বাবার সঙ্গে চায়ের দোকানে বিপ্লব। ছবি: অভিজিৎ পাল।
পরিবারের আয় বলতে বাবার ছোট চায়ের দোকান আর কাঁচা বাড়িতে দুটো ভাড়াটে. আর তা দিয়েই কোনও রকমে সংসার চলে চার জনের পরিবারের। তবে আর্থিক অনটনকে উপেক্ষা করে ৮৭ শতাংশ নম্বর পেয়ে সকলের নজর কেড়েছে চোপড়া হাইস্কুলের ছাত্র বিপ্লব সাহা। উচ্চ মাধ্যমিকে তাঁর প্রাপ্ত নাম্বর ৪৩৫। তার ফলাফলে বেশ খুশি হলেও বাইরে রেখে কী ভাবে পড়াবেন তা নিয়ে চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে চোপড়ার সাহা পরিবারের।
ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনায় বেশ ভাল ছিল চোপড়ার হাইস্কুলের ছাত্র বিপ্লব. চোপড়া হাইস্কুল থেকেই মাধ্যমিকে পেয়েছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল সে। পরিবারের লোকেদের ইচ্ছায় একাদশ শ্রেণিতে মালদহের রামকৃষ্ণ মিশনে পড়তে গেলেও সেখানে নিজের মন টেকাতে পারেনি। ফিরে এসে চোপড়ার হাইস্কুলে ভর্তি হন। দূরে গিয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভেবেই ফিরে এসেছিলেন তিনি। তবে গ্রামের মধ্যে ফিরে এসে নিজের পুরনো স্কুল থেকে সেই ফলাফলে বেশ খুশি স্কুল কর্তৃপক্ষ। চোপড়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত বসাক বলেন, ‘‘খুব মেধাবী ছেলে বিপ্লব। বাবার ছোট একটি চায়ের দোকানের উপর চলে সংসার. স্কুলের যতটা সাধ্য স্কুল থেকে ওকে সাহায্য করেছি। তবে খুব চিন্তা হয় আর্থিক অনটন তার উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে চলার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।’’
বিপ্লবের বাবার সম্বল বলতে চোপড়ার তিস্তামোড় এলাকাতে একটি টিনের ছাপড়ার ছোট চায়ের দোকান। খুব ভাল করে না খেয়াল না করলে সেই চায়ের দোকানও খুঁজে পাওয়া ভার। সেখানে কাঠের উনোনে চা বানাচ্ছেন তিনি. তবে সারা দিনে সেখান থেকে যা বিক্রি হয় তা দিয়ে দিনের খরচই ওঠে না। আর্থিক প্রতিকূলতার কাছে বার হার মানলে শিক্ষা থেকে ছেলে মেয়েকে বঞ্চিত করেননি বিপ্লবের গণেশবাবু ও তার মা নয়নমণি সাহা। দুই ছেলে-মেয়েকে পড়িয়ে গিয়েছেন তিনি। বিপ্লব সাহার দিদি শিল্পী সাহা ইসলামপুর কলেজের বাংলার অনার্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তবে ভাইয়ের ও তাঁর পড়াশোনার ক্ষেত্রে আর্থের জোগান দিতে টিউশন পড়াচ্ছেন তিনি। তবে গ্রাম্য এলাকাতে টিউশন পড়িয়ে বেশি টাকা উপার্জন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবুও চেষ্টার ত্রুটি রাখেন না তিনিও। এত প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও বিপ্লব উচ্চমাধ্যমিকে বাংলায় পেয়েছে ৯০, ইংরেজিতে ৮৬, অঙ্কে ৯৩, রসায়নে ৮০, পদার্থবিদ্যায় ৮২, জীবন বিঞ্জানে ৮৪। তবে আরও একটু বেশি সুবিধা সুযোগ করে দিতে পারলে আরও বেশি নম্বর পেতে পারত বলে মনে করছেন স্কুল কর্তৃপক্ষও। ছোট বেলা থেকেই তাঁর ইচ্ছা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার।
এমনকী ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এলাকার লোকেদের পাশে দাঁড়াতে চায় সে। তার ইচ্ছাপূরণে যাতে কোন বাধা না তৈরি হয় সেই কারণে তাকে একটি কোচিং সেন্টারেও ভর্তি করেছেন পরিবারের লোকেরা। তবে সেই সেন্টারে ভর্তির ফি কমানো থেকে ভর্তির বাকি টাকা জোগাড়, সব কিছুতেই পরিবারের লোকেদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। বিল্পব বলেন, ‘‘আমার ইচ্ছা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায়। ইঞ্জিনিয়ার হলে নিজের পরিবারে পাশাপাশি এলাকার গরীব ছেলে মেয়েদেরও সাহায্য করতে চাই। যাতে টাকার অভাবে পড়াশোনা কারও মাঝ পথে থেমে না যায়। বিপ্লবের বাবা গণেশবাবু ও মা নয়নমণিদেবী বলেন, ‘‘দোকানের উপর নির্ভর করে চার জনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তাই নিজের থাকার অসুবিধা করেও দু’টো ঘর ভাড়া দিয়েছি। তবে সংসারের যা খরচ তাতে পেরে ওঠা যায় না। ছেলে ভাল ফল করেছে। ওর ইচ্ছে বাইরে থেকে পড়াশোনা করা। তবে যা আর্থিক অবস্থা বাইরে রেখে ছেলেকে পড়াশোনা করানো খুবই কষ্টকর। সরকারি বা বেসরকারি ভাবে কোনও সংস্থা এগিয়ে আসলে উচ্চ শিক্ষায় সুবিধা।’’