আহত হওয়ার পরে শক্তিনগর হাসপাতালে সুকুমার বিশ্বাস। তখন বেঁচে ছিলেন। নিজস্ব চিত্র।
কলকাতার তিনটি প্রধান মেডিক্যাল কলেজ ঘুরেছিলেন, কিন্তু ঠাঁই মেলেনি বলে দাবি। অতএব দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত নদিয়ার এক বৃদ্ধের প্রাণ গেল চিকিৎসা না পেয়েই। অন্তত পরিবারের অভিযোগ তেমনই।
মৃতের নাম সুকুমার বিশ্বাস(৮০)। বাড়ি শান্তিপুরের বেলডাঙা গোয়ালপাড়া এলাকায়। গত ৬ মার্চ বেলা এগারোটা নাগাদ বেলডাঙা বাজার এলাকায় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক পার হওয়ার সময় একটি লরি তাঁকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তাঁর দু’টি পা গুরুতর জখম হয়। জেলা হাসপাতালের অস্থি বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ সরকার প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। তার পর তাঁকে কলকাতার হাসপাতালে রেফার করা হয়। বিশ্বজিৎবাবু বলেন, “ওঁর দু’টি পায়ের হাড় এমন ভাবে ভেঙেছিল যা সারানোর পরিকাঠামো আমাদের হাসপাতালে নেই। তাই রেফার করতে বাধ্য হই।”
ওই দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বাড়ির লোক অ্যাম্বুল্যান্সে সুকুমারবাবুকে নিয়ে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে যান। সুকুমারবাবুর মেয়ে মুন্নি বিশ্বাসের অভিযোগ, নীলরতনে তাঁর বাবাকে ভর্তি নেওয়া হয়নি।
এর পর তাঁরা সুকুমারবাবুকে আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যান। সেখানেও একই অভিজ্ঞতা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। এর পর সুকুমারবাবুকে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ, সেখানে অনেকটা সময় তাঁকে জরুরি বিভাগে রেখে দেওয়ার পর মাঝরাতে জানানো হয় যে, শয্যা না থাকায় তাঁকে ভর্তি করে চিকিৎসা করা যাবে না।
কোনও উপায় না দেখে অগত্যা পরিবারের লোকেরা সুকুমারবাবুকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সোমবার ভোরে তাঁরা কৃষ্ণনগরের দু’টি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেও একই কথা শুনতে হয়েছে বলে পরিবারের বক্তব্য। তখন তাঁকে বাড়িতেই রেখে দেওয়া হয়। চিকিৎসার অভাবে তাঁর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। মঙ্গলবার দুপুরে তাঁকে ফের শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কিছু সময়ের মধ্যে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশ মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।
নীলরতন মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ শৈবাল মুখোপাধ্যায় এ ব্যাপারে বলেন, "বিষয়টি আমার জানা নেই। তাই মন্তব্য করব না।’’ আর জি কর হাসপাতালের অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং এসএসকেএম হাসপাতালের অধিকর্তা মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়কে একাধিক বার ফোন করা হলেও তাঁরা ধরেননি এবং হোয়্যাটসঅ্যাপের উত্তর দেননি।
নদিয়া জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক স্বপন কুমার দাস বলেন, “এমন হওয়ার কথা নয়। বারবার একই ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য ভবনের সঙ্গে কথা বলব।” রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা দেবাশিস ভট্টাচার্য বলছেন, “অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। কেন এমন হল, তা খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করা হবে। বিষয়টি আগে জানতে পারলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেত। হয়তো এড়ানো যেত প্রাণহানি। যেহেতু শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের ক্ষেত্রে একাধিক বার এমনটা ঘটল, তাই আমরা ওদের জানাচ্ছি, যাতে ওখানকার চিকিৎসকেরা কাউকে কলকাতায় রেফার করার সময়ে সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ করে নেন।”
প্রসঙ্গত, মাস দু’য়েক আগে একই ভাবে শক্তিনগর জেলা হাসপাতাল থেকে রেফার হওয়ার পর কলকাতার একাধিক সরকারি হাসপাতাল ঘুরে কোথাও ভর্তি হতে না-পেরে মারা গিয়েছিলেন নদিয়ার বামুনপুকুর বাজার এলাকার বাসিন্দা ভক্ত বিশ্বাস। সেই ঘটনা নিয়ে সেই সময় স্বাস্থ্য ভবন তোলপাড় হয়েছিল। তারও পরে অতি সম্প্রতি গলায় আটকে যাওয়া কাজলের কৌটো বার করতে নিউটাউনের এক শিশুকে নিয়ে কলকাতার একাধিক হাসপাতালে হত্যে দিতে হয়েছিল বাড়ির লোককে। শেষে এসএসকেএমে কৌটো বার করা হলেও অত্যধিক দেরির জন্য শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি সেই আট মাসের শিশুকে।