প্রায় ৬০ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ির উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এসজেডিএ) দুর্নীতি মামলায় সিআইডি নয়ছয় হওয়া টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে কতটা সক্রিয় তা নিয়ে সংশয়ে পড়েছে আদালতই। দার্জিলিং জেলা আদালতের অতিরিক্ত দায়রা জজ, স্পেশাল কোর্টের বিচারক পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী মামলার শুনানির সময়ে ওই মন্তব্য করেছেন। এ জেলার এই স্পেশাল কোর্টেই এসজেডিএ-র সমস্ত দুর্নীতি মামলার বিচারপর্ব চলবে। গত ১৭ অগস্ট দুর্নীতি মামলার অন্যতম অভিযুক্ত, আইএএস অফিসার গোদালা কিরণ কুমারের জামিনের আবেদনের মঞ্জুর করে রায়দানের সময় বিচারক সিআইডি-র তদন্ত নিয়ে নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
আদালত সূত্রের খবর, স্পেশাল কোর্টের বিচারক তাঁর পাঁচ পাতার রায়ে স্পষ্ট করে উল্লেখ করে বলেছেন, এখনও অবধি জমা পড়া তথ্য প্রমাণ, নথিপত্র নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখার পর দেখা যাচ্ছে তদন্তকারী সংস্থা এই মামলার ভিত্তিতে ‘টাকা’ উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে। তদন্তকারী অফিসার সরকারি ৬০ কোটি টাকার বেশিরভাগেরই কিছুই হদিশ করতে পারেননি। এমনকী, এর জন্য ঠিকঠাক কোনও চেষ্টাও করা হয়নি বলেও বিচারক রায়ে লিখিতভাবে উল্লেখ করেছেন। মামলার কেস ডায়রি, সাক্ষীদের তালিকা দেখার পর বোঝা যাচ্ছে, চার্জশিট জমা পড়লেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই মামলার বিচারপর্ব শুরু হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে অবশ্য মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি-র কোনও শীর্ষ কর্তা তো বটেই, তদন্তকারী অফিসার গৌতম ঘোষালও কোনও মন্তব্য করেননি। বিচারধীন বিষয় নিয়ে তাঁরা কোনও মন্তব্য করতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তবে মামলার অভিযুক্ত গোদালাকিরণ কুমারের আইনজীবী অভ্রজ্যোতি দাস বলেছেন, ‘‘প্রথম থেকেই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। স্পেশাল কোর্টের বিচারকের পর্যবেক্ষণে তার অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।’’
সিআইডি-র তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতের প্রশ্নচিহ্ন তোলার আগেই অবশ্য রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ময়নাগুড়ির বৈদ্যুতিক চুল্লি যে মামলার চার্জশিট জমা পড়েছে তা পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ, যে দুর্নীতি মামলায় একধিক লোককে অভিযুক্ত হিসাবে সমন পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তাঁদেরই অনেককে পরবর্তীকালে চার্জশিটে সাক্ষী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ভাবে, এসজেডিএ-র একাধিক পুরানো বোর্ড সদস্যকে সাক্ষী হিসাবে রাখা নিয়ে হইচই হয়েছে।
গত ২০১১ সালে রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসজেডিএ-র নতুন বোর্ড গঠিত হয়। ২০১২ সাল থেকে ময়নাগুড়ির বৈদ্যুতিক চুল্লি প্রকল্পটি ছাড়াও বাগডোগরা, মালবাজারে বৈদ্যুতিক চুল্লি, দুটি নিকাশির জল সংশোধনকারী প্ল্যান্ট, বিদ্যুতের সাবস্টেশন এবং মহানন্দা নদীর জল উত্তোলনের প্রকল্প হাতে নিয়েছিল এসজেডিএ। সব মিলিয়ে প্রকল্পগুলির কাজ না করেও প্রায় ৬০ কোটি ৭৫ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। গোদলার বিরুদ্ধে চার্জশিটেই সিআইডি অভিযোগ করেছে, ময়নাগুড়ির একটি প্রকল্পের নয়ছয়েই গোদালা ঠিকাদারের হাওলার মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি টাকা নিয়েছেন। কিন্তু সেই টাকা বা সম্পত্তি সিআইডি-র কোনও হদিশই করতে পারেনি বলে সিআইডি মামলার নথিতে উল্লেখ করেছে। আর নথিপত্র দেখার পর বিচারক তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গত ২১ জুলাই এসজেডিএ ওই দুর্নীতির মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে। ময়নাগুড়ির ওই চুল্লির মামলায় প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা কাজ না করেই তছরুপ করা হয়েছে বলে সিআইডি চার্জশিটে উল্লেখ করেছে। মাত্র দশ মিনিটে ই-টেন্ডারে গরমিল করে ওই টাকা ঠিকাদার সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে এসজেডিএ-র একাংশ বাস্তুকার এবং গোদালা হাতিয়ে নিয়েছে বলে সিআইডির অভিযোগ। প্রায় ৬ কোটি টাকা গোদালা হাওয়ালার মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতে আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়েছে বলে সিআইডি-র দাবি। মামলার অন্যতম অভিযুক্ত এসজেডিএ-র বাস্তুকার মৃগাঙ্কমৌলি সরকার, সপ্তর্ষি পাল, ঠিকাদার অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ ১৩ জন জামিনে আছেন। তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তি মিলিয়ে পুলিশ কেবলমাত্র ১৭ কোটি টাকা এত দিনে উদ্ধার দেখাতে পেরেছে।
আদালত সূত্রের খবর, কোনও সরকারি অফিসারের বিরুদ্ধে সরকারি টাকা নয়ছয় বা দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হলে তা প্রতিটি জেলার একটি বিশেষ স্পেশাল কোর্টেই বিচারপর্ব হবে। দার্জিলিং-এর ওই স্পেশাল কোর্টে এসজেডিএ-র মামলার বিচারপর্ব চলবে। আপাতত নতুন ছয়টি দুর্নীতি মামলায় গোদালা গ্রেফতার হয়ে শিলিগুড়ি জেলে আছেন। আগামী ৩১ অগস্ট মামলার ফের শুনানির দিন ধার্য হয়েছে। নিয়ম অনুসারে প্রতিটি মামলা একে একে দার্জিলিঙের ওই স্পেশাল কোর্টে চলে যাবে।