সপরিবার সকিনা।—নিজস্ব চিত্র।
খুব ছোট বেলা থেকেই ডান পা অকেজো। দিন আনি দিন খাই পরিবারে অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে বার কয়েক অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা পায়ে জোর আনতে সাঁতার শিখতে বলেন। সেই শুরু। পরে সাঁতার থেকে সরে এসে পাওয়ারলিফটিং শুরু করেন বসিরহাটের সকিনা খাতুন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে তিনি এখন আর্ন্তজাতিক স্তরে পদক জয়ী। আলমারিতে ভর্তি নানা ট্রফি। তবে তার পরেও সকিনার পরিবারে কোনও বদল আসেনি। দেশ ও রাজ্যের হয়ে বহু পদকজয়ী ওই ক্রীড়াবিদের বাড়িতে এখনও পাকা শৌচালয়ই নেই।
ঘো়ড়ারাস-কুলিন গ্রামে কোড়া পাড়ার বাসিন্দা সকিনা খাতুন গত জুন মাসে কাজাখস্তানে আন্তর্জাতিক প্যারা অলিম্পিক কমিটি আয়োজিত এশিয়ান ওপেন পাওয়ার লিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৭৮ কেজি বিভাগে রুপো জিতেছিলেন। এর পরে শনিবার বসিরহাটের বাড়িতে ফিরেই প্রশাসনের উপর ক্ষোভ উগড়ে দেন সকিনা। রবিবার তিনি বলেন, ‘‘বাংলার হয়ে অনেক পদক জিতেছি। বিনিময়ে অনেক প্রতিশ্রুতি পেলেও বাড়িতে একটা শৌচাগারও কেউ করে দেয়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমি রাজ্য স্তরের প্রতিযোগিতাগুলিতে বাংলা ছেড়ে কর্নাটকের হয়ে নামব।’’
সকিনা জানায়, জাতীয় স্তরের সাঁতার প্রতিযোগিতায় চারটি সোনা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। কলকাতার বালিগঞ্জে নিয়মিত সাঁতার শিখতে যেতেন। কয়েক জন ক্রীড়াবিদ তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য পাওয়ার জন্য ভারোত্তোলন অনুশীলন শুরু করতে বলেন। তার পর সাঁতার থেকে সরে ভারোত্তোলনের অন্যতম বিভাগ পাওয়ার লিফটিং-এ মন দেন সকিনা। ২০১০ সালে জাতীয় ভারোত্তোলনে সোনা পান তিনি। ২০১৪ সালে গ্লাসগো কমলওয়েলথ গেমসের ‘প্যারা-অ্যাথলিট’ বিভাগে পাওয়ার লিফটিংয়ে আসে ব্রোঞ্জ। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে আরও একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পান তিনি। সকিনার ক্ষোভ, ‘‘গ্লাসগো কমনওয়েলথে ব্রোঞ্জ পেয়ে গ্রামে আসার পরে নেতা-মন্ত্রীরা বাড়িতে এসে বলেছিলেন আমার পরিবারের দায়িত্ব নেবে রাজ্য সরকার। কিন্তু আমি ফের অনুশীলনের জন্য বেঙ্গালুরু চলে যাওয়ার পরেই সব ফাঁকা।’’ তিনি জানান, গ্লাসগোর সাফল্যের পরে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে ৬ লাখ, খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ২৫ হাজার ও সাংসদ ইদ্রিশ আলি ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর দাবি, প্রশিক্ষণ ও বাড়িতে থাকার মতো ন্যূনতম পরিকাঠামো তৈরি করতে অনেক টাকা প্রয়োজন। বেঙ্গালুরুতে প্রশিক্ষণ ও থাকা-খাওয়া নিয়ে প্রতি মাসে খরচ হয় ৬৫ হাজার টাকা। সকিনার দাবি, গ্লাসগোতে ব্রোঞ্জ পাওয়ার পরে তাঁর বাবা-মাকে এক বেসরকারি সংস্থা সল্টলেক নিয়ে যায়। ওই সংস্থাটি এক অভিনেতা-সাংসদের উপস্থিতিতে তাঁর প্রশিক্ষণের খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আজ পর্যন্ত কোনও সাহায্যই পাননি তিনি।
রবিবার সকিনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সামনে প্যাচপ্যাচে কাদা। একটি ছোট জায়গাকে চট দিয়ে ঘিরে শৌচালয়। রান্নাঘরে বৌদি ও মায়ের সঙ্গে রান্নায় হাত লাগিয়েছেন সকিনা। তাঁর বাবা সিরাজুল গাজি অসুস্থ। মা নুরজাহান বিবির আক্ষেপ, মেয়ে বেশির ভাগ সময়ে বাড়িতে থাকে না। ছেলে সেলাই করে সংসার চালায়। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘দেশের হয়ে পদকজয়ীর বাড়িতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি শৌচালয়ও কী করে দেওয়া যায় না?’’
বসিরহাটের মহকুমাশাসক শেখর সেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘সকিনা খাতুন আমাদের গর্ব। কিন্তু ওঁর বাড়িতে যে শৌচালয় নেই সেটা আমি জানতাম না। দ্রুত পুরো বিষয়টি খোঁজ নিয়ে শৌচালয় তৈরি করে দেওয়া হবে।’’