সাত সকাল থেকে বিএসএফ জওয়ানদের অনেকটা অনুরোধ করে শেষ অবধি সীমান্ত গেটের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর শাখা সচিবালয় উত্তরকন্যা লাগোয়া কামরাঙাগুড়ির বাসিন্দা মর্জিনা পারভিন। শাশুড়িকে একা ছাড়বেন না বলে সঙ্গে ছিলেন সাদ্রে আলমও। চোখে মুখে উৎকন্ঠার সঙ্গে ছিল প্রবল উৎসাহও। বৃহস্পতিবার বিকাল চারটা নাগাদ গেট ওপারের বাসিন্দাদের জন্য এক দফায় খুলতেই বাঁধনছাড়া উচ্ছ্বাসে ভাসলেন মর্জিনা, সাদরে আলমেরা।
ওপারের পঞ্চগড়ের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন ততক্ষণে ভারতের মাটিতে পা রেখেছেন। তিনি মর্জিনা পারভিনের ভাসুর। পরিবার নিয়ে ওপারে থাকেন। মর্জিনারা দীর্ঘদিন ধরে এপারেই। এতদিন তাঁদের এপার-ওপার করতে হলে চ্যাংরাবান্ধা হয়ে শতাধিক কিলোমিটার ঘুরে আসতে হত। আবেগে ভেসে তাঁরা বললেন, ‘‘সারাজীবনে এমন আনন্দের দিন আর মনে পড়ছে না।’’
ভিড়ের মধ্যেই গলায় সে দেশের সবুজ-লাল পতাকার রঙের উত্তরীয় পড়ে দাঁড়িয়েছিলেন পঞ্চগড়ের মহম্মদ মুজিবর। এগিয়ে এসে তাঁর দুঃখের অবসানের কথাও শোনালেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমদানি-রফতানির ব্যবসা করি। শিলিগুড়িতে মালপত্র ফুলবাড়ি হয়ে যেত আধঘণ্টায়। আর আমি যেতাম ২০০ কিলোমিটার ঘিরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চড়ে। আর এত কষ্ট করতে হবে না ভেবেই ভাল লাগছে।’’
জিরো পয়েন্ট শেষ করে বাংলাদেশের সীমান্ত গেট হয়ে ভিতরে ঢুকলে দুপুর থেকে মানুষের মাথা ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়ার উপায় ছিল না। কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ বা ভারত থেকে যাওয়া কোনও প্রতিনিধির সঙ্গে নিজস্বী তুলে নিচ্ছেন। বড় চওড়া রাস্তার ধারে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লাগোয়া মাঠে লাল-সবুজ সামিয়ানার নিচে ছিলেন কম করে হাজার পাঁচেক বাসিন্দা থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরা। কোথাও কোথায় সেদেশের ক্ষমতায় থাকা দল ‘আওয়ামি লিগে’র নামের স্লোগানও চলেছে। অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে ছিলেন পঞ্চগড় উপ-জেলার সদরের চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদাত সম্রাট। তিনি আবার আওয়ামি লিগের সম্পাদকও। তাঁর কথায়, ‘‘এতদিনের দীর্ঘযাত্রা, সময়, খরচের ধকল আর সইতে হবে না ভেবেই বাসিন্দারা আনন্দে মাতোয়ারা। দুই দেশের বন্ধু সরকারের জন্যই এটা সম্ভব হল।’’
মঞ্চের অনুষ্ঠান শেষের পর ভিড় সামলাতে হিমসিম খেতে হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ডসদের জওয়ানদের। ভিআইপিদের গাড়ির রাস্তা খালি করতে টানাহেঁচড়াও বাদ যায়নি। শেষে বিকেলে সীমান্ত খুলতেই সে দেশের কয়েক হাজার বাসিন্দা ভারতের দিকে হাত তুলে হাঁটতে থাকেন। কোনওক্রমে তাঁদের ঠেকান বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডরা।
এ পারেই ততক্ষণে উৎসবের ছোঁওয়া লেগে গিয়েছে। সীমান্ত সড়ক, বিএসএফের ফুলবাড়ি সীমান্ত চৌকি, ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে তিনধারণের জায়গা নেই। ফুলবাড়ি বাজার থেকে চেকপোস্ট অবধি রাস্তা দুই পাশের বাতিস্তম্ভে তৃণমূলের পতাকা ছেয়ে গিয়েছে। বাইরে রাস্তা ধারে ফুলবাড়ি, কামারাঙাগুড়ি, ফাটাপুকুর, ফাঁসিদেওয়া, বেলাকোবা কোথাকার লোক নেই! স্থানীয় মণিরুল আলম, বিকাশ মণ্ডলেরা বললেন, ‘‘বাপ-ঠাকুর্দার জন্ম বাংলাদেশে। ওপারের টান বরাবরের। এতদিন ট্রাক আসত দেখতাম। এ বার আমাদের পালা। একবার তো যেতেই হবে।’’
বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা পাঁচটা নাগাদ তেরঙ্গা পতাকা শোভিত সীমান্ত গেট পেরিয়ে এ পারে আসতেই বিএসএফ এদিনের মত বন্ধ করে দেয় পারাপারের গেট। ততক্ষণে দুই দেশের বাসিন্দাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছ গিয়েছে প্রায় ১ কিলোমিটার। কিন্তু একে অপরকে হাত নাড়িয়ে স্বাগত জানানো চলছে দুই ধারে ধান খেতের মধ্যে দিয়ে সূর্য ডোবা অবধি।