কুয়াশার জেরে প্রত্যাশা মতো মুকুল নেই আম গাছে। —নিজস্ব চিত্র।
এ যেন শাঁখের করাত! গত বছর রেকর্ড ফলনের জেরে দাম মেলেনি, আবার এ বার কম ফলনের আশঙ্কায় উদ্বেগ।
বসন্তের শুরুতে মুকুলে ভরা আমগাছের ছবিটা খুবই চেনা মালদহের বাগানে-বাগানে। যদিও এ বছর সেই ছবি যেন উধাও! ফেব্রুয়ারি শেষ হতে চললেও এখনও জেলার অধিকাংশ বাগানে মুকুল তেমন ভাবে না আসায় হতাশ আমচাষিরা। এ জন্য অবশ্য আবহাওয়াই ‘ভিলেন’, বলছেন আম বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ চাষি সকলেই। জেলার আম বিশেষজ্ঞ কমলকৃষ্ণ দাস বলছেন, ‘‘চলতি মরসুমে টানা ২০দিন ধরে কুয়াশা থাকায় আমের মুকুল ঠিক মতো ফুটতে পারেনি।’’
গতবার অবশ্য ছবিটা এমন ছিল না। উদ্যান পালন দফতরের কর্তারা জানিয়েছেন, আবহাওয়া অনুকূল থাকায় গতবার জেলায় ৯০ শতাংশ মুকুল হয়েছিল। শুরুর দিকে বৃষ্টিপাতও তেমন হয়নি। ফলে মুকুল গাছ থেকে তেমন ঝরে যায়নি। সে জন্য প্রায় সাড়ে চার লক্ষ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল মালদহ জেলায়, যা রেকর্ড। তাতেও সমস্যা! অধিক ফলনের কারণে জেলার চাষিরা দাম না পেয়ে একাধিক বার রাস্তায় আম ফেলে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। যদিও সরকার পরে চাষিদের কাছ থেকে আট টাকা কেজি দরে আম কিনে নিয়ে দিল্লি, কলকাতা, মালদহ টাউন স্টেশনে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিল। তারপরেও লোকসানের মুখ দেখতে হয়েছিল চাষিদের।
২০১৪ সালে জেলায় আমের উৎপাদন হয়েছিল ১ লক্ষ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। ওই বছর জেলাতে শীত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় গাছে গাছে মুকুল আসতে দেরি হয়েছিল। কুয়াশার দাপট থাকায় বহু গাছেই মুকুল আসেনি। আর ২০১৩ সালে জেলায় ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল। চলতি বছরও ওই বছরের মতো ফলনের হওয়ার আশা দেখছেন দফতরের আধিকারিকেরা। তবে জানুয়ারির মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই জেলাতে আম গাছগুলিতে মুকুল আসতে শুরু করে দেয়। আর ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে গাছগুলি মুকুলে ভরে থাকে। গত বছর এমন সময়েই জেলাতে ৯০ শতাংশ গাছে মুকুল হয়েছিল। এবার অর্ধেক শতাংশ গাছে মকুল আসায় হতাশ চাষিরা। তবে এখনও মুকুল আসার সম্ভাবনা দেখছেন আধিকারিকেরা।
বিগত বছরের মতো আম উৎপাদন না হলেও এ বারও ফলন ভাল হবে বলে আশা করছেন উদ্যানপালন দফতরের কর্তারা। দফতরের সহ অধির্কতা রাহুল চক্রবর্তী বলেন, ‘‘অন্য জেলার তুলনায় মালদহে দেরি করে আমের মুকুল আসে। আবহাওয়ার কারণেই এমন হয়।’’ তাঁর দাবি, ‘‘এখন প্রায় ৫০ শতাংশ মুকুল হয়ে গিয়েছে। আর সপ্তাহখানেকের মধ্যে পরিমাণ আরও বাড়বে। এ বারও আমের বেশ ভালো ফলন হবে জেলায়।’’
জেলা উদ্যান পালন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মালদহে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। জেলার মধ্যে ইংরেজবাজারে ৯ হাজার, মানিকচকে ৫ হাজার, রতুয়া ১ ও ২ ব্লকে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। জেলার মধ্যে এই ব্লক গুলিতেই সবচেয়ে বেশি আমচাষ হয় তবে গাজল, বামনগোলা, চাঁচল প্রভুতি এলাকায় আমচাযের জমির ক্রমশ বাড়ছে। জেলায় আমচাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষ জড়িত। এবার মুকুল তেমন ভাবে না আসায় হতাশার সুরে সুব্রত ঘোষ, মধুময় সরকারের মতো আমচাষিরা বলেন, ‘‘গত বার অধিক ফলনের জন্য কম দামেই বিক্রি করতে হয়েছিল। আর এবার তেমন মুকুল আসেনি। ফলে এবারও লোকসানের মুখ দেখতে হবে বলে মনে হচ্ছে।’’
ছবিটা একই পড়শি জেলা মুর্শিদাবাদেও। সেখানেও মুকুল এবার গত বছরের চেয়ে অনেকটাই কম। বাগান মালিকেরাও তাতে অবাক নন। সামশেরগঞ্জের কেতাবুল শেখ , জঙ্গিপুরের বরজাহান আলিরা বলছেন, “প্রাকৃতিক এই নিয়মই আমরা বরাবরই দেখে আসছি। গত বছর আমের ফলন ছিল ভাল। তাই আমের ফলন অনেকটাই কমবে। তবে খরা এখনও শুরু হয় নি। প্রায় নিয়ম করেই স্প্রে করা হচ্ছে গাছে।” মুর্শিদাবাদের সহকারী উদ্যানবিদ শুভদীপ নাথও বলেন , ‘‘গত বছর আমের ফলন বেশি হওয়ায় এ বারে স্বাভাবিক নিয়মেই জেলায় আমের ফলন কম হবে ৩৫ শতাংশ মত। তাই এবারে যেটুকু মুকুল এসেছে তাকে ধরে রাখতে ৫০ শতাংশ করে জৈব ও রাসায়নিক সার মিশিয়ে এখন থেকেই প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে।”
ক্ষতি এড়াতে এখন থেকেই উদ্যোগী হয়েছে মালদহের উদ্যান পালন দফতরও। দফতরের কর্তাদের দাবি, চাষিদেরকে সচেতন করতে লিফলেট বিলি করা হচ্ছে। আর মুকুল ধরে রাখার জন্য চাষিদেরকে পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। কারণ এমন সময়েই শোষক পোকার আক্রমণ দেখা যায়, যারা ক্ষতি করে আমের মুকুলে। তার জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই কীটনাশক স্প্রে করতে হয়।
আম-গৃহস্থ তাকিয়ে আছেন সে দিকেই। কারণ, আমের ফলন কমলে স্বাভাবিক ভাবেই দাম বাড়বে। তাই সবার দাবি, ফলের রাজাকে পাতে পেতে গাঁটের কড়ি যেন বেশি খরচ করতে না হয়।
(সহ প্রতিবেদন: বিমান হাজরা)