্ত হতে বসেছে। তাঁর মতে, তিস্তাবুড়ির পূজা লোকায়ত এই সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়েই কোনও জনজাতির আর্থসামাজিক অবস্থান বোঝা যায়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বেশি করে লোকসংস্কৃতির চর্চা হওয়া দরকার। বর্তমানে লোকসংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্রে সরকারি ভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বক্তা আনন্দগোপাল ঘোষ জানালেন, ভাণ্ডানী মেলার খবর বছর দশেক আগেও এত ব্যাপক ভাবে সংবাদপত্রে উঠে আসেনি। অর্থাৎ ভাণ্ডানী মেলার পুনর্জাগরণ ঘটেছে। উত্তরবঙ্গের উত্তর কেন্দ্রে লক্ষ্মী পূজা কেন্দ্রিক যে মেলা হয় তা কোথাও প্রায় দেখা যায় না। তাঁর মতে, এ সবের আর্থিক সামাজিক প্রয়োজনীয়তা আছে বলেই তা লুপ্ত হয়ে যায়নি। পাশাপাশি সময়ের দাবি মেটাতে না পারার ফলে লোকায়ত আচার সম্পর্কিত
পারফর্মিং আর্টস
অনুষ্ঠানগুলি অনেকটাই লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা যে কোনও অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। বৈরাতী নৃত্য, ভাওয়াইয়া গানের মতো পারফর্মিং আর্টসগুলি প্রসারমান।
আইনজাবী আজুল জলিল আহমেদের কথায়, একসময় প্রতিটি গ্রামে দু’ একটি পুজো হত। যাকে ঘিরে বসত লোকসংস্কৃতির আসর। তাও এখন বিলুপ্তির পথে। আলোচনাসূত্রে জানান, লোকসংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। লোকসংস্কৃতি হারায় না, তার পরিবর্তন ঘটে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকসংস্কৃতি বিষয়ক পঠন-পাঠনের জন্য আলাদা বিভাগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন দক্ষিণ দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলাসমাহর্তা অমলকান্তি রায়। অঞ্চলভেদে দেবী ভাণ্ডানী সম্পর্কে নানা কাহিনি শোনা গেল তাঁর কাছ থেকে।
উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন জনজাতির বাস। এই অঞ্চল লোকসংস্কৃতির ভাণ্ডার, জানালেন তুষারকান্তি চক্রবর্তী। তিনি নমুনা স্বরূপ চর্চিত গলায় মাছ ধরার গান, ছাদ পেটাইয়ের গান, মাঝিদের ভাটিয়ালী গান পরিবেশন করে আলোচনাসভাটিকে চিত্তাকর্ষক করে তোলেন। সভামুখ্য সত্যেন্দ্রনাথ বর্মনের মতে, ভাণ্ডানী পুজোকে কেন্দ্র করে রাজবংশী সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ সম্ভব। তাঁর কথায়, পুজোকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি চর্চায় যে ভাব বিনিময় ঘটে, তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মঞ্চে রমেশচন্দ্র অধিকারীর হাস্যরস সমৃদ্ধ গল্পগ্রন্থ ‘সিদলের সঞ্জীবনী’ প্রকাশ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বর্মন। দ্বিতীয় দিন উৎসব মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘পঞ্চানন বর্মা ও তাঁর সমাজ ভাবনা’ বিষয়ক আলোচনায় অংশ নেন বিধায়ক সুখবিলাস বর্মা, ধনেশ্বর রায়, সুধাংশু সরকার, মধুসূদন রায় সরকার প্রমুখ। আহ্বায়ক পরিমল বর্মন জানান, পুজোকে কেন্দ্র করে দু’দিনের এই আলোচনাসভা আমাদের লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার একটি প্রয়াস। — অনিতা দত্ত
অন্দরের কথাকার
প্রথম প্রকাশিত লেখা ১৯৬৭-এ। ১৯৭০ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত লিখেছেন উত্তরবঙ্গ এবং কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায়। তার পর সন্তান পালনের জন্য দীর্ঘ কুড়ি বছরের বিরতি। সেই সময় একটি খাতায় কখনও কখনও বিক্ষিপ্ত ভাবে লিখতেন সুনন্দা। সুনন্দা মানে ‘চৈতন্য’ (রায়গঞ্জ)-এর সম্পাদক সুনন্দা গোস্বামী। সেই সব লেখা কোনও দিন কোনও পত্রিকায় পাঠাননি। এর পর আবার লেখার শুরু। তিনি দেখেছেন যৌথ পরিবারের ভাঙন আর বাবা-মার বদলে যাওয়া সম্পর্কের জেরে সন্তানের একাকীত্বের যন্ত্রণা। দেখেছেন গ্রাম্য বধূর ওপর স্বামীর অত্যাচার। কবিতায় ধরা থাকে প্রেম প্রকৃতি আর মানুষের কথা। তাঁর কথায়, রক্ষণশীলতা ভাঙছে। বদলে যাচ্ছে স্বপ্ন। বেশির ভাগ পুরুষের লেখায় মেয়েদের যন্ত্রণা আর একাকীত্বের কথা তেমন গুরুত্ব পায় না। লেখার জন্য পড়াশোনা দরকার। সেটা প্রথাগত নাও হতে পারে। মফসসল শহরে থেকে সাহিত্যচর্চা করা কঠিন। বই এবং লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ আরও কঠিন। এর মধ্যে থেকেও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর তিনটি বই। লিখেছেন উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ এবং অসম থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকায়। সেই খাতাটা তাঁর কাছে আজও আছে। আজও পড়েন লেখাগুলো। সেখানে যেন লেখা আছে, শেষ থেকেও শুরু করা যায়। —সুদীপ দত্ত
অন্য কাগজ
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে উন্মোচিত হল নিখিলেশ রায় সম্পাদিত ‘অন্য কাগজ’ পত্রিকার শারদ সংখ্যাটি। ২২তম সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে কবিতা ও গল্প দিয়ে। স্থান পেয়েছে কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য, শৌভিক দে সরকার, সুজিত দাস, গৌতম গুহরায়, বিষ্ণুপদ রায়, বিপ্লব রায়, নিখিলেশ রায় প্রমুখের কবিতা। রয়েছে গল্পও। গল্প লিখেছেন পীযূষ ভট্টাচার্য, নলিনী বেরা, মধুময় পাল, শাঁওলি দে, সুচন্দ্রা ভট্টাচার্য, তপন রায় প্রমুখ। নতুন সংখ্যাটি থেকে কবি বিজয় দে, অঞ্জন দে, সমর রায়চৌধুরী, গণেশচন্দ্র মণ্ডল প্রমুখের কবিতা এবং মধুময় পালের ‘স্বর্গের অন্তপুর’, সুচন্দ্রা ভট্টাচার্যের ‘মায়াব্যঞ্জন’ গল্পাংশ পাঠ করা হয়। সঙ্গে ছিল আলোচনাও।
কালিয়াবাড়ির কালী মন্দির
কোচবিহারের ঐতিহ্যপূর্ণ নিদর্শনগুলির মধ্যে একটি হলদিবাড়ি থানার কালিয়াবাড়ির কালীমন্দির। কালিবাড়ি বাজার সংলগ্ন শতাধিক বছরের পুরোনো মন্দিরটির জরাজীর্ণ অবস্থা। কোচ রাজাদের অধীন রিসালদার এস্টেট রায়বাহাদুর সরযূ প্রসাদ সিংহ এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। পুরোহিত তারিণীকান্ত রায় জানান, তাঁরা কয়েক পুরুষ ধরে এই মন্দিরে পৌরৌহিত্য করে আসছেন। মন্দিরে কোনও স্থায়ী মূর্তি নেই। বেদী রয়েছে। নিত্যপুজো হয়। এলাকাবাসীর আর্থিক সহযোগিতায় দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালী পুজো হয়ে আসছে। এই পুজোর বিশেষত্ব কৃষ্ণা চতুদর্শীর রাতে মূর্তি গড়া হয়। অমাবস্যার নিশিতে পুজোপাঠ সম্পন্ন করে সেই রাতেই প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতিমা নির্মাণ করে পুজো শেষ করে বিসর্জন এক রাতের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। তাই এলাকারই বাসিন্দা উত্তর বড় হলদিবাড়ির গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য ছন্দা ষোষ জানান, একশো বছরের পুরনো এই মন্দিরটি যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। এটি সংস্কারের দাবি দীর্ঘ দিনের। মন্দিরের পিছনের অংশ বস্তা বোঝাই বালি দিয়ে কোনও রকমে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। যখন তখন ধসে পড়তে পারে। আজও অজানা মন্দিরের সঠিক বয়স, তার ইতিহাস। অবহেলা আর ঔদাসীন্যের শিকার এই মন্দিরের গায়ে জড়িয়ে আছে একটি জনপদের অকথিত ইতিবৃত্ত। ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা তলিয়ে ভাববে কে?