গরমে ফুটিফাটা জমি। —নিজস্ব চিত্র।
মাস দু’য়েক আগে অসময়ের ঝড়, বৃষ্টি আর শিলাতে এক দফায় মাথায় হাত পড়েছিল শিলিগুড়ি মহকুমার কয়েক হাজার কৃষক পরিবারের। বৃষ্টিতে, শিলায় বহু জায়গায় সব্জি খেত লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল। ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন কয়েক হাজার চাষি। চলতি মাসে তা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক চাষে ফিরতেই ফের তীব্র দাবদাহের মুখে পড়ে দিশাহারা শিলিগুড়ি মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষিরা। গত এক সপ্তাহের ৩৫-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম, প্রচণ্ড আর্দ্রতায় নষ্ট হয়ে যেতে বসে মহকুমার আমন ধান, ধানের বীজতলা ও সব্জি খেত। বৃষ্টির দেখা না মেলায় পোকার উপদ্রবও শুরু হয়েছে খেতগুলিতে।
বিশেষ করে মহকুমা খড়িবাড়ি এবং ফাঁসিদেওয়া ব্লকের অবস্থায় বেশি সবচেয়ে বেশি খারাপ। কৃষি দফতরের হিসাব অনুসারে, মহকুমার অন্তত ৩০ শতাংশ জমির ধান ও সব্জি খেত নষ্ট হয়েছে। আরও নষ্টের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৫০ শতাংশ জমির ফসল। ফুল ধরে পড়া থেকে শুরু করে ঝলসে যাচ্ছে গাছ। মহকুমার মহানন্দা ক্যানাল লাগোয়া এলাকায় কিছু চাষি জল পেলেও গভীর নলকূপ এবং শ্যালো পাম্প দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। খেতে জল দিলেই নিমেষে তা মাটির গভীরে চলে যাচ্ছে। জল ধরে রাখা বা মাটির উপরের অংশ খুব বেশি ভেজা থাকছেই না। কৃষি দফতরের শিলিগুড়ি মহকুমার অন্যতম সহকারি অধিকর্তা মেহফুজ আহমেদ বলেন, ‘‘গত এক সপ্তাহ ধরে আবহাওয়ার এমন পরিবর্তন ভাবাই যাচ্ছে না। জুলাই মাসে সাধারণত এই সময় প্রচুর বৃষ্টি হয়। এ বার তা হলই না। আমন ধানের সঙ্গে সব্জি চাষের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। রোজই বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিরা টেলিফোন করছেন।’’ আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আবহাওয়া না বদল হলে এই মরসুমে চাষের কী অবস্থা দাঁড়াবে তা ভাবাই যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সহ কৃষি অধিকর্তা।
শিলিগুড়ি মহকুমায় এই সময় প্রায় ২২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়। যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর ফাঁসিদেওয়া ও খড়িবাড়ির গ্রামীণ এলাকায়। তেমনিই, মহকুমা সব্জি প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে ওই দুই ব্লকে সব্জি চাষের পরিমাণ ৩ হাজার হেক্টরের মত। প্রতি বছর জুলাই মাসে বৃষ্টিতে আমন ধানের বীজতলা তৈরি হয়। অগস্টের প্রথম সপ্তাহে জমিতে জল দাঁড়িয়ে গেলে আমন ধান রোপণ করেন চাষিরা। অক্টোবর মাসে ধান জমি থেকে কাটা হয়। কিন্তু এ বার মে, জুন মাসে বৃষ্টি হওয়ায় সেই সময় অধিকাংশ চাষিরা বীজতলা তৈরি করেন। জুলাই মাসে প্রথমে জমিতে বীজতলা বসিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মাসের শেষ সপ্তাহে আবহাওয়া বদলে যাওয়ায় চারগাছগুলি ঝলসে গিয়েছে। কোথাও বীজতলা বেশি বয়স হওয়ায় জমিতেই তা নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে।
আবার আমন ধানের পাশাপাশি এই সময় মহকুমা জুড়ে বর্ষাকালীন সব্জি চাষও হয় পুরোদমে। সাধারণ জমিতে ঢেঁড়স, বেগুন, লঙ্কা ছাড়া খেতে মাচা করে পটল, লাউ, ঝিঙে, করলা এবং শসা চাষ হয়। এ ছাড়া শীতকালীন ‘আল্রি ভ্যারাইটি’ হিসাবে জুলাই থেকে মহকুমায় ফুলকপির চারা তৈরির কাজ শুরু হয়। কৃষি দফতরের অফিসারেরা জানান, প্রচণ্ড তাপমাত্রা, গরম হাওয়া এবং বাতাসে বিন্দুমাত্র জলীয় বাষ্প না থাকায় ধান, সব্জির খেতের চেহারাই পাল্টে হিসাবে। সব্জি খেতে গরমে ‘মাকড়’ এবং ধানের খেতে ‘ল্যাদা’ পোকার উপদ্রব বেড়েছে। গাছ ঝলসে থেকে শুরু করে ফুলও ঝরে পড়ছে। এমকমাত্র ফাঁসিদেওয়া পঞ্চায়েত এবং জালাস পঞ্চায়েতের ৩০০ হেক্টর জমিতে মহানন্দা ক্যানালের জল মেলায় সেখানে কিছুটা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গিয়েছে।
মহকুমার বিভিন্ন ব্লকের চাষিরা জানান, জুন মাসে এক দফায় শিলাবৃষ্টি, ঝড়ের জেরে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তার আগে নেপালের ভূমিকম্পের জন্য সেখানে সব্জি যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতেও বহু চাষি ক্ষতির মুখে পড়েন। সরকারি তরফে ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়। এবার ফের একই অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাঁসিদেওয়া, খড়িবাড়ি এলাকার ধান চাষি বানা সিংহ, গোবিন্দ বর্মন, দীনেশ বর্মন বা শ্রীকুমার বর্মনের জানান, এই গরমে কী করা উচিত তা তাঁরা বুঝতেই পারছেন না। পাম্প, গভীর নলকূপের জল দিয়েও খেতে জল দাঁড় করানো যাচ্ছে না। তাঁদের আশঙ্কা, ‘‘এই মরসুমে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।’’ আবার ছোট হাফতিযাগছ এলাকার সব্জি চাষি মহম্মদ সফিকূল, ডালু মহম্মদের আক্ষেপ, ‘‘খেতের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। জুলাই মাসে এমন অবস্থা হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি।’’