গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
যে ধাক্কায় তৃণমূল ঘায়েল হবে বলে বিজেপির আশা ছিল, সেই এসআইআর বিজেপি-কেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। তাও আবার বিজেপির ‘গড়’ হিসাবে পরিচিত কিছু এলাকাতেই! মতুয়া এলাকায় অনিশ্চয়তার আবহ রয়েছে। আতঙ্ক তৈরি হয়েছে রাজবংশী সমাজেও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাই বিজেপির যুব সংগঠনের নতুন রাজ্য কমিটিতে বাড়ানো হল মতুয়া, নমশূদ্র এবং রাজবংশী এলাকার প্রতিনিধিত্ব। মাঠে-ময়দানে নেমে ‘ভোট করাতে’ অভ্যস্ত যাঁরা, অথবা যাঁরা ছাত্র সংগঠনে প্রথম সারিতে উঠে এসেছিলেন, তাঁদেরই তুলে আনা হল রাজ্য কমিটিতে।
রবিবার বিজেপি যুবমোর্চার নতুন রাজ্য কমিটি ঘোষিত হয়েছে। কমিটির সদস্যদের নামের তালিকা দেখলে বোঝা যাচ্ছে, এক-চতুর্থাংশ সদস্যকেই আনা হয়েছে মতুয়া, নমশূদ্র বা রাজবংশী প্রধান এলাকা থেকে। আট জন সহ-সভাপতির মধ্যে চার জনই হয় দক্ষিণবঙ্গের মতুয়াবহুল এবং উত্তরবঙ্গের রাজবংশীবহুল এলাকার লোক। তিন সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে একজন ‘মতুয়াদুর্গ’ হিসাবে পরিচিত একটি বিধানসভা এলাকা থেকে। এ ছাড়াও রয়েছেন অন্তত আরও দুই পদাধিকারী, যাঁরা মতুয়া বা নমশূদ্র সমাজের।
গোপাল গয়ালি বিজেপির বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার প্রভাবশালী তরুণ তথা মতুয়া মুখ। গোপাল এক সময়ে রাজ্য বিজেপির সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তীর আপ্ত সহায়ক ছিলেন। পরে জেলা বিজেপির সম্পাদক হন। গোপালের ভাই বাগদা পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী দলনেতা পদে রয়েছেন। মতুয়া ঠাকুরবাড়ির বাইরে গোপালই প্রথম বিজেপি নেতা, যিনি সর্বাগ্রে সিএএ সহায়তা শিবির খুলেছিলেন। শ’য়ে শ’য়ে আবেদনও জমা করিয়েছিলেন। এ হেন তরুণকে যুব মোর্চার রাজ্য সহ-সভাপতি করা হয়েছে।
সমীর রায় কোচবিহারের রাজবংশী তরুণ। এক সময়ে কোচবিহার জেলা যুবমোর্চার সভাপতি ছিলেন। দলের সভা-সমাবেশে লোকজন জড়ো করা হোক বা মাঠে-ময়দানে নিরন্তর ছুটে বেড়ানো, প্রচারাভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া হোক বা ভোটের দিনে ‘ভোট করানো’, সবেতেই সমীরকে পাওয়া যায়। যুবমোর্চায় গোটা রাজ্যেই সমীরের সক্রিয়তা প্রশংসিত। সমীর বিদায়ী কমিটিতেও সহ-সভাপতি ছিলেন। এ বারও তাঁকে সেই পদেই রেখে দেওয়া হয়েছে।
নতুন কমিটিতে তিন সাধারণ সম্পাদকের অন্যতম হয়েছেন আশিস বিশ্বাস। তিনি মতুয়া বা রাজবংশী নন। কিন্তু তিনি কৃষ্ণগঞ্জের যুবনেতা। মতুয়া প্রধান কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভা তথা রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্র ২০১৯ সাল থেকেই লাগাতার বিজেপির পক্ষে রায় দিয়ে আসছে। কিন্তু এসআইআর-এর ফলে মতুয়া বা নমশূদ্র সমাজে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। গত দু’টি লোকসভা নির্বাচন এবং একটি বিধানসভা নির্বাচনে ওই সব এলাকায় বিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি হিসাবে ময়দানে নেমেছিল যুবসমাজই। তাই কৃষ্ণগঞ্জের আশিসকে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক পদে তুলে এনে এলাকার যুব জনভিত্তি বিজেপি ধরে রাখার চেষ্টা করল বলেই অনেকের অভিমত।
এছাড়া ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলার যুব নেতা উত্তম অধিকারী এবং এবিভিপি-র (আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন) প্রথম সারির মুখ হিসাবে জলপাইগুড়ি থেকে উঠে আসা সপ্তর্ষি সরকারকেও সহ-সভাপতি পদ দেওয়া হয়েছে। ব্যারাকপুরে লক্ষাধিক মতুয়া ভোটার রয়েছেন। জলপাইগুড়িতে রয়েছে তার চেয়েও বেশি রাজবংশী ভোট।
এবিভিপি-র হয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেএনইউ-তে কাজ করে আসা গাইঘাটার অচিন্ত্য মণ্ডলকে করা হয়েছে যুগ্ম মিডিয়া ইনচার্জ। তিনি নমশূদ্র সম্প্রদায়ের। বনগাঁ এবং বারাসত, দু’টি সাংগঠনিক জেলাতেই কাজ করে আসা মতুয়া তরণী প্রিয়ন্তী রায়কে করা হয়েছে যুগ্ম অফিস সম্পাদক। যদিও প্রিয়ন্তী রবিবারই সমাজমাধ্যমে ঘোষণা করে দেন, তিনি ওই পদ নিচ্ছেন না। যুবমোর্চা সূত্রের খবর, প্রিয়ন্তী এ বার আরও ‘বড় দায়িত্ব’ আশা করেছিলেন। না-পাওয়ায় হতাশ। তিনি যুবমোর্চার হয়ে কাজ করার বদলে শুধু দলের হয়ে কাজ করতে চান বলে সমাজমাধ্যমে লিখেছেন।
যুবমোর্চার রাজ্য নেতৃত্ব অবশ্য কমিটি গঠনের নেপথ্যে এই অঙ্ক বা সমীকরণ থাকার কথা প্রকাশ্যে মানতে রাজি নন। সদ্যনিযুক্ত সহ-সভাপতি গোপালের কথায়, ‘‘বিজেপি সর্বস্পর্শী চিন্তাভাবনা নিয়ে চলে। আগেও মতুয়া, নমশূদ্র, রাজবংশীদের প্রতিনিধিত্ব যুবমোর্চার রাজ্য কমিটিতে ছিল। এখনও রয়েছে। সেই প্রতিনিধিত্ব আরও মজবুত হয়েছে বলতে পারেন। তবে তার নেপথ্যে কোনও ভোটের অঙ্ক নেই।’’