নগদ টাকা এবং গয়না মিলিয়ে বর্ধন বাড়ি থেকে অন্তত ৫ থেকে ৭ লক্ষ টাকার সম্পত্তি মিলবেই ভেবে লুঠের পরিকল্পনা করে তিন মিস্ত্রি। ঘটনার কয়েকদিন পরে তাঁদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের পরে এমনই দাবি পুলিশের।
মাস কয়েক আগেই বর্ধন বাড়িতে কাঠের কাজ করার সুবাদে কত গয়না এবং নগদ থাকতে পারে তার একটা অনুমান করেছিল তিন জন। সেই মতোই গত সোমবার সন্ধ্যায় মাটিগাড়ার লেনিনপুরের ‘বর্ধন-নিবাসে’ পৌঁছয়। যদিও, তারা ওই বাড়ি থেকে আড়াই লাখ টাকার বেশি মূল্যের জিনিসপত্র লুঠ করতে পারেনি বলে পুলিশ জানিয়েছে। তার মধ্যে গয়না এবং নগদ মিলিয়ে প্রায় দু’লাখ টাকার জিনিসপত্র ইতিমধ্যেই উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধৃতদের জেরার পরে পুলিশের দাবি, লুঠ করতে গিয়েই গৃহকর্তা প্রদীপ বর্ধন, তাঁর স্ত্রী দীপ্তিদেবী এবং যুবক ছেলে প্রসেনজিতকে খুন করে তিন মিস্ত্রি।
শিলিগুড়ি পুলিশের ডিসি (পশ্চিম) শ্যাম সিংহ বলেন, ‘‘তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। ধৃতদের জেরা চলছে। তাতে নানা তথ্য মিলছে।’’
বছর দেড়েক আগে বিদ্যুৎ পর্ষদ থেকে অবসর নিয়ে প্রদীপবাবু দোতলা বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন। সে সময়ে বাড়ির অনেক কাঠের কাজের ভার দীপু সূত্রধরকে দিয়েছিলেন প্রদীপবাবু। সে সময় আরও দুই কাঠের মিস্ত্রি সহদেব বর্মন এবং চিরঞ্জিত মোদককেও সঙ্গে নিয়েছিল দীপু। দোতলার একটি দরজা বন্ধ হচ্ছে না বলে জানিয়ে প্রদীপবাবু ফের দীপুকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত সোমবার বিকেলে তিন জনে বর্ধন বাড়িতে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, সেদিন বিকেলেই একটি মদের আসরে বসে তিন জন লুঠের পরিকল্পনা করেছিল। লুঠের পরে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছিল তারা। যদিও পুলিশের দাবি, সোমবার সন্ধ্যায় বর্ধনবাড়িতে গিয়ে পরিবারের তিন সদস্যকেই খুন করে তারা। সে সময় তুমুল বৃষ্টি চলায় কেউ তাদের বাড়িতে ঢুকতে এবং বের হতে দেখেনি বলে মনে করে, তিন জনেই নিজের বাড়িতে ফিরে যায়।
ধৃত সহদেবের পরিবারের সদস্যরাও দাবি করে, অন্য দিনের মতোই, গত সোমবারেও কাজ সেরে রাত ৯টা নাগাদ বাড়ি ফিরেছিল সে। পরদিন মঙ্গলবার রাতে কাজ থেকে ফেরার সময়ে বাজার করে এনেছিল। সহদেব বাড়িতে জানায়, কাজ থেকে কিছু টাকা পেয়েছে, তা দিয়েই বাজার করেছে। গত বুধবার বাড়িতে একটি মোবাইল নিয়ে আসে সহদেব। স্ত্রী সোনালি দেবী বলেন, ‘‘যার সঙ্গে কাজ করত, সে নাকি টাকা না দিয়ে মোবাইল দিয়েছিল বলে জানায়। মোবাইল বিক্রি করবে বলেও ঠিক করে। তবে তার আগে নিজের সিমটা মোবাইলে ভরেছিল।’’ বুধবার রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ মোবাইলের ‘লোকেশন’ দেখে পুলিশ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় সহদেবকে।
মাটিগাড়ার বর্ধন পরিবারের নিহতদের একজনের মোবাইল ফোন বুধবার রাতে সহদেবের থেকে উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। মোবাইলের ‘লোকেশন’ পেয়ে পুলিশ জানতে পারে মাটিগাড়ারই শালবাড়ি এলাকার বাসিন্দা সহদেব বর্মনের নামে কেনা একটি সিম মোবাইলে ঢোকানো হয়েছে। সহদেবকে গ্রেফতারের পরেই মাটিগাড়ার প্রমোদ নগরের দীপূ সূত্রধর এবং মালবাজারের শ্বশুরবাড়ি থেকে চিরঞ্জিত মোদককে পুলিশ গ্রেফতার করে।
বছর ছয়েক আগে মাটিগাড়ার ফাঁসিদেওয়া মোড়ে একটি দুর্ঘটনায় সহদেব গুরুতর জখম হয়। তারপর থেকেই স্নায়ুরোগের সমস্যায় ভুগতে থাকে সহদেব। বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথবাবুও কাঠমিস্ত্রি। তিনি এ দিন বলেন, ‘‘অভাবের সংসার। সহদেবের চিকিৎসা শেষ করতে পারিনি। দুর্ঘটনার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। ভালমন্দ বিচার ছিল না। যে যা বলত, তাই শুনত।’’ সহদেবের মা গিনিবালা দেবীর দাবি, ‘‘আমার মনে হয় ওকে ফাঁসানো হয়েছে।’’
গ্রেফতারির পরে দীপুর স্ত্রী এবং মা বাড়িতে থাকছেন না। প্রমোদনগরে টিনের চাল দেওয়া কংক্রিটের দু’টি ঘর। সেখানেই দীপু স্ত্রী এবং মাকে নিয়ে থাকত। এক পড়শির কথায়, ‘‘অনেকেই ওর থেকে টাকা পয়সা পেত। গ্রেফতার হওয়ার খবর শুনে অনেকে ফের তাগাদা শুরু করায়, ওর মা, বউ দিনের বেশিরভাগ সময়েই বাড়ি থাকছে না।’’
এলাকার বাসিন্দারা অবশ্য দাবি করেছেন, গত সোম এবং মঙ্গলবার দু’দিনই দীপুকে এলাকায় দেখা গিয়েছে। দু’দিনই বেশি রাতে সে বাড়ি ফিরেছে বলে এলাকাবাসীর দাবি। ধৃত চিরঞ্জিত জলপাইগুড়ি শহর লাগোয়া শোভানগরের বাসিন্দা হলেও, গত ছ’মাস ধরে সেখানে থাকত না বলে জানা গিয়েছে। কখনও মালবাজারের শ্বশুরবাড়ি কখনও বা শিলিগুড়িতে থাকত। সম্পর্কে চিরঞ্জিতের এক মামা বলেন, ‘‘বেশি রোজগারের জন্য শিলিগুড়ি চলে গিয়েছিল। তারপরে আর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখত না।’’