ধৃত অভিষেক তামাঙ্গ
এক্স-রে, দুঁদে গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে দিনের পর দিন ফুল বোঝাই বাক্সে হাসিস-চরস পাচারের জন্য গত দশকে শিরোনামে চলে এসেছিল ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানকারী চক্র ‘ফ্লাওয়ার গ্যাং’।
অনেকটা সে ভাবেই বাগডোগরা বিমানবন্দর দিয়েও হাসিস পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়লেন অভিষেক তামাঙ্গ নামে এক যুবক। নেপালের একটি ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র অভিষেকের বাড়ি নেপালেই। এই যুবক কোনও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের।
ওই ছাত্রের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ফুল-ফল রাখার একটি সুদৃশ্য ঝুড়ি। প্রায় সাড়ে ১১ কেজি হাসিস দিয়ে ওই ঝুড়িটি এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে, তা বিমানবন্দরের এক্স-রে পরীক্ষায় তা উতরেও যায়। রাজস্ব গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্তা বলেন, “নজরদারি ফাঁকি দিতে ‘ফ্লাওয়ার গ্যাং’-এর মতোই ছক কষে আসরে নেমেছে নতুন দলটি।” তিনি জানান, বাগডোগরায় ধরা পড়লেও পাসপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, ওই যুবক হালে কাঠমাণ্ডু থেকে ভারতে ঢুকে সিঙ্গাপুরেও গিয়েছেন। আজ, সোমবার তাঁকে শিলিগুড়ি আদালতে হাজির করানো হবে। রাজস্ব গোয়েন্দা দফতরের আইনজীবী রতন বণিক বলেন, “ওই যুবক এখন জেল হেফাজতে। তবে প্রাথমিক তদন্তে হাসিস পাচারের নতুন কৌশল ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অফিসাররা কিছু তথ্য পেয়েছেন।” তিনি জানান, ধৃতকে আরও বিশদে জেরার প্রয়োজন রয়েছে।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক বছর আগে ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় মাদক পাচার করেছিল ‘ফ্লাওয়ার গ্যাং’ নামে একটি চক্র। তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, ফুল আনার নাম করে প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে ওই মাদক পাচার করছে চক্রটি। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ব্রিটেনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ওই ভাবে মাদকের কারবার ফুলেফেঁপে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ওই ‘ফ্লাওয়ার গ্যাং’-এর মূল পাণ্ডা অ্যান্টনি মিলস ধরা পড়ে। একে একে ওই দলের ১২ জন গ্রেফতার হয়। গোয়েন্দারা জানতে পারেন, ওই দলের জাল ছড়িয়ে ছিল পাকিস্তানেও। সেই তথ্য পৌঁছয় ভারতেও। এর পরে গোটা দেশেই সতর্ক বার্তা পাঠানো হয়।
তার পরেও ওই ছাত্রটি কিন্তু ওই মাদক নিয়ে পালানোর পথ পরিষ্কার করে ফেলেছিলেন। দিনটা ছিল ২০ অক্টোবর। অভিষেক পারো থেকে বাগডোগরা হয়ে ব্যাঙ্ককগামী বিমানে ওঠার ঠিক মুখে ধরা পড়েন। বেলা তখন সাড়ে ১১টা। কাঠমান্ডু থেকে সড়ক পথে বাগডোগরা এসেছিলেন অভিষেক। হাতে ছিল দু’টি ব্যাগ ও ওই ঝুড়িটি। ব্যাঙ্কক যাওয়ার উড়ানে টিকিট ছিল। সুদৃশ্য ঝুড়িটি এক্স-রে করার সময় অনায়াসেই বার হয়ে যায়। বোর্ডিং পাসও পেয়ে যান অভিষেক। কিন্তু তার পরে বারবার ঝুড়িটি তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছেন দেখে বিমানবন্দরে উপস্থিত রাজস্ব গোয়েন্দা বিভাগের এক অফিসারের সন্দেহ হয়। অভিষেক জেরার মুখে জানান, ব্যাঙ্ককের এক বৌদ্ধ মন্দিরে ফুল-ফল দেওয়ার জন্য ঝুড়িটি করে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু রাংতায় মোড়া ঝুড়িটি যে বেতের নয়, তা হাত দিয়ে বুঝতে পারেন ওই অফিসার। ঝুড়ি থেকে উগ্র ডিওডোর্যান্টের সুগন্ধেও চার দিক ম-ম করছিল। পুজোর ফুলের ঝুড়িতে কেন এত ‘ডিও’? সব মিলিয়ে সন্দেহ গাঢ় হয়।
খবর যায় শিলিগুড়িতেও। আরও কয়েক জন অফিসার পৌঁছে যান। তত ক্ষণে ঝুড়ির রাংতা খোলা হয়ে গিয়েছে। দেখা গিয়েছে ভিতরে বেত নেই। রয়েছে কার্বন পেপারে মোড়া কোনও গাছের শিকড়। কার্বন পেপার খুলতেই দেখা যায় সযত্নে হাসিস সাজিয়ে বেতের মতো বাঁকিয়ে একটি ঢাউস ঝুড়ি তৈরি করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের অনুমান, ওই হাসিসের দাম অন্তত দেড় কোটি টাকা।
কিন্তু বিমানবন্দরের এক্স-রে যন্ত্রে তা ধরা পড়ল না কেন? এক গোয়েন্দা অফিসার জানান, সাধারণত কার্বন পেপারে হাসিস মুড়ে দিলে তা এক্স রে পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। তবে হাসিস থেকে তীব্র কটু গন্ধ বার হয়। তা ঢাকতেই ‘ডিও’ ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল।