প্রেমদিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রেমদিবসে এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে শুভেচ্ছা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লিখলেন, ‘হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে, ভালবাসা দীর্ঘজীবী হোক।’ রাজনীতিবিদ এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে এর আগে কখনও এইদিনে এমন শুভেচ্ছামূলক পোস্ট করতে দেখা যায়নি। ফলে প্রেমদিবসে মমতার এই বার্তা নজিরবিহীন। সেই কারণেই বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
অনেকেরই মতে, এতে বিশুদ্ধ ভালবাসার আড়ালে রাজনীতিই রয়েছে। বিশেষত, যখন সামনে বিধানসভা নির্বাচন। বস্তুত, মমতার পোস্টটি পড়ে দেখলে সেই বিষয়টি স্পষ্ট।
এক্স পোস্টে মমতা প্রথমেই লিখেছেন, ‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার, জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’ তার পরে ব্যাখ্যা করেছেন, ভালবাসা সবসময় জাত, ধর্ম, বর্ণের বেড়াজালকে অতিক্রম করে। তিনি যে মানুষের জন্য কাজ করে চলেছেন, তার নেপথ্যেও রয়েছে অকৃত্রিম ভালবাসাই।
এমনিতে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ সাধারণত যুগলদের প্রেমে দিবস হিসাবেই প্রতিষ্ঠিত। শনিবারও কলকাতা শহরে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মেলা বসেছে। বেলা ১২টা নাগাদ হাওড়া মেট্রো স্টেশনে যুগলদের ভিড়ের চোটে অফিসযাত্রীদের নাকানিচোবানি খেতে হয়েছে। কিন্তু সেই দিনটিকে সামাজিক ভাবে বর্ণনা করে পোস্ট করেছেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রীর এমন পোস্টের পরে স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলি। বিজেপির মুখপাত্র প্রণয় রায়ের বক্তব্য, ‘‘আমরা যারা ভারতীয়, তাদের কাছে ভালবাসা ৩৬৫ দিনের। আলাদা করে ১৪ ফেব্রুয়ারির কোনও গুরুত্ব নেই।’’ খোঁচা দিয়ে প্রণয় এ-ও বলেন, ‘‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি বলতে মুখ্যমন্ত্রী কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির কথা বলতে চেয়েছেন কি না, তা বলা মুশকিল।’’ সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর পোস্টের কথা শুনে প্রথমেই হেসে ফেলেছেন। তার পরে বলেছেন, ‘‘আমাদের ছাত্র সংগঠন এসএফআই মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির কাছেই (রাসবিহারীতে) ‘ভালবাসার ইস্তাহার’ নামে প্রগতিশীল সাহিত্যের স্টল খুলেছে। মুখ্যমন্ত্রী ওখানে একবার ঘুরে যেতে পারেন।’’
মমতা এমনিতে এই ধরনের ‘দিবস’ বা ‘উৎসব’ সম্পর্কে ব্যক্তিগত ভাবে ওয়াকিবহাল। তিনি নিয়মিত বাংলা ধারাবাহিক দেখেন। বহু ধারাবাহিকে এই ধরনের দিনের জন্য বিশেষ এপিসোড সাজানো হয়। মুখ্যমন্ত্রী মেগা ধারাবাহিকে ঝগড়াঝাঁটি দেখানোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই তাঁর মত জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘‘অত কুটকচালি, কুচুটেপনা দেখাবেন না। তাতে মনটা নেগেটিভ হয়ে যায়।’’ অনেকের মতে, প্রকান্তরে মমতা বলতে চেয়েছিলেন, ভালবাসা, সম্পর্কের বাঁধন দেখানোই সমাজের জন্য শ্রেয়।
তবে মমতার এই পোস্টের রাজনৈতিক ‘তাৎপর্য’ আছে বলেই মনে করছেন অনেকে। তৃণমূলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ‘লাইনের’ সঙ্গে এই পোস্টের সাযুজ্য রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কয়েক মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন দুই সমকামী তরুণী। অচলায়তন ভাঙার জন্য তৃণমূলের তরফে তাঁদের জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। যে অনুষ্ঠানে ওই দুই তরুণীকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ধারাবাহিক ভাবে তৃণমূলের সমাজমাধ্যমের প্রচারে উঠে আসছে যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে প্রেমিক-প্রেমিকাদের স্বাধীনতা থাকবে না। নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই। প্রেমদিবসে মমতার পোস্টকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসাবেই দেখতে চাইছেন অনেকে।
বস্তুত, ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’-সহ বিভিন্ন পাশ্চাত্যরীতির দিবসকে বিজেপির কট্টরেরা অনুমোদন করতে চান না। অতীতে প্রেমদিবসে কোথাও কোথাও হিন্দুত্ববাদীদের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর করা বা প্রেমিক-প্রেমিকাদের গিয়ে উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে। অতি সম্প্রতি নয়াদিল্লির একটি পার্কে এক যুগলকে এলাকার মহিলা কাউন্সিলর গিয়ে প্রকাশ্যেই হেনস্থা করেন। পুরো দৃশ্যের ভিডিয়োও তোলা হয়েছিল। ওই যুগল অবশ্য জানিয়েছিলেন যে, তাঁদের পরিবারের সকলেই তাঁদের সম্পর্ক সম্পর্কে অবহিত। তাঁদের বিয়েও ঠিক হয়ে আছে। কিন্তু তাতে রেহাই মেলেনি। ওই কাউন্সিলর বলেছিলেন, ‘‘বিয়ে ঠিক হয়ে থাকলে বাড়িতে গিয়ে দেখা করো! পার্কে বসে আছ কেন?’’ তার পরে ওই যুগলকে এলাকার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
পোড়খাওয়া রাজনীতিক মমতা ‘নজিরবিহীন’ এই পোস্টের মাধ্যমে একদিকে যেমন বিজেপির গোঁড়ামিকে আক্রমণ করতে চেয়েছেন, তেমনই অন্যদিকে ছুঁতে চেয়েছেন তরুণ প্রজন্মকে।