নতুন ট্রেন চড়তে ভোরেই জাগল চ্যাংরাবান্ধা

প্রথম দিনই নতুন ট্রেনের যাত্রী হবেন ভেবে ভোরেই নতুন স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিলেন চ্যাংরাবান্ধার গৃহবধূ মৌমিতা ঘোষ। ট্রেনে করে সরাসরি শ্বশুরবাড়ি থেকে শিলিগুড়িতে বাপের বাড়ি যাবেন ভেবে তাঁর আনন্দের ছিল না। নতুন ট্রেনে উঠে বসে জানালেন, শিলিগুড়ি যেতে এত দিন কম হ্যাপা পোহাতে হত না।

Advertisement

দীপঙ্কর ঘটক ও কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:৩৭
Share:

নতুন ট্রেন ঘিরে উচ্ছ্বাস দোমহনি স্টেশনে। বুধবার তোলা নিজস্ব চিত্র।

প্রথম দিনই নতুন ট্রেনের যাত্রী হবেন ভেবে ভোরেই নতুন স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিলেন চ্যাংরাবান্ধার গৃহবধূ মৌমিতা ঘোষ।

Advertisement

ট্রেনে করে সরাসরি শ্বশুরবাড়ি থেকে শিলিগুড়িতে বাপের বাড়ি যাবেন ভেবে তাঁর আনন্দের ছিল না। নতুন ট্রেনে উঠে বসে জানালেন, শিলিগুড়ি যেতে এত দিন কম হ্যাপা পোহাতে হত না। বাস বা গাড়ি করে দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে ৪ ঘন্টার বেশি সময় লেগে যেত শিলিগুড়ি পৌঁছতে। বললেন, ‘‘রাতের দিকে দুর্ঘটনার ভয়ও পেতাম। আর সমস্যা থাকল না। একই ট্রেনে সকালে শিলিগুড়িতে বাপের বাড়িতে সময় কাটিয়ে আবার সন্ধ্যায় কোচবিহার ফিরে আসব। মাত্র ৩ ঘন্টা করে সময় লাগবে।’’

শুধু মৌমিতা নয়, দীর্ঘদিন পর বুধবার চ্যাংরাবান্ধা থেকে মালবাজার হয়ে শিলিগুড়ি নতুন ব্রডগেজ লাইনে ট্রেন চালু হওয়ায় উৎসাহে ফুটছিলেন দোমহনী, ময়নাগুড়ি, ভোটপট্টি, লাটাগুড়ি-সহ একাধিক এলাকার বাসিন্দারা। প্রথম টিকিট কাটার জন্য সকাল থেকে স্টেশনগুলিতে লাইনও দিয়েছেন। ডুর্য়াসের বিভিন্ন স্টেশন থেকে উৎসাহীদের অনেকে ট্রেনে চড়ে সেবক, গুলমা এসে আবার গাড়িতে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। কয়েক জনকে ট্রেনে পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তুলতেও দেখা যায়।

Advertisement

বাসিন্দাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেমে পড়েছিলেন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। দোমহনী স্টেশন ম্যানেজারকে ফুল, মিষ্টি দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন তৃণমূল কর্মীদের একাংশ। পরে ট্রেনটি পৌঁছালে ট্রেনের চালক এবং গার্ডকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাঁদের কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন ব্রডগেজ করার ঘোষণা করেন। রাজ্য সরকারের চেষ্টাতেই এ বার এই ট্রেন চালু হল।’’

আপাতত আটটি কোচের প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি সপ্তাহে ছ’দিন চ্যাংরাবান্ধা এবং শিলিগুড়ি জংশনের মধ্যে চলাচল করবে। রবিবার রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য পরিষেবা বন্ধ থাকছে বলে রেলের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। উত্তর পূর্ব সীমান্ত রেলের এনজেপির সিনিয়র এরিয়া ম্যানেজার পার্থসারথি শীল বলেন, ‘‘নতুন কোচ চলে এসেছে। আপাতত একটি ট্রেন চলাচল করবে। আগামীতে যাত্রীদের চাহিদা দেখে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে কি না তা ঠিক করা হবে।’’

Advertisement

রেল সূত্রের খবর, ৭০ দশকে জলপাইগুড়ির বিধ্বংসী বন্যার জেরে চ্যাংরাবান্ধা থেকে মালবাজার পর্যন্ত মিটারগেজ লাইনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। দীর্ঘদিন লাইনটি বন্ধ ছিল। তার পরে মিটারগেজে কিছু ট্রেন চলেছে। ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন মিটারগেজ লাইনকে ব্রডগেজে পরিবর্তনের নির্দেশ দেন। কাজ শুরু হয়। ২০১১ সাল নাগাদ লাইন পাতার কাজ শেষ হলেও নানা কারণে ট্রেন চালানো সম্ভব হয়নি। শেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সংগঠন, ব্যবসায়ী মহল লাইনটি চালু করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সরব হয়। রেল মন্ত্রকে একাধিক স্মারকলিপিও পাঠানো হয়। অবশেষে ট্রেনটি চালুর ঘোষণা করে রেল।

রেলের তরফে জানানো হয়েছে, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টায় ডেমু স্পে‌শালটি চ্যাংরাবান্ধা থেকে ছেড়ে সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ শিলিগুড়ি জংশনে পৌঁছাবে। বিকেল চারটেয় শিলিগুড়ি জংশন থেকে ট্রেনটি রওনা হয়ে চ্যাংরাবান্ধায় পৌঁছবে সন্ধে ৭টা নাগাদ।

উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীদের অন্যতম সংগঠনের ফোসিনের সম্পাদক বিশ্বজিৎ দাস বলেন, ‘‘প্রায় এক দশক ধরে আমরা এই লাইনটি চালু করার দাবি করে যাচ্ছিলাম। অন্তত এক থেকে দেড় ঘণ্টা কম সময়ে শিলিগুড়ির সঙ্গে ওই এলাকা থেকে যোগাযোগ করা যাবে। ব্যবসায়িক দিক থেকে লাইনটি লাভজনক হবে।’’

এই ট্রেন চালুর ফলে পযর্টনের দিক থেকেও বিশেষ সুবিধা হবে বলে মনে করছেন পযর্টন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশ থেকে চ্যাংরাবান্ধা চেকপোস্টে নেমে সে দেশের পযর্টকেরা সোজা লাটাগুড়ি, বড়দিঘি, ময়নাগুড়ি বা মালবাজারের মত এলাকায় পৌঁছাতে পারবেন।

সেই সঙ্গে সেখান থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছে দার্জিলিং পাহাড় বা সিকিম যেতে পারবেন। ইস্টার্ন হিমালয়া ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সভাপতি সম্রাট সান্যাল বলেন, ‘‘ডুয়ার্স থেকে আলিপুরদুয়ার বা শিলিগুড়ির দিকে ট্রেন ছিল। কিন্তু তাতে লাটাগুড়ি, ময়নাগুড়ি, চ্যাংরাবান্ধার মত জায়গাগুলিতে সরাসরি ট্রেনে যাওয়া যেত না। এবার সেই সমস্যা মিটবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement